বিশ্বকাপ ফুটবলে রেকর্ড আয়ের ভাগ পাচ্ছে বাংলাদেশও!

বিশ্বকাপ থেকে পাওয়া রেকর্ড পরিমাণ আয়ের একটি অংশ ফিফার ২১১ সদস্য অ্যাসোসিয়েশনের মধ্যে বণ্টনের প্রস্তাবে নীতিগতভাবে সম্মতি জানিয়েছেন সংস্থাটির সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো। তবে প্রতিটি সদস্য অ্যাসোসিয়েশন কত অর্থ পাবে, সে বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।

বাংলাদেশও ফিফার অন্যতম একটি সদস্য দেশ। সে হিসেবে বিশ্বকাপ থেকে আয়কৃত অর্থের ভাগ পাবে বাংলাদেশও।

ছয়টি কনফেডারেশনের প্রধানদের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে ফিফা সভাপতি ইনফান্তিনো জানিয়েছেন, আগামী ১৫ অক্টোবর ফিফা কাউন্সিলের বৈঠকে বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে। ইউরোপীয় ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা উয়েফা ও উত্তর, মধ্য আমেরিকা এবং ক্যারিবীয় অঞ্চলের ফুটবল কনফেডারেশন কনকাকাফের পক্ষ থেকে সদস্য অ্যাসোসিয়েশনগুলোকে অন্তত ১০ মিলিয়ন ডলার করে দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছিল। তবে ২০২৭-৩০ চক্রে বিভিন্ন সদস্য অ্যাসোসিয়েশনের জন্য এই অর্থের পরিমাণ ভিন্ন হতে পারে।

ইএসপিএন ফিফা সভাপতির ওই চিঠির একটি অনুলিপি পেয়েছে। সেখানে ইনফান্তিনো মূল প্রস্তাবটির প্রতি বিস্তৃতভাবে সমর্থন জানিয়েছেন। তবে অর্থের পরিমাণ, বণ্টনের পদ্ধতি ও অন্যান্য বিস্তারিত বিষয় নির্ধারণের জন্য ফিফা কাউন্সিলের অনুমোদন প্রয়োজন বলে জানিয়েছেন তিনি।

ইনফান্তিনোর চিঠিতে বলা হয়েছে, ‘আপনাদের প্রস্তাবগুলো একসঙ্গে বিবেচনা করলে একটি মূল বিষয়ে ব্যাপক ঐকমত্য স্পষ্ট হয়- ফিফার আর্থিক সাফল্য অবশ্যই ফুটবল এবং ফিফার ২১১ সদস্য অ্যাসোসিয়েশনের কাজে লাগতে হবে।’

২০১৬ সালে ফিফা সভাপতির দায়িত্ব নেওয়ার সময় নিজের দেওয়া একটি বক্তব্যও চিঠিতে উল্লেখ করেছেন ইনফান্তিনো। তিনি বলেন, ‘ফিফার অর্থ আপনাদের অর্থ- সদস্য অ্যাসোসিয়েশনগুলোর অর্থ।’

তবে ইনফান্তিনো স্পষ্ট করে দিয়েছেন, এখন পর্যন্ত যে অর্থের অঙ্ক প্রস্তাব করা হয়েছে, সেটিকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না। তার ভাষায়, প্রস্তাবিত অঙ্ক ও অর্থ বণ্টনের প্রক্রিয়া নতুন হলেও মূল নীতিটি নতুন নয়

আরও পড়ুন:  উখিয়া রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পাহাড় ধসে ৯ জন নিহত

উয়েফা ও কনকাকাফের প্রস্তাবের পেছনে সাম্প্রতিক সময়ে ফিফার অভ্যন্তরীণ টানাপোড়েনও রয়েছে। এর আগে বিশ্বকাপের ২০ শতাংশ মালিকানা বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রি করার একটি প্রস্তাব করেছিলেন ইনফান্তিনো। ওই বিনিয়োগকারীদের নেতৃত্বে ছিলেন জশুয়া কুশনার। প্রস্তাবটি বাস্তবায়িত হলে ফিফার প্রতিটি সদস্য অ্যাসোসিয়েশন ২০ মিলিয়ন ডলার করে পেতে পারত।

জশুয়া কুশনার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের ছোট ভাই। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোয় এবারের বিশ্বকাপ আয়োজনের আগে ইনফান্তিনোর সঙ্গে ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ তৈরি হয় এবং ফিফা সভাপতি নিয়মিত হোয়াইট হাউসে যাতায়াতও করেছেন।

বিশ্বকাপের মালিকানার অংশ বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রির প্রস্তাবের পর বিভিন্ন দেশের ফুটবল ফেডারেশনের প্রধানদের মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। উয়েফা ও কনকাকাফের পক্ষ থেকেও ইনফান্তিনোর পদত্যাগ দাবি করা হয়েছিল। এরপরই সদস্য অ্যাসোসিয়েশনগুলোর মধ্যে বিশ্বকাপ থেকে অর্জিত অতিরিক্ত আয়ের একটি অংশ সরাসরি বণ্টনের প্রস্তাব সামনে আসে।

উয়েফার সভাপতি আলেকসান্ডার সেফেরিন ও কনকাকাফ সভাপতি ভিক্টর মন্তাগ্লিয়ানি ইনফান্তিনোর কাছে পাঠানো চিঠিতে প্রতিটি সদস্য অ্যাসোসিয়েশনের জন্য অন্তত ১০ মিলিয়ন ডলার দেওয়ার প্রস্তাব করেন। ইনফান্তিনোর চিঠি অনুযায়ী, কনফেডারেশনগুলোর প্রস্তাবে কিছু ভিন্ন অগ্রাধিকারও উঠে এসেছে।

ফিফা সভাপতির চিঠিটি পাঠানো হয়েছে ছয় কনফেডারেশনের প্রধান- উয়েফার আলেকজান্ডার সেফেরিন, কনকাকাফের ভিক্টর মন্তাগ্লিয়ানি, কনমেবলের আলেহান্দ্রো ডমিনগেজ, এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশনের সভাপতি শেখ সালমান বিন ইব্রাহিম আল খলিফা, আফ্রিকান ফুটবল কনফেডারেশনের সভাপতি পাত্রিস মোতসেপে এবং ওশেনিয়া ফুটবল কনফেডারেশনের সভাপতি ল্যামবার্ট মালটকের কাছে।

আরও পড়ুন:  নকআউটে কে কার মুখোমুখি, দেখে নিন এক নজরে

চিঠিতে ইনফান্তিনো জানান, ফিফা প্রশাসন এরই মধ্যে আর্থিক অবস্থান পর্যালোচনা করে সদস্য অ্যাসোসিয়েশনগুলোকে আরও সহযোগিতা দেওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে কাজ করছিল। তবে এ জন্য ফিফার আর্থিক অবস্থার নিশ্চয়তা এবং প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক অনুমোদন প্রয়োজন।

তিনি আরও জানান, বিভিন্ন কনফেডারেশন তাদের নিজস্ব বিষয়ও সামনে এনেছে। সেফেরিন ও মন্তাগ্লিয়ানি নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ সরাসরি বণ্টনের প্রস্তাব দিয়েছেন। এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশনের সভাপতি শেখ সালমান ১৫ অক্টোবরের বৈঠকে সিদ্ধান্ত নেওয়া অথবা দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। অন্যদিকে ওশেনিয়া কনফেডারেশনের পক্ষ থেকে উন্নয়নশীল কনফেডারেশনগুলোর কাঠামোগত ব্যয়ের বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে।

আগামী ১৫ অক্টোবর ফিফা কাউন্সিলের বৈঠকে এই সব প্রস্তাব একত্র করে একটি সমন্বিত মূল্যায়ন উপস্থাপন করা হবে। এরপরই অর্থের পরিমাণ ও বণ্টন পদ্ধতি নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রক্রিয়া এগোবে।

ইনফান্তিনো বলেছেন, ‘একটি নির্দিষ্ট অঙ্ক আলোচনা শুরু করতে পারে, কিন্তু বৈশ্বিক একটি নীতি নির্ধারণের জন্য সেটিই যথেষ্ট নয়।’ এ কারণে ফিফার মহাসচিবকে সব প্রস্তাব একত্র করে একটি সমন্বিত মূল্যায়ন প্রস্তুতের নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।

চিঠিতে ইনফান্তিনো সতর্ক করে দিয়েছেন, মূল্যায়ন ও প্রয়োজনীয় অনুমোদন সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত কোনো প্রাথমিক অঙ্ককে সদস্য অ্যাসোসিয়েশনগুলোর জন্য অনুমোদিত অর্থ হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না।

আরও পড়ুন:  বাংলাদেশের বিশ্বকাপ খেলার সুযোগ আছে: ফিফা প্রেসিডেন্ট

তিনি বলেন, ‘আমি কোনো নির্দিষ্ট অঙ্ককে আগেভাগে নির্ধারণ করতে চাই না। ফিফার যথাযথ প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দায়িত্বশীলভাবে যতটা অতিরিক্ত অর্থ দেওয়া সম্ভব, আমি তার সর্বোচ্চ মাত্রাকে সমর্থন করব। তবে সেটি ন্যায্যভাবে প্রয়োগ করতে হবে এবং স্বচ্ছ ও নিরীক্ষাযোগ্য ব্যবস্থার মাধ্যমে পরিচালিত হতে হবে।’

বিশ্বকাপ থেকে পাওয়া অতিরিক্ত অর্থের বণ্টন নিয়ে তৈরি হওয়া বিরোধের মধ্যে উয়েফা ও কনকাকাফের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার বার্তাও দিয়েছেন ইনফান্তিনো। তিনি বিষয়টি ‘ঐক্য, পারস্পরিক সম্মান ও যৌথ দায়িত্ববোধের’ মাধ্যমে এগিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

ফিফা সভাপতি বলেন, সদস্য অ্যাসোসিয়েশনগুলোর জন্য টেকসই ও যথাযথভাবে সমর্থিত একটি সমাধানে পৌঁছানো সম্ভব বলে তিনি আশাবাদী। একই সঙ্গে বিশ্বের সব অঞ্চলের ফুটবলের জন্য এই অর্থ কীভাবে ব্যবহার করা হবে, সে বিষয়ে সুষ্ঠু ও স্বচ্ছ ব্যবস্থা নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।

এখন মূল নজর ১৫ অক্টোবরের ফিফা কাউন্সিলের বৈঠকের দিকে। ওই বৈঠকেই বিশ্বকাপের রেকর্ড আয়ের কতটা সদস্য অ্যাসোসিয়েশনগুলোর মধ্যে বণ্টন করা হবে এবং কোন প্রক্রিয়ায় তা দেওয়া হবে- সেসব বিষয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত আসতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

15 − 2 =