মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে কংগ্রেসের উভয় কক্ষে নিয়ন্ত্রণ হারাল ট্রাম্প

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে বড় ধরনের রাজনৈতিক বিপর্যয়ের মুখে পড়েছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তাঁর দল রিপাবলিকান পার্টি। মার্কিন কংগ্রেসের উচ্চকক্ষ সিনেটের পর এবার নিম্নকক্ষ হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভসের নিয়ন্ত্রণও দলটির হাতছাড়া হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে আইনসভার উভয় কক্ষের আধিপত্য পুনরুদ্ধার করল বিরোধী ডেমোক্র্যাটিক পার্টি। ফলস্বরূপ, দ্বিতীয় মেয়াদের শেষ দুই বছরে ট্রাম্প প্রশাসনের নীতি ও প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডের ওপর সরাসরি নিয়ন্ত্রণ ও কড়া নজরদারি প্রতিষ্ঠার শক্তিশালী ক্ষমতা তৈরি হলো ডেমোক্র্যাটদের হাতে।

সিএনএনের তথ্য অনুযায়ী, ৪৩৫ সদস্যের প্রতিনিধি পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজনীয় ২১৮টি আসন ইতোমধ্যে নিশ্চিত করে ফেলেছে ডেমোক্র্যাটরা, এবং তারা আরও ৩৯টি আসনে এগিয়ে রয়েছে। বিপরীতে রিপাবলিকানরা এখন পর্যন্ত ১২৬টি আসনে জয় পেয়েছে এবং ৪৬টিতে এগিয়ে রয়েছে।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নজিরবিহীনভাবে হ্রাস পাওয়া জনপ্রিয়তার সুযোগ নিয়ে ঐতিহাসিক জয় ছিনিয়ে এনেছে ডেমোক্র্যাটিক পার্টি। রিপাবলিকানদের দুর্ভেদ্য দুর্গ হিসেবে পরিচিত একাধিক অঙ্গরাজ্যে লাল শিবিরকে হটিয়ে জয়ী হয়েছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থীরা। স্থানীয় সময় মঙ্গলবার রাতে সিনেটের সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করার মধ্য দিয়ে আসন পুনরুদ্ধারের প্রয়োজনীয় লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করে দলটি।

আরও পড়ুন:  ছুটির দিনেও বায়ু দূষণে শীর্ষে ঢাকা

দীর্ঘদিনের লাল দুর্গ সাউথ ক্যারোলাইনায় প্রয়াত সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহামের বোন রিপাবলিকান প্রার্থী ডারলেইন গ্রাহামকে পরাজিত করে ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন ডেমোক্র্যাট চিকিৎসক অ্যানি অ্যান্ড্রুজ; সেখানে ১৯৯৮ সালের পর কোনো ডেমোক্র্যাট প্রার্থী বিজয়ী হতে পারেননি। নর্থ ক্যারোলাইনায় সাবেক গভর্নর রয় কুপার পরাজিত করেছেন রিপাবলিকান প্রতিদ্বন্দ্বী মাইকেল হোয়াটলিকে। এদিকে ১৯৯৪ সালের পর প্রথমবারের মতো টেক্সাসে কোনো অঙ্গরাজ্যভিত্তিক নির্বাচনে জয় পেয়েছেন ডেমোক্র্যাট জেমস টালারিকো; তিনি পরাজিত করেছেন অঙ্গরাজ্যের অ্যাটর্নি জেনারেল কেন প্যাক্সটনকে। পাশাপাশি ওহাইওতে ক্ষমতাসীন রিপাবলিকান সিনেটর জন হাস্টেডকে হটিয়ে আসন পুনরুদ্ধার করেছেন শেরউড ব্রাউন এবং কানসাসে ক্ষমতাসীন সিনেটর রজার মার্শালকে হারিয়েছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী অ্যাডাম হ্যামিলটন, যা অঙ্গরাজ্যটিতে ১৯৩২ সালের পর প্রথম কোনো ডেমোক্র্যাটের সিনেট বিজয়।

বিদায়ী ১১৯তম কংগ্রেসে ১০০ আসনের সিনেটে রিপাবলিকানদের দখলে ছিল ৫৩টি আসন, বিপরীতে দুই স্বতন্ত্র নেতাসহ ডেমোক্র্যাটদের ছিল ৪৭ আসন। মঙ্গলবারের এই ফলাফলের মাধ্যমে ২০২৪ সালের নির্বাচনে অর্জিত হোয়াইট হাউস, সিনেট এবং প্রতিনিধি পরিষদ—এই তিন ক্ষমতার কেন্দ্র নিয়ে রিপাবলিকানদের গড়ে তোলা ‘ট্রাইফেক্টা’ বা নিরঙ্কুশ আধিপত্যের চূড়ান্ত অবসান ঘটল।

আরও পড়ুন:  চীনের সহযোগিতার ঘোষণা, হরমুজ না খুলে যুদ্ধ শেষ করতে রাজি ট্রাম্প

প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্র্যাটদের জয় অনেকটাই অনুমিত থাকলেও সিনেটের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়া তুলনামূলক কঠিন বিবেচনা করা হচ্ছিল। এবারের নির্বাচনে নিয়মিত ৩৩টি আসনের পাশাপাশি ওহাইও ও ফ্লোরিডায় দুটি বিশেষ নির্বাচনসহ মোট ৩৫টি আসনে ভোট অনুষ্ঠিত হয়। জেডি ভ্যান্স ও মার্কো রুবিও ট্রাম্পের সরকারে যোগ দেওয়ায় ওই আসন দুটি শূন্য হয়েছিল। তীব্র লড়াইয়ের মুখেও জর্জিয়ায় সিনেটর জন অসফ এবং ভার্জিনিয়ায় দীর্ঘদিনের সিনেটর মার্ক ওয়ার্নার নিজেদের আসন অক্ষুণ্ন রাখতে সক্ষম হয়েছেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, লাগামহীন মূল্যস্ফীতি, ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্কনীতি, ইরান যুদ্ধ এবং প্রেসিডেন্টের ব্যক্তিগত কর্মকাণ্ড ভোটারদের মাঝে তীব্র অসন্তোষ তৈরি করে, যার প্রভাব পড়েছে ভোটের ফলাফলে। সিএনএনের ভোটার জরিপে দেখা গেছে, প্রতি দশজনের মধ্যে ছয়জনেরও বেশি ভোটার ট্রাম্পের কর্মকাণ্ড অনুমোদন করেন না। এছাড়া অংশগ্রহণকারীদের দুই-তৃতীয়াংশ মনে করছেন, ট্রাম্পের গৃহীত নীতির ফলেই মার্কিন অর্থনীতি আরও সংকটাপন্ন হয়েছে।

আরও পড়ুন:  তেহরানে রাইসি’র জানাজায় শোকার্ত মানুষের ঢল

কংগ্রেসের দুই কক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের ফলে আগামী দিনগুলোতে ট্রাম্প প্রশাসনের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত তদন্ত করা এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের হাজির করতে আইনি সমন জারির ক্ষমতা পাবে ডেমোক্র্যাটরা। একই সাথে সিনেটের ক্ষমতা কাজে লাগিয়ে ট্রাম্পের বিচারক নিয়োগ এমনকি সুপ্রিম কোর্টের শূন্য পদে নিয়োগের প্রক্রিয়া আটকে দেওয়ার ক্ষমতাও দলটির হস্তগত হলো। তবে প্রেসিডেন্টের নিজস্ব ভেটো দেওয়ার ক্ষমতা এবং সিনেটে আইন পাসের ক্ষেত্রে বিদ্যমান ৬০ ভোটের নিয়মের কারণে নিজেদের আইন বা কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে ডেমোক্র্যাটদেরও বাধার মুখে পড়তে হবে। তথাপি, ওয়াশিংটনে ক্ষমতার এই নাটকীয় পরিবর্তন ট্রাম্পের মেয়াদের শেষ দুই বছরকে চরম রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ ও চাপে ফেলতে যাচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

18 − eight =