মালয়েশিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদের স্ত্রী সিতি হাসমাহ মোহাম্মদ আলি মারা গেছেন। তার বয়স হয়েছিল ১০০ বছর। সোমবার কুয়ালালামপুরের জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে সোমবার স্ত্রীর মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছেন মাহাথির নিজেই। তার প্রকাশিত ছবিতে দেখা যায়, কালো মাস্ক পরা অবস্থায় ছোট ছেলে মুখরিজ মাহাথির হাসপাতাল থেকে তার মায়ের মরদেহ নিয়ে যাচ্ছেন।
দেশটির সংবাদমাধ্যম দ্য স্ট্রেইট টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়, সবচেয়ে দীর্ঘ সময় মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী ছিলেন মাহাথির মোহাম্মদ। এই দম্পতির সাত সন্তান রয়েছে।
সিতি হাসমাহ ১৯২৬ সালের ১২ জুলাই মালয়েশিয়ার সেলাঙ্গরের ক্লাংয়ে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি সিঙ্গাপুরের কিং এডওয়ার্ড সপ্তম চিকিৎসা কলেজ থেকে চিকিৎসাশাস্ত্রে ডিগ্রি অর্জন করেন। প্রতিষ্ঠানটি পরবর্তীতে সিঙ্গাপুরের জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ইয়ং লু লিন চিকিৎসা বিদ্যালয়ের পূর্বসূরি হিসেবে পরিচিত হয়।
১৯৫৫ সালে পড়াশোনা শেষ করার পর তিনি মালয়ার প্রথমদিককার নারী চিকিৎসা কর্মকর্তাদের একজন হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন।
১৯৫৬ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের সহপাঠী মাহাথির মোহাম্মদের সঙ্গে তার বিয়ে হয়। গত ৫ আগস্ট এই দম্পতি তাদের ৭০তম বিবাহবার্ষিকী উদ্যাপন করেন।
মালয়েশিয়ার রাজা সুলতান ইব্রাহিম সুলতান ইস্কান্দার এবং রানি রাজা জারিথ সোফিয়াহ সিতি হাসমাহর পরিবারের প্রতি শোক ও সমবেদনা জানিয়েছেন।
সুলতান ইব্রাহিমের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে বলা হয়, ‘প্রিয়জন হারানোর এই কঠিন সময়ে সিতির পরিবার যেন শক্তি, ধৈর্য ও সহনশীলতা লাভ করে।’
সিতি হাসমাহর মৃত্যুর খবর জানার পর এক অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেওয়ার সময় মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম উপস্থিত সবাইকে তার আত্মার শান্তির জন্য প্রার্থনা করতে বলেন। তিনি বলেন, ‘আজ সকালে একটি দুঃখজনক সংবাদ জানাতে চাই। আমরা তুন (সম্মানার্থে) সিতি হাসমাহর মৃত্যুর খবর পেয়েছি। আল্লাহ তার আত্মাকে শান্তি দিন।’
পরে এক বিবৃতিতে আনোয়ার জানান, সিতি হাসমাহকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় শেষ বিদায় জানানো হবে। সরকারের প্রধান সচিব এবং প্রতিরক্ষা বাহিনীর প্রধান এতে সহায়তা করবেন। তাকে পুত্রজায়ার প্রেসিন্ট ২০ এলাকায় অবস্থিত জাতীয় কবরস্থান পুসারা নেগারাওয়ানে বিকাল সাড়ে ৪টায় দাফন করা হবে।
মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের স্ত্রী ওয়ান আজিজাহ ওয়ান ইসমাইল বলেন, ‘সিতি হাসমাহর শান্ত স্বভাব, দৃঢ়তা ও সদয় আচরণ মানুষের মনে স্থায়ী ছাপ রেখে গেছে। ব্যক্তিগতভাবে তুন (সিতি হাসমাহ) শুধু একজন সম্মানিত ব্যক্তি ছিলেন না, তিনি আমাকে মর্যাদা ও সৌন্দর্যের সঙ্গে নিজেকে পরিচালনা করতে শিখিয়েছেন। তার প্রজ্ঞা, উষ্ণতা ও মনোরম আচরণ তাকে এমন একজন মানুষে পরিণত করেছিল, যাকে সহজেই ভালোবাসা যায়।’
দুই পরিবারের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিগত সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও ১৯৯৮ সালের সেপ্টেম্বরে আনোয়ার ইব্রাহিমকে উপপ্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার পর মাহাথিরের সঙ্গে তার রাজনৈতিক বিরোধ প্রকাশ্যে আসে।
২০১৬ সালের নভেম্বরে আবার তাদের সম্পর্ক জোড়া লাগে এবং ২০১৮ সালের সাধারণ নির্বাচনের আগে মাহাথির ও আনোয়ার রাজনৈতিক জোট গঠন করার পর এক আবেগঘন মুহূর্তে সিতি হাসমাহ ও ওয়ান আজিজাহ একে অপরকে জড়িয়ে ধরেন।
সিতি হাসমাহর মৃত্যুতে শোক জানিয়েছেন সিঙ্গাপুরের জ্যেষ্ঠ মন্ত্রী লি সিয়েন লুং। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তিনি লেখেন, ‘আজ তুন সিতি হাসমাহর মৃত্যুর খবর শুনে আমি গভীরভাবে দুঃখিত। আমি বহু বছর ধরে তুন সিতি হাসমাহকে চিনি এবং সব সময় তার সঙ্গে দেখা করে আনন্দ পেয়েছি। তিনি ছিলেন উষ্ণ ও সৌজন্যপূর্ণ, প্রাণবন্ত এবং অসাধারণ রসবোধের অধিকারী।’
‘সংগীত ও বেহালার প্রতি তার ভালোবাসা নিয়ে আমাদের কথোপকথনের কথা আমি স্নেহের সঙ্গে স্মরণ করি। তিনি ৯০-এর দশক পার হওয়ার পরও সংগীত পরিবেশন চালিয়ে গেছেন, এমনকি দাতব্য কাজের জন্য অর্থ সংগ্রহেও অংশ নিয়েছেন। তার জীবনের প্রতি আগ্রহ ছিল অসাধারণ। একজন চিকিৎসক হিসেবে তিনি জীবনের বড় একটি অংশ মালয়েশিয়ার মানুষের, বিশেষ করে নারী, শিশু ও পরিবারের স্বাস্থ্য ও কল্যাণ উন্নয়নে উৎসর্গ করেছেন’, যোগ করেন তিনি।







