শ্রমিকের অধিকার প্রতিষ্ঠায় মহানবী (সা.)

মানবজাতির জন্য আলোকবর্কিতা হয়ে পৃথিবীতে আগমন করেন মহানবী (সা.)। তিনি পৃথিবীতে এসেছিলেন মানুষকে মানুষের দাসত্ব থেকে বের করে আল্লাহর দাসত্বে ফিরিয়ে নিতে, দুনিয়ার সংকীর্ণতা থেকে আখিরাতের প্রশস্ততার দিকে নিয়ে যেতে এবং অন্যান্য ধর্ম ও মতবাদের অবিচার থেকে ইসলামের ইনসাফ ও ন্যায়বিচারের দিকে নিয়ে যেতে। ফলে তিনি পৃথিবীর নির্যাতিত ও নিপীড়িত শ্রমজীবী মানুষের মুক্তির পথ দেখিয়েছেন। হাদিসের আলোকে শ্রমজীবী মানুষের অধিকার তুলে ধরা হলো।

১. শ্রমের প্রতি উৎসাহ : মহানবী (সা.) মানুষকে শ্রমের প্রতি উৎসাহিত করেছেন। যেন মানুষ শ্রমবিমুখ না হয়, অন্যের ওপর নির্ভরশীল না হয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘মানুষ নিজ হাতের উপার্জনের চেয়ে উত্তম কিছু খায় না। আল্লাহর নবী দাউদ (আ.)-ও নিজ হাতের উপার্জন খেতেন।

(সহিহ বুখারি, হাদিস : ২০৭২)

২. শ্রমের মর্যাদা দান : মহানবী (সা.) কোনো পেশাকে হেয় করেননি, বরং তিনি শিক্ষা দিয়েছেন বৈধ যেকোনো পেশাই মর্যাদাকর। যেন মানুষ শ্রমকে মর্যাদা দিতে শেখে। যেমন তিনি বলেছেন, ‘কারো নিকট চাওয়া, যাতে সে তাকে কিছু দিতেও পারে, আবার নাও দিতে পারে, এর চেয়ে পিঠে বোঝা বহন করা উত্তম।’

(সহিহ বুখারি, হাদিস : ২৩৭৪)

৩. পারিশ্রমিকের অধিকার : পারিশ্রমিক শ্রমিকের অধিকার।

ইসলাম শ্রমিকের যথোপযুক্ত পারিশ্রমিক যথাসময়ে পরিশোধের নির্দেশ দেয়। যে ব্যক্তি শ্রমিকের পারিশ্রমিক ঠিকমতো আদায় করে না, রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর ব্যাপারে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেন যে কিয়ামতের দিবসে আমি নিজে তিন ব্যক্তির বিরুদ্ধে বাদী হব। ১. যে আমার নামে ওয়াদা করে তা ভঙ্গ করল, ২. যে কোনো আজাদ মানুষকে বিক্রি করে তার মূল্য ভোগ করল, ৩. যে কোনো মজুর নিয়োগ করে তার হতে পুরো কাজ আদায় করে এবং তার পারিশ্রমিক দেয় না।’(সহিহ বুখারি, হাদিস : ২২২৭)

আরও পড়ুন:  চলে গেলেন বর্ষীয়ান অভিনেত্রী লরেটা জেন সুইট

৪. পারিশ্রমিক নির্ধারণের অধিকার : পারিশ্রমিক নির্ধারণ করা শ্রমিকের অধিকার।

পারিশ্রমিক নির্ধারণে শ্রমিকের মতামত ও সম্মতি গুরুত্বপূর্ণ। এ জন্য মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো শ্রমিক নিয়োগ দেয়, সে যেন তাকে তার পারিশ্রমিক জানিয়ে দেয়।’

(মুসনাদে আবু হানিফা, পৃষ্ঠা-৮৯)

৫. সাধ্যাতীত শ্রমদানে বাধ্য না করা : কোনো শ্রমিকের ওপর সাধ্যাতীত কোনো বোঝা চাপিয়ে দেবে না, বরং শ্রমিক নিয়োগের সময় ব্যক্তির সামর্থ্য বিবেচনা করবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তাদেরকে সামর্থ্য অনুযায়ী কাজের আদেশ দেবে। যদি সাধ্যাতীত কাজের নির্দেশ দেয়, তবে তাকে যেন সাহায্য করা হয়। আর এমন কাজ সম্পন্ন করতে অপারগ হলে তাকে যেন শাস্তি না দেয়।’

(শুআবুল ঈমান, হাদিস : ৮১৯৯)

৬. খাদ্য-বস্ত্রের অধিকার : ইসলাম শ্রমিককে এমন পারিশ্রমিক প্রদানের নির্দেশ দেয়, যাতে তার অন্ন-বস্ত্রের নিশ্চয়তা মেলে। আর তা হতে হবে মালিকদের সমমানের। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের ভাইয়েরা, আল্লাহ তাদেরকে তোমাদের অধীন করেছেন। সুতরাং যার অধীনে তার ভাই রয়েছে তার উচিত সে নিজে যা খায় তাকেও তাই খেতে দেওয়া, নিজে যা পরিধান করে তাকেও তা-ই পরতে দেওয়া এবং তার অসাধ্য কোনো কাজ তার ওপর না চাপানো। আর যদি এমন কোনো কষ্টসাধ্য কাজের ভার তাকে দেওয়া হয় তাহলে সে যেন তাকে সাহায্য করে।’

আরও পড়ুন:  উপাধ্যক্ষ আবুল কাসেম সন্দ্বীপ : জীবন ও কর্ম

(সুনানে আবু দাউদ, হাদিস : ৫১৫৮)

৭. অবসর ও অবকাশের অধিকার : ইসলামের শ্রমনীতি অনুসারে শ্রমিক অবসর ও অবকাশের অধিকারও লাভ করবে। যেন সে স্বস্তিকর স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে পারে। এ জন্য ‘নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘তার অসাধ্য কোনো কাজ তার ওপর না চাপানো’। এই হাদিসের ব্যাখ্যায় আলেমরা বলেন, যে কাজ মানুষের জীবনের প্রয়োজনীয় অবসর ও অবকাশ কেড়ে নেয় তা সাধ্যাতীত। একইভাবে শ্রমিকেরও উচিত নয় অসীম শ্রমের বোঝা নিজের ওপর চাপিয়ে নেওয়া, বরং সে নিজের প্রতি এবং পরিবারের প্রতি লক্ষ রাখবে। হাদিসে এসেছে, ‘নিশ্চয়ই তোমার ওপর তোমার প্রভুর অধিকার আছে। তোমার প্রতি তোমার নিজেরও অধিকার আছে এবং তোমার প্রতি তোমার পরিবারেরও অধিকার রয়েছে। অতএব তুমি প্রত্যেক হকদারকে তার প্রাপ্য প্রদান কোরো।’

(সহিহ বুখারি, হাদিস : ১৯১৮)

৮. দায়মুক্তির অধিকার : কাজের সময় যদি কোনো আসবাব বা মাল নষ্ট হয় এবং শ্রমিক যদি তা ইচ্ছা করে না করে, তবে ইসলাম তাকে দায়মুক্ত ঘোষণা করেছে। আল্লামা ইবনু হাজম (রহ.) লেখেন, ‘শ্রমিকের ওপর জরিমানা নেই চাই সে মুশতারাক (যখন কাজ নির্দিষ্ট হয়) বা গাইরে মুশতারাক (যখন ব্যক্তি নির্দিষ্ট হয়) এবং কারিগরের ওপরও জরিমানা নেই, যতক্ষণ না প্রমাণ হবে শ্রমিক সীমালঙ্ঘন করেছে বা তা ইচ্ছা করে ধ্বংস করেছে।’

আরও পড়ুন:  সাংবাদিক ইলিয়াসকে যে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিলেন সোহেল তাজ

(বাদায়িউস সানায়ে : ৪/২১১)

শ্রমিকের অধিকার সুরক্ষায় রাষ্ট্রীয় অনেক আইন রয়েছে। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই তার যথাযথ প্রয়োগ নেই। মালিকপক্ষ অর্থ ও ক্ষমতার বলে দুনিয়াতে রেহাই পেয়ে গেলেও পরকালে তাদেরকে অবশ্যই মহান আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে হবে। শ্রমিক জীবনযন্ত্রণার দায় মেটাতে অনেক সময় নিজের অধিকারের ব্যাপারে উচ্চবাক্য করে না। কিন্তু মালিকের উচিত তাদের অধিকার ঠিকমতো আদায় করে দেওয়া। যেভাবে শোআইব (আ.) মুসা (আ.)-কে ডেকে এনে পারিশ্রমিক দিয়েছিলেন। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘তখন নারীদ্বয়ের একজন সলজ্জ পায়ে তার কাছে এলো এবং বলল, আমার পিতা আপনাকে আমন্ত্রণ করেছেন আমাদের পশুগুলোকে পানি পান করানোর বিনিময় প্রদানের জন্য।’

(সুরা : কাসাস, আয়াত : ২৫)

এ ব্যাপারে মহানবী (সা.) হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন, ‘যে জাতির দুর্বল লোকেরা জোরজবরদস্তি ছাড়া তাদের পাওনা আদায় করতে পারে না সেই জাতি কখনো পবিত্র হতে পারে না।’

(সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস : ২৪২৬)

আল্লাহ সবাইকে দ্বিনের সঠিক জ্ঞান ও বুঝ দান করুন। আমিন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *