বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক এখন অত্যন্ত ইতিবাচক অবস্থানে : পররাষ্ট্রমন্ত্রী

বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক বর্তমানে অত্যন্ত ইতিবাচক অবস্থানে রয়েছে এবং আগামী দিনগুলোতে এ সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী ও গভীর করতে উভয় দেশ কাজ করবে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান।

গতকাল বৃহস্পতিবার রাতে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্য ও দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক বিশেষ দূত সার্জিও গরের সঙ্গে বৈঠক বিষয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এ কথা বলেন।

এসময় আরো উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির।পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বৈঠকটি অত্যন্ত ফলপ্রসূ হয়েছে। বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের বিদ্যমান চমৎকার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে আরও কীভাবে এগিয়ে নেওয়া যায়, সে বিষয়ে ইতিবাচক আলোচনা হয়েছে।

তিনি বলেন, গত সপ্তাহে ম্যানিলায় সার্জিও গরের সঙ্গে তাঁর একটি বৈঠক হয়েছিল।

একই সফরে তিনি মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর সঙ্গেও সাক্ষাৎ করেন।তিনি আরো বলেন, আমাদের সম্পর্ক এখন অত্যন্ত ইতিবাচক অভিমুখে রয়েছে এবং আগামী দিনগুলোতে আমরা এই সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী ও গভীর করতে কাজ করব।

সফরে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশ সম্পর্কে কী জানতে চেয়েছে—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, দুই দেশের সম্পর্কের প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ই আলোচনায় এসেছে। বাণিজ্য, বিনিয়োগ, জ্বালানি, অভিবাসনসহ বিভিন্ন খাতে সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

তবে এটি ছিল একটি স্বল্পপরিসরের বৈঠক; তাই বিস্তারিত বিষয়ের পরিবর্তে ভবিষ্যৎ সহযোগিতার সামগ্রিক দিকনির্দেশনা নিয়েই আলোচনা হয়েছে।বোয়িং উড়োজাহাজ ক্রয় প্রসঙ্গে প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বাংলাদেশ শুধু রাষ্ট্রায়ত্ত বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের মাধ্যমেই নয়, দেশের বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমেও বোয়িং উড়োজাহাজ ক্রয় করছে। এটি দুই দেশের অর্থনৈতিক সহযোগিতার একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত।

আরও পড়ুন:  পান্নার লাশ মেঘালয়ে উদ্ধার, নিশ্চিত করলো ভারত

রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় থেকে রোহিঙ্গাদের জন্য বাংলাদেশ যে মানবিক সহায়তা পায়, তার অর্ধেকেরও বেশি আসে যুক্তরাষ্ট্র থেকে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, যুক্তরাষ্ট্র ভবিষ্যতেও এ সহায়তা অব্যাহত রাখবে।

তবে মিয়ানমারের ওপর চাপ প্রয়োগ বা এ-সংক্রান্ত নির্দিষ্ট কোনো কৌশল নিয়ে আজকের বৈঠকে আলোচনা হয়নি।

তিনি বলেন, বাংলাদেশ রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে যে বহুপাক্ষিক কূটনৈতিক উদ্যোগ নিয়েছে, তাতে যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান্য অংশীদার দেশের সমর্থন অব্যাহত থাকবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।

বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক নিয়ে তিনি বলেন, বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সব পর্যায়ে নিয়মিত যোগাযোগ বজায় রেখেছে। এটি কোনো একক বৈঠকের বিষয় নয়; বরং ধারাবাহিক কূটনৈতিক সম্পৃক্ততার অংশ। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় থেকে যে ধারাবাহিকতা ছিল, বর্তমান সরকারও সেটি অব্যাহত রেখেছে।

আওয়ামী লীগ, অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতন্ত্র কিংবা মানবিক করিডোরের মতো রাজনৈতিক বিষয়গুলো আজকের বৈঠকে আলোচনা হয়নি বলেও জানান তিনি।

যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্ক (ট্যারিফ) ব্যবস্থা সম্পর্কে তিনি বলেন, বিষয়টি নিয়ে অনেকের মধ্যে বিভ্রান্তি রয়েছে। শুরুতে বাংলাদেশি পণ্যের ওপর ১৯ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হলেও, যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট সংশ্লিষ্ট আইনি বিষয় নিয়ে রায় দেওয়ার পর পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়। পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য আইনের আওতায় পরিচালিত তদন্ত শেষে বাংলাদেশের জন্য ১০ শতাংশ শুল্ক নির্ধারণ করা হয়েছে। অনেক দেশ ১২ বা সাড়ে ১২ শতাংশ শুল্কের মুখোমুখি হলেও বাংলাদেশের ক্ষেত্রে হার ১০ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের জন্য একটি ট্যারিফ কোটা ব্যবস্থা (Tariff Quota System) চালু করেছে। এর ফলে, যদি বাংলাদেশে উৎপাদিত পোশাকে মার্কিন তুলা বা মার্কিন উৎপাদিত ম্যান-মেইড ফাইবার ব্যবহার করা হয়, তাহলে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে আরও বেশি সুবিধাজনক প্রবেশাধিকার পাবে। এ সুবিধা বাংলাদেশ ছাড়াও ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া এবং আরেকটি আসিয়ান দেশ পেয়েছে।

আরও পড়ুন:  বিমানবন্দর থেকে ঢাবির কেন্দ্রীয় মসজিদে নেওয়া হবে হাদিকে

মানবাধিকার ইস্যু এবং র‍্যাবের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা প্রশ্নে তিনি বলেন, বর্তমান সরকার মানবাধিকার সুরক্ষায় দৃঢ়ভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে নিয়মিত আলোচনা হয়ে থাকে। তবে আজকের বৈঠকে র‍্যাবের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার বা এ-সংক্রান্ত কোনো নির্দিষ্ট আলোচনা হয়নি। তিনি এটিকে একটি চলমান কূটনৈতিক প্রক্রিয়া বলে উল্লেখ করেন।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরো জানান, আগামী ৮ সেপ্টেম্বর তিনি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের (UNGA) ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করবেন। এ দায়িত্ব পালনের বিভিন্ন বিষয় নিয়েও সার্জিও গরের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে।

তিনি বলেন, জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহাসিক ভূমিকা রয়েছে। ফলে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি হিসেবে তাঁর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের নিয়মিত যোগাযোগ ও মতবিনিময় হওয়া স্বাভাবিক এবং ভবিষ্যতেও এ যোগাযোগ অব্যাহত থাকবে।

আরও পড়ুন:  পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে চীন, ভারত ও পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূতদের সাক্ষাৎ

বিশ্বে উদীয়মান প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নিয়ে প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বিশ্ব ধীরে ধীরে নতুন বাস্তবতার দিকে এগোচ্ছে এবং বিভিন্ন ধরনের প্রযুক্তিনির্ভর সহযোগিতা কাঠামো গড়ে উঠছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ভবিষ্যৎ বৈশ্বিক সভ্যতার অন্যতম ভিত্তি হয়ে উঠবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে এ বিষয়ে এখনো অনেক বিষয় বিবর্তনশীল এবং বিভিন্ন দেশ, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র, নতুন উদ্যোগগুলো পর্যালোচনা করছে। ফলে এ বিষয়ে চূড়ান্ত অবস্থান সম্পর্কে মন্তব্য করার সময় এখনো আসেনি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *