চলতি বছরের এসএসসি পরীক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবনে কারিকুলাম ও মূল্যায়ন পদ্ধতিতে একাধিক পরিবর্তন এসেছে। নবম শ্রেণিতে তারা নতুন কারিকুলাম ও ভিন্ন মূল্যায়ন পদ্ধতির অভিজ্ঞতা লাভ করলেও পরে আবার লিখিত পরীক্ষাভিত্তিক পদ্ধতিতে ফিরতে হয়েছে। শিক্ষাসংশ্লিষ্টদের মতে, হঠাৎ এ পরিবর্তনের সঙ্গে অনেক শিক্ষার্থী খাপ খাইয়ে নিতে পারেনি।
করোনা মহামারির দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব
করোনা মহামারির কারণে এ ব্যাচের শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবনও ব্যাপকভাবে ব্যাহত হয়েছে।
শিক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু কারিকুলাম ও পরীক্ষা পদ্ধতির পরিবর্তন দিয়ে ফল বিপর্যয়ের ব্যাখ্যা করা যাবে না। শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের মান, শিক্ষকদের দক্ষতা এবং শিক্ষার্থীদের শেখার ঘাটতিও বিবেচনায় নিতে হবে।
শিক্ষকদের একটি অংশও নতুন কারিকুলাম ও মূল্যায়ন পদ্ধতির সঙ্গে যথেষ্ট প্রস্তুতি নিয়ে খাপ খাওয়াতে পারেনি বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। একই সঙ্গে শিক্ষকেরাও নতুন কারিকুলামের জন্য পর্যাপ্ত প্রস্তুত ছিলেন না। ফলে আবার লিখিত ও সৃজনশীল পরীক্ষায় ফিরে আসার পর শিক্ষার্থী ও শিক্ষক দুই পক্ষকেই দ্রুত নতুন পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে হয়েছে।
পরীক্ষায় কঠোরতা ও মূল্যায়নে স্বচ্ছতা
এবার পাসের হার কমার পেছনে পরীক্ষার কঠোরতা ও খাতা মূল্যায়নের বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। সংশ্লিষ্ট অনেকের ধারণা, আগের বছরগুলোর তুলনায় এবার অনিয়ম রোধে বেশি কঠোরতা এবং খাতা মূল্যায়নে নমনীয়তা না দেখানোর প্রভাব ফলাফলে পড়েছে। এবার অত্যন্ত স্বচ্ছতার সঙ্গে পরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে। যারা পড়াশোনা করেছে, তারা কোনো সমস্যার মুখোমুখি হয়নি।
শিক্ষাব্যবস্থায় ধারাবাহিকতার অভাব
শিক্ষা ব্যবস্থায় ঘন ঘন পরিবর্তনের ফলে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে বলে মনে করছেন শিক্ষকরা। যখনই ব্যবস্থার পরিবর্তন হয়, তখনই শিক্ষাসংশ্লিষ্ট সবার জন্য এর সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। তাই শিক্ষা ব্যবস্থায় একটি স্থায়িত্ব প্রয়োজন।
গবেষণায় ঘাটতি
শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন ও শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর নিয়মিত গবেষণা প্রয়োজন। কিন্তু বাংলাদেশে এ ধরনের গবেষণা ধারাবাহিকভাবে করা হয় না। সংশ্লিষ্টদের মতে, পরীক্ষা ব্যবস্থাপনা, মনিটরিং এবং শিক্ষার্থীদের শেখার সুযোগের বৈষম্য পর্যালোচনা না করে শুধু পাসের হার কমার দিকে মনোযোগ দেওয়া ঠিক নয়।
শিক্ষাবৈষম্য
শিক্ষার মানের ক্ষেত্রে শহর ও গ্রামের বৈষম্যও এবারের ফলাফলে প্রতিফলিত হয়েছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। এটি কমিয়ে আনা সম্ভব হলে আরো সন্তোষজনক ফলাফল আশা করা যায়।
ঢাকার ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিভার্সিটি স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষক উর্মি রহমান বলেন, ‘যেহেতু তারা এর আগে কখনো কোনো বোর্ড পরীক্ষায় বসেনি এবং ব্যবহারিক-ভিত্তিক কারিকুলামে অভ্যস্ত ছিল। তাই কিছু শিক্ষার্থী হয়তো নতুন এ লিখিত পরীক্ষা পদ্ধতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে সমস্যায় পড়েছে।’
এ বিষয়ে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, ‘শ্রেণিকক্ষে পাঠদান ও শেখার প্রক্রিয়া ফলাফলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। করোনার পর শিক্ষার মান দৃশ্যমানভাবে হ্রাস পেয়েছে। শহরের তুলনায় গ্রামীণ শিক্ষার বৈষম্যও এ ফলাফলে স্পষ্ট হয়েছে।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. এস এম হাফিজুর রহমান বলেন, ‘পাসের হার অবনতির পেছনে একাধিক কারণ ভূমিকা রেখে থাকতে পারে। স্কুলগুলোতে পাঠদানের অবস্থা এবং শিক্ষকদের দক্ষতাও বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।’







