বাবাকে শেষ বিদায় দিলেন মেসি

যে শহর থেকে শুরু হয়েছিল একটা রূপকথার গল্প, সেই রোজারিওর মাটিতেই চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন রূপকারের কারিগর। জীবনসংগ্রামের নানা আঁকাবাঁকা পথ পেরিয়ে যে হাতটি শক্ত করে ধরে এক বালককে বিশ্বজয়ের মঞ্চে পৌঁছে দিয়েছিলেন, সেই হাতটি আজ আর নেই। জন্মশহর রোজারিওতে বাবা হোর্হে মেসিকে অশ্রুসিক্ত চোখে শেষ বিদায় জানালেন ফুটবল বিশ্বকে জয় করা লিওনেল মেসি। গোল ডটকমের প্রতিবেদন।

দীর্ঘদিনের শারীরিক জটিলতায় ভুগে শনিবার ভোরে রোজারিওর ‘সানাতোরিও সেন্ত্রো’ হাসপাতালে শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন ৬৮ বছর বয়সী হোর্হে মেসি। খবরটি পাওয়া মাত্রই ভেঙে পড়েন ইন্টার মায়ামি তারকা। যুক্তরাষ্ট্রের মায়ামি থেকে স্ত্রী আন্তোনেলা রোকুচ্ছো ও সন্তানদের নিয়ে হন্তদন্ত হয়ে ছুটে আসেন ব্যক্তিগত বিমানে। গন্তব্য—শৈশবের সেই চেনা রোজারিও, যেখানে থমথমে বাতাসের মাঝে অপেক্ষা করছিলেন মা সেলিয়া কুচ্চিত্তিনি এবং ভাই-বোনেরা।

আরও পড়ুন:  সাত পাকে বাঁধা পড়লেন পরমব্রত-পিয়া

রোববার বিকেলে সান্তা ফে প্রদেশের এল প্রাদো সমাধিক্ষেত্রে সম্পন্ন হয় হোর্হে মেসির শেষকৃত্য। নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা আর তীব্র গোপনীয়তার চাদরে ঢাকা সেই আনুষ্ঠানিকতায় উপস্থিত ছিলেন কেবল পরিবারের ঘনিষ্ঠজনেরা। শোকের এই চরম মুহূর্তে রাজপুত্রকে একটু নিরিবিলি সময় দিতে পুরো সমাধি চত্বরই সাধারণ দর্শনার্থীদের জন্য বন্ধ করে দেওয়া হয়।

তবে ফুটবলের মহানায়কের শোক তো শুধু তাঁর একার থাকে না! সমাধিক্ষেত্রের উঁচু দেয়াল আর বিমানবন্দরের বাইরে তাই ভিড় জমিয়েছিলেন অজস্র অনুরাগী। হাতে হাতে ছড়ানো ব্যানার, তাতে লেখা—’শক্ত থাকো লিও, আমরা তোমায় ভালোবাসি।’ এক ভক্ত ছলছল চোখে বলছিলেন, ‘লিও আমাদের পুরো দেশকে আনন্দ দিয়েছেন, আজ তাঁর এই বিষাদের দিনে আমরা কীভাবে ঘরে বসে থাকি?’

মেসি পরিবারের এমন চরম বিপদে পাশে দাঁড়িয়েছে স্থানীয় প্রশাসনও। রোজারিওর মেয়র পাবলো হাভকিন গভীর শোক প্রকাশ করে জানান, পরিবারটিকে সার্বিক নিরাপত্তা ও নির্ঝঞ্ঝাট গোপনীয়তা উপহার দিতে প্রশাসন সর্বোচ্চ তৎপর ছিল।

আরও পড়ুন:  অবসরে যাচ্ছে মেসির ১০ নম্বর জার্সি!

মেসির বাবার প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে পিছিয়ে থাকেনি আর্জেন্টাইন ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনও (এএফএ)। এই সপ্তাহে দেশের মাটিতে বয়সভিত্তিক থেকে পেশাদার—সব স্তরের লিগ ম্যাচ শুরুর আগে পালন করা হচ্ছে এক মিনিটের নীরবতা। ফুটবলারদের হাতে শোভা পাচ্ছে শোকের কালো আর্মব্যান্ড।

সবচেয়ে আবেগঘন দৃশ্য ফুটে উঠেছে মেসি যেখান থেকে ফুটবল জীবনের প্রথম পাঠ নিয়েছিলেন, সেই শৈশবের ক্লাব ‘আবানদেরাদো গ্রান্দোলে’র সামাজিক মাধ্যমে। সেখানে শোভা পাচ্ছে একটি ধুসর স্মৃতিচিত্র—দলে সারিবদ্ধ শিশুদের মাঝে দাঁড়িয়ে ছোট মেসি, আর পাশে আগলে রাখা বাবা হোর্হে। ক্যাপশনে লেখা হৃদয়ছোঁয়া কিছু কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে, এই মানুষটিই না থাকলে হয়তো বিশ্ব ফুটবল আজকের ‘কিংবদন্তি মেসি’কে পেত না।

ইস্পাত কারখানার সাধারণ শ্রমিক থেকে ছেলের এজেন্ট, পরামর্শক এবং ছায়াসঙ্গী—হোর্হে মেসি ছিলেন লিওর নীরব পথপ্রদর্শক। গলির ফুটবল থেকে ক্যাটালোনিয়ার বার্সেলোনা, কিংবা কাতারের মরুমঞ্চে সোনালী ট্রফি উঁচিয়ে ধরা—প্রতিটি মাইলফলকের পেছনে নীরবে খাটুনি খেটে গেছেন এই বাবা। অবশেষে সেই বটবৃক্ষের ছায়া সরে গেল। কিন্তু রেখে গেলেন এমন এক ঐতিহ্য, যা ফুটবলের ইতিহাসে বেঁচে থাকবে চিরকাল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

5 × 4 =