রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জ্বালানি নিরাপত্তা, দক্ষ জনশক্তি অভিবাসন, কারিগরি শিক্ষা, বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব আরো বাড়াতে অস্ট্রেলিয়ার সহযোগিতার আহ্বান জানিয়েছেন। এ সময় তিনি বাংলাদেশের জ্বালানি উৎস বহুমুখীকরণে অস্ট্রেলিয়ার সহযোগিতা কামনা করেন এবং অস্ট্রেলিয়া থেকে এলএনজি আমদানির সুযোগ তৈরির প্রস্তাব দেন।
গতকাল অস্ট্রেলিয়ার হাইকমিশনার সুসান রাইল বঙ্গভবনে সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে গেলে রাষ্ট্রপতি এসব কথা বলেন।
এ সময় অস্ট্রেলিয়ার হাইকমিশনার অস্ট্রেলিয়ার গভর্নর জেনারেল স্যাম মস্টিন এসির পক্ষ থেকে রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে অভিনন্দন জানান এবং আনুষ্ঠানিক শুভেচ্ছাপত্র প্রদান করেন। শুভেচ্ছা জ্ঞাপনের জন্য রাষ্ট্রপতি গভর্নর জেনারেলকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানান।
অবকাঠামো, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, জ্বালানি অনুসন্ধান, কৃষি প্রক্রিয়াজাত, চিকিৎসা কৌশল, লজিস্টিকস ও উৎপাদন খাতে অস্ট্রেলিয়ার আরো বিনিয়োগের আহ্বান জানান রাষ্ট্রপতি। আগামী নভেম্বরে ক্যানবেরায় অনুষ্ঠেয় সিনিয়র কর্মকর্তাদের বৈঠক ও টিআইএফএ বৈঠক দুই দেশের বাণিজ্য এবং বিনিয়োগ সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা প্রকাশ করেন রাষ্ট্রপতি।
বাংলাদেশী পেশাজীবীদের জন্য বিশেষ করে তথ্যপ্রযুক্তি, প্রকৌশল ও অন্যান্য কারিগরি ক্ষেত্রে অস্ট্রেলিয়ার দক্ষ জনশক্তি অভিবাসনের সুযোগকে স্বাগত জানান রাষ্ট্রপতি। এছাড়া বৃত্তি ও একাডেমিক বিনিময় কর্মসূচিতে অস্ট্রেলিয়ার অব্যাহত সহযোগিতা এবং ঢাকায় ইউনিভার্সিটি অব ক্যানবেরার একটি ক্যাম্পাস প্রতিষ্ঠায় সহযোগিতা কামনা করেন তিনি।
বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান কর্মশক্তির জন্য কর্মোপযোগী দক্ষতা উন্নয়নে অস্ট্রেলিয়ার টেকনিক্যাল অ্যান্ড ফার্দার এডুকেশন (টিএএফই) প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোর (টিটিসি) সহযোগিতা সম্প্রসারণের প্রস্তাব দেন রাষ্ট্রপতি। এক্ষেত্রে কেয়ারগিভার প্রশিক্ষণসহ বিভিন্ন কারিগরি প্রশিক্ষণের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
রোহিঙ্গা সংকটের প্রসঙ্গ তুলে রাষ্ট্রপতি দীর্ঘস্থায়ী এ সংকটে অস্ট্রেলিয়ার অব্যাহত মানবিক সহায়তার জন্য কৃতজ্ঞতা জানান এবং সংকটের টেকসই সমাধানে অস্ট্রেলিয়ার সহযোগিতা অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান।
রাষ্ট্রপতি আশা প্রকাশ করেন, বাংলাদেশ-অস্ট্রেলিয়া অংশীদারত্ব ভবিষ্যতে বাস্তব অর্থনৈতিক সুযোগ, দক্ষতা উন্নয়ন, বিনিয়োগ এবং দুই দেশের মানুষের মধ্যে যোগাযোগ ও চলাচল বৃদ্ধির ওপর আরো বেশি গুরুত্ব দেবে।
এ সময় হাইকমিশনার অস্ট্রেলিয়ান ব্যবসায় বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, কর সংস্কার, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও ইতিবাচক রেগুলেটরি ব্যবস্থার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
একই সঙ্গে তিনি বাংলাদেশে ব্যাংকিং রিফর্মের প্রশংসা করেন এবং পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাংলাদেশ-অস্ট্রেলিয়া বিদ্যমান সহযোগিতা আরো জোরদারের বিষয়ে তার দেশের আগ্রহের কথা জানান।
সাক্ষাৎকালে রাষ্ট্রপতির সামরিক সচিব, সচিব, প্রেস সচিব ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব উপস্থিত ছিলেন। অস্ট্রেলিয়ার পক্ষে উপস্থিত ছিলেন ডেপুটি হাইকমিশনার ক্লিনটন পবকে।
শিক্ষাক্ষেত্রে বিশেষ অবদান রাখা ব্যক্তিদের রাষ্ট্রীয়ভাবে মূল্যায়নের আহ্বান রাষ্ট্রপতির: রাষ্ট্রপতি শিক্ষাক্ষেত্রে বিশেষ অবদান রাখা গুণী ব্যক্তিদের রাষ্ট্রীয়ভাবে মূল্যায়ন করে পুরস্কৃত করার আহ্বান জানিয়েছেন। গতকাল ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির উপাচার্য অধ্যাপক ড. সৈয়দ ফরহাত আনোয়ারের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎকালে তিনি এ আহ্বান জানান।
রাষ্ট্রপতির প্রেস সচিব মো. সরওয়ার আলম জানান, সাক্ষাৎকালে ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির উপাচার্য বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক একাডেমিক কার্যক্রম সম্পর্কে রাষ্ট্রপতিকে অবহিত করেন।
তিনি বলেন, ‘ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), লাইফ সায়েন্স, এগ্রো টেকনোলজি ও নার্সিংসহ বর্তমান সময়ের চাহিদা অনুযায়ী কর্মমুখী বিষয়ে শিক্ষার্থীদের পাঠদানে গুরুত্ব দিচ্ছে।’
এ প্রসঙ্গে রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘দ্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে শিক্ষার মান আরো বাড়াতে হবে।’ এ সময় তিনি সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় গবেষণা কার্যক্রম বাড়ানোর তাগিদ দেন।
তিনি বলেন, ‘যারা বিদেশে বিভিন্ন ক্ষেত্রে ভালো করছেন, দেশে তাদের জাতীয় পর্যায়ে স্বীকৃতি দেয়া প্রয়োজন। পুরনো চিন্তাভাবনা থেকে বেরিয়ে এসে আধুনিক, যুগোপযোগী ও কর্মমুখী শিক্ষা ব্যবস্থার নীতি অতি দ্রুত প্রণয়ন করা প্রয়োজন।’
সাক্ষাৎকালে উপাচার্য আসন্ন সমাবর্তন অনুষ্ঠানে আচার্য হিসেবে উপস্থিত থাকার জন্য রাষ্ট্রপতিকে আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ জানান। রাষ্ট্রপতি আমন্ত্রণ গ্রহণ করেন এবং সমাবর্তনে উপস্থিত থাকার আশ্বাস দেন।
এ সময় রাষ্ট্রপতির সচিবরা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভিসি, ট্রেজারার ও রেজিস্ট্রার উপস্থিত ছিলেন।
জনআস্থা ও পেশাদারত্ব বজায় রেখে সাংবাদিকদের দায়িত্ব পালনের আহ্বান রাষ্ট্রপতির: টেলিভিশন সাংবাদিকদের পেশাদারত্ব ও জনআস্থা বজায় রেখে দায়িত্ব পালন করার আহ্বান জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি। তিনি দেশগঠনে ও জনস্বার্থ রক্ষায় যার যার অবস্থান থেকে ভূমিকা রাখারও আহ্বান জানান। রাষ্ট্রপতি দীর্ঘ সংগ্রামের স্মৃতিচারণ করে বলেন, ‘গণতান্ত্রিক উত্তরণ ও পুনঃপ্রতিষ্ঠার দীর্ঘ সংগ্রামে গণমাধ্যমের প্রতিনিধিরা সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন।’ তিনি গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে তাদের সহযোগিতা কামনা করেন।
গতকাল দুপুরে বঙ্গভবনে ব্রডকাস্ট জার্নালিস্ট সেন্টারের (বিজেসি) একটি প্রতিনিধি দল রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে গেলে তিনি এ আহ্বান জানান। সাক্ষাৎকালে দেশের ব্রডকাস্ট সাংবাদিকতা, গণমাধ্যমের বর্তমান পরিস্থিতি, সাংবাদিকদের পেশাগত উন্নয়ন এবং গণমাধ্যমের দায়িত্বশীল ভূমিকা নিয়ে আলোচনা হয়।
রাষ্ট্রপতি গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার দীর্ঘ সংগ্রামে দুঃসময়ে পাশে থাকার স্মৃতি কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করে সাংবাদিকদের ধন্যবাদ জানান। তিনি স্মৃতিকাতর হয়ে বলেন, ‘আপনাদের সাহচর্য, সমর্থন ও ভালোবাসা পেয়েছি।’ ফ্যাসিবাদী শাসনামলে গণমাধ্যমকর্মীদের ওপর জুলুম-নির্যাতনের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আপনাদের পাশে ছিলাম এবং সবসময় আছি। দেশে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার পরিবর্তে গণতন্ত্রচর্চা, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা আনা গেলে আমরাও উন্নত দেশগুলোর মতো ওপরে উঠতে পারতাম।’
রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘শুধু টেলিভিশনের সংখ্যা বাড়ালেই হবে না, এর গুণগত মান বজায় রেখতে হবে।’ তিনি গণমাধ্যম সংস্কার কমিশন গঠন করে গণমাধ্যমের সমস্যা সমাধানের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
সংগঠনটির নেতারা জানান, বিজেসি ট্রাস্টি সংগঠনের মতো সাংবাদিকদের মূলত কল্যাণ নিয়ে কাজ করে। এটি সম্প্রচার সাংবাদিকদের পেশাগত গুণগতমান বজায় রাখতে প্রশিক্ষণ প্রদান করে, স্বাস্থ্য সহায়তা, বীমাসহ ইত্যাদি সুবিধা দেয়। রাষ্ট্রপতি তাদের কল্যাণমূলক কাজে সহযোগিতার আশ্বাস দেন। তিনি তাদের আয়বৃদ্ধির কর্মসূচি গ্রহণের পরামর্শ দেন।
সাক্ষাৎকালে বিজেসি প্রতিনিধি দলের সদস্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন ফাহিম আহমেদ, ইলিয়াস হোসেন, তালাত মামুন, মাহমুদ হাসান, শরিফুল ইসলাম খান, শাহ আজিজুর রহমান কিরণ, জামানুল ফেরদৌস মানু, বেলায়েত হোসেন, নায়লা পারভীন পিয়া ও সাইফুল শাকিল। এ সময় রাষ্ট্রপতির সচিব, প্রেস সচিব ও সহকারী সামরিক সচিব উপস্থিত ছিলেন।







