ইরানের ওপর আবারও নৌ-অবরোধ যুক্তরাষ্ট্রের

ইরানের ওপর আবারও নৌ-অবরোধ আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চূড়ান্ত হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, আগামী সপ্তাহের মধ্যে তেহরান আলোচনার টেবিলে না বসলে দেশটির বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সেতুগুলো উড়িয়ে দেওয়া হবে।

গত মঙ্গলবার রাত ৮টা থেকে ইরানের সব বন্দর ও উপকূলীয় এলাকায় নৌ-অবরোধ পুনরায় কার্যকর করেছে মার্কিন বাহিনী। এর আগে গত এপ্রিলের মাঝামাঝিতে প্রথমবার এই অবরোধ আরোপ করা হয়েছিল এবং স্থায়ীভাবে যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে গত জুনে হওয়া অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তির পর তা প্রত্যাহার করা হয়েছিল। ওই চুক্তিতে ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে আলোচনার জন্য ৬০ দিনের সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু হরমুজ প্রণালী নিয়ে দ্বন্দ্ব তীব্র হওয়ায় সেই আলোচনা থমকে গেছে।

ফক্স নিউজ-এর জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ‘স্পেশাল রিপোর্ট উইথ ব্রেট বেয়ার’-এ দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা তাদের ওপর খুব শক্ত হামলা চালাতে যাচ্ছি। আমরা খুব শক্ত হামলা চালাব। এর পরের রাতেও হামলা চালানো হবে। আর আগামী সপ্তাহে পরিস্থিতি তাদের জন্য আরও ভয়াবহ হবে, কারণ আগামী সপ্তাহে আমরা তাদের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো ধ্বংস করতে যাচ্ছি। আগামী সপ্তাহে আমরা তাদের সেতুগুলো ধ্বংস করতে যাচ্ছি। তারা যদি আলোচনার টেবিলে এসে আলোচনা শুরু না করে, তবে আমরা তাদের সব বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সেতু গুঁড়িয়ে দেব।’

তিনি আরও যোগ করেন, ‘আমি জ্বালানি খাতের লক্ষ্যবস্তুগুলোকে সবার শেষের জন্য বাঁচিয়ে রাখছি, তবে চূড়ান্ত পর্যায়ে আমরা সেখানেও আঘাত করব।’

আরও পড়ুন:  কাতারের উদেইদ ঘাঁটি থেকে সেনা সরিয়ে নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র

উল্লেখ্য, ১৯৪৯ সালের জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ী যুদ্ধ চলাকালে বেসামরিক মানুষের জন্য অপরিহার্য বা গুরুত্বপূর্ণ সেবা খাত ও অবকাঠামোতে (যেমন বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সেতু) হামলা চালানো কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।

সাক্ষাৎকারে ট্রাম্পের কাছে জানতে চাওয়া হয়, ইরানি প্রতিনিধিদের কাছে ওয়াশিংটন কী বার্তা পাঠিয়েছে? জবাবে ট্রাম্প বলেন, ‘তোমাদের জন্য একটি চুক্তিতে পৌঁছানোই ভালো হবে। তোমাদের আর কেউ অবশিষ্ট থাকবে না। আমরা বেসামরিক জনগণের নিরাপত্তার বিষয়ে অত্যন্ত সতর্কতা অবলম্বন করছি, তবে তোমাদের জন্য একটি চুক্তিতে পৌঁছানোই ভালো হবে, অন্যথায় তোমাদের আর কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না।’

যুক্তরাষ্ট্রের এই চাপ প্রয়োগের তীব্র সমালোচনা করে ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম ঘারিবাবাদী রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র যদি মনে করে আমাদের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা কঠোর করে, সামরিক শক্তি খাটিয়ে কিংবা অর্থনৈতিক অবরোধ দিয়ে আমাদের আলোচনায় ফেরানো যাবে, তবে তারা ভুল করছে।’

অনুষ্ঠানের সঞ্চালক ব্রেট বেয়ার ট্রাম্পকে জিজ্ঞেস করেন—ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি থেকে বিরত রাখা, হরমুজ প্রণালী উন্মুক্ত রাখা এবং দেশটির সামরিক সক্ষমতা ধ্বংস করার মতো মার্কিন যুদ্ধ লক্ষ্যগুলো কেবল বিমান হামলার মাধ্যমে অর্জন করা সম্ভব কি না?

জবাবে ট্রাম্প দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ লক্ষ্যগুলো ইতোমধ্যেই অর্জিত হয়েছে; যদিও বাস্তবে ইরান সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত এখনও বজায় রেখেছে এবং হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল যুদ্ধপূর্ব সময়ের তুলনায় মাত্র ১০ শতাংশে নেমে এসেছে। এ বিষয়ে ট্রাম্প বলেন, ‘মানুষ যদি যাতায়াত করতে চায়, তবে পথটি উন্মুক্ত রয়েছে।’

আরও পড়ুন:  মধ্যপ্রাচ্যে রেকর্ড সংখ্যক বিমান শক্তি মোতায়েন যুক্তরাষ্ট্রের

ইরানের উচ্চ-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুতের বিষয়টিকে ট্রাম্প আবারও হালকাভাবে উপস্থাপন করে বলেন, ‘মার্কিন বাহিনী সার্বক্ষণিকভাবে ইরানের পারমাণবিক সাইটগুলোর ওপর নজরদারি চালাচ্ছে।’ মাটির গভীরে অবস্থিত ইরানের ‘পিকঅ্যাক্স পর্বত’-এর পরমাণু স্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্রের আঘাত করার সক্ষমতা আছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, ‘পিকঅ্যাক্স সম্পর্কে কেউ জানে না।’ তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, ‘ওই সাইটের ওপরও নজর রাখছে ওয়াশিংটন এবং প্রয়োজনে পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’

তেহরানের বাইরে অবস্থিত ‘তালেগান স্থাপনা’ যেটি যুদ্ধের সময় আঘাতপ্রাপ্ত হওয়ার পর ইরান আবার মেরামত শুরু করেছে, সেটির বিষয়ে ট্রাম্প দাবি করেন, আমরা ওই স্থাপনায় খুব সহজেই আঘাত করতে পারি।

ইরানের সঙ্গে আলোচনার টেবিলে বসা নিয়ে ট্রাম্পের বক্তব্যে মিশ্র সুর দেখা গেছে। ট্রাম্প প্রথমে বলেন, ‘তিনি আর আলোচনা করতে চান না কারণ ইরান গত সপ্তাহে করা একটি চুক্তি ভঙ্গ করেছে। কিন্তু এর কয়েক সেকেন্ড পরেই তিনি স্বীকার করেন, তার উপদেষ্টারা ‘মাত্র গত এক ঘণ্টার মধ্যেও’ ইরানি প্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলেছেন।

পাল্টাপাল্টি হামলা

বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পঞ্চম নৌবহরের (ফিফথ ফ্লিট) প্রধান ঘাঁটিতে বড় ধরনের এক ‘বিধ্বংসী হামলা’ চালিয়ে সেখানে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির দাবি করেছে ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডস (আইআরজিসি)। বুধবার সকালে চালানো এই হামলায় ঘাঁটির কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল সেন্টার, নৌ-সহায়তা ব্যবস্থাপনা কেন্দ্র, গুদামঘর এবং জ্বালানি ট্যাংকগুলো ধ্বংস হয়ে গেছে বলে আইআরজিসির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে।

আরও পড়ুন:  দেশে দেশে মার্কিন আগ্রাসনের নজিরবিহীন যত ঘটনা

অন্যদিকে, মার্কিন সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, তারা স্থানীয় সময় গত মঙ্গলবার রাত ১০টায় ইরানের ওপর নতুন করে আরেক দফা বিমান হামলা সম্পন্ন করেছে। এই হামলায় ‘হরমুজ প্রণালী এবং ইরানের উপকূলীয় অঞ্চলের কাছাকাছি অবস্থিত ডজনখানেক সামরিক লক্ষ্যবস্তু’ ধ্বংস করা হয়েছে।

মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, সাত ঘণ্টাব্যাপী পরিচালিত এই অভিযানে মার্কিন ফাইটার জেট, ড্রোন এবং যুদ্ধজাহাজ থেকে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সাইট, নৌ সক্ষমতা এবং উপকূলীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা লক্ষ্য করে নিখুঁতভাবে ‘গাইডেড’ বা নির্ভুল যুদ্ধাস্ত্র (প্রিসিশন মিউনিশন) নিক্ষেপ করা হয়েছে।

সেন্টকমের দাবি, ‘বাণিজ্যিক জাহাজ এবং বেসামরিক নাবিকদের ওপর হুমকি সৃষ্টি করার ইরানি সক্ষমতা আরও দুর্বল করে দেওয়ার’ লক্ষ্যেই এই নতুন হামলাগুলো চালানো হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *