ষড়ঋতুর দেশ বাংলাদেশ। আষাঢ়-শ্রাবণ এই দুইমাস মিলে হয় বর্ষাকাল। বাংলা ১৪৩৩ সালের আষাঢ়ের প্রথম দিন আজ। তবে দেশে আষাঢ়ের আগমনের বেশ কয়েকদিন আগেই শুরু হয়েছে ঝড়-বৃষ্টি। টিনের চালে বৃষ্টির ঝুমঝুম শব্দ, জানালার কাঁচে জলের আল্পনা, বাতাসে সোঁদা মাটির গন্ধ আর কদম ফুলের সুবাসের মধ্য দিয়ে প্রকৃতি স্বাগত জানালো বর্ষাকালকে।
সোমবার (১৫ জুন) ষড়ঋতুর দেশে বর্ষার আনুষ্ঠানিক আগমন হলেও গতকাল রোববার (১৪ জুন) জ্যৈষ্ঠের শেষ দিনে সারা দেশেই কম-বেশি বৃষ্টি হয়েছে।
রোববার ময়মনসিংহে সবচেয়ে বেশি ১২২ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়। তবে এদিন আকাশ মেঘলা থাকলেও রাজধানীতে কোনো বৃষ্টি হয়নি। যদিও গত শনিবার ৩৫ ও শুক্রবার ৪৩ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়েছে।
গতকাল রোববার রাতে আবহাওয়াবিদ ড. আবুল কালাম মল্লিক জানান, আজ সোমবারও রাজধানীসহ সারা দেশে কম-বেশি বৃষ্টি হতে পারে। তবে ময়মনসিংহ ও সিলেট অঞ্চলে অধিক বৃষ্টি হতে পারে। বর্ধিত পাঁচ দিনে বৃষ্টির প্রবণতা আরো বাড়বে।
তিনি আরও বলেন, এ সময়ে বৃষ্টি হলেও তা অনেকটাই উষ্ণ বৃষ্টি, বেশি সময় ধরে না হলে তাপমাত্রা সহজে কমে না; বরং ভ্যাপসা গরম অনুভূত হয়।
আবহাওয়াবিদ নাজমুল হক বলেন, ‘মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে সারা দেশেই বৃষ্টি হচ্ছে। এখন কোথাও কোথাও স্বল্প থেকে মাঝারি বৃষ্টি হচ্ছে। তবে ভারী বর্ষণ এখনও শুরু না হলেও ধীরে ধীরে বর্ষার বৃষ্টি বাড়বে।’
এদিকে আবহাওয়া অধিদপ্তরের এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সোমবার রংপুর, ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের অনেক জায়গায় এবং রাজশাহী, ঢাকা, খুলনা ও বরিশাল বিভাগের কিছু কিছু জায়গায় অস্থায়ীভাবে দমকা হাওয়া ও বিদ্যুৎ চমকানোসহ হালকা থেকে মাঝারি ধরনের বৃষ্টি কিংবা বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। সে সঙ্গে সারা দেশের কোথাও কোথাও মাঝারি ধরনের ভারী থেকে অতিভারী বর্ষণ হতে পারে। সারা দেশে দিন ও রাতের তাপমাত্রা সামান্য বাড়তে পারে।
বর্ষা নিয়ে কবি-সাহিত্যিকরা লিখেছেন অগণিত গান ও কবিতা। আবেগাপ্লুত হয়ে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম লিখেছেন— বর্ষা ঋতু এলো এলো বিজয়ীর সাজে, বাজে গুরু গুরু আনন্দ-ডমরু অম্বর মাঝে।
এছাড়া ‘আয়রে মেঘ আয়রে’সহ অগণিত গান ও কবিতায় বর্ষার স্বরূপ প্রকাশ করেছেন কবি-সাহিত্যিকরা। শুধু কি তা-ই, বর্ষার আগমনে গাছে শোভাবর্ধন করে কদম ফুল। মেঘের গুড়ুম গুড়ুম গর্জনে ময়ূর নাচে পেখম তুলে।
বর্ষা আমাদের জন্য অপরিহার্য এক ঋতু। বৃষ্টি না হলে শস্য জন্মাবে না, প্রকৃতি হারাবে বৈচিত্র, বেড়ে উঠবে না প্রাণ। বৃষ্টির অভাবে মাটি যখন অনুর্বর হয়ে যায়, তখন বর্ষা এসে তা উর্বর করে। আমাদের নদী-মাঠ-ঘাট বর্ষায় ভরে ওঠে সবুজ ফসলে। আবেগে বর্ষা সবার মনকে স্নিগ্ধ করে তোলে। পুরাতন জঞ্জাল ধুয়ে-মুছে জেগে ওঠে প্রাণচাঞ্চল্য।
আষাঢ়ে প্রকৃতির রূপ-রঙে নতুন চাঞ্চল্য দেখা দেয়। তাপপ্রবাহে চৌচির মাঠ-ঘাট, খাল-বিল আর বনবীথিকায় জেগে ওঠে নবীন প্রাণের ছন্দ। হঠাৎ বৃষ্টি, কর্দমাক্ত পথঘাট, চারধারে অথৈ পানিতে আবহমান বাংলা রূপ নেয় অপরূপ রূপবতী সলিল দুহিতায়। ফুলে ফুলে শোভিত হয় প্রকৃতি। তাল-তমাল, শাল-পিয়াল আর মরাল কপোতের বনবীথিকায় চোখে পড়ে বকুল, কদম, জারুল, পারুল, কৃষ্ণচূড়া ও রাধাচূড়াসহ অসংখ্য ফুল।
গ্রীষ্মের রুদ্র প্রকৃতির গ্লানি আর জরাকে ধুয়ে-মুছে প্রশান্তি, স্নিগ্ধতা ও সবুজে ভরে তোলে আষাঢ়। প্রকৃতিপ্রেমী মানুষের কাছে তাই বর্ষা নিয়ে আসে অভিনব ব্যঞ্জনা। আর বাঙালি মননে সবচেয়ে বেশি রোমান্টিকতার সুর বেজেছে এ বর্ষা ঋতুতেই। গানে-কবিতায়-সাহিত্যজুড়ে তারই প্রতিফলন ঘটেছে নানাভাবে।







