চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে সারা দেশে গণপিটুনি ও মব সহিংসতার ২৬১টি ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় ১৩৩ জন নিহত ও ২৫৬ জন আহত হয়েছেন। বুধবার (১৫ জুলাই) হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) প্রকাশ করা দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতির অর্ধবার্ষিক প্রতিবেদনে (জানুয়ারি-জুন) এসব তথ্য জানানো হয়।
দেশের মূলধারার ১৬টি জাতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ, এইচআরএসএসের সংগৃহীত তথ্য ও ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং রিপোর্টের ভিত্তিতে ছয় মাসের মানবাধিকার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে এসব তথ্য সংকলন করা হয়েছে প্রতিবেদনে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, বাগ্বিতণ্ডা, আধিপত্য বিস্তার, ধর্মীয় অবমাননাসহ বিভিন্ন কারণ দেখিয়ে এসব গণপিটুনি ও মব সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। গত বছর অর্থাৎ ২০২৫ সালের একই সময়ে এ ধরনের ১৪১টি ঘটনায় অন্তত ৬৭ জন নিহত ও ১১৯ জন আহত হয়েছিলেন।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, বিগত ছয় মাসে সারা দেশে রাজনৈতিক ও নির্বাচনী সহিংসতার ঘটনায় দলীয় কোন্দল ও অন্তর্কোন্দলে ৫৬ জন নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া বিভিন্ন সহিংসতার ঘটনায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ৫ হাজার ২৪৬ জনের বেশি নেতা-কর্মী ও সাধারণ মানুষ আহত এবং হামলার শিকার হয়েছেন।
রাজনৈতিক পরিচয় হিসাবে নিহত ৫৬ জনের মধ্যে বিএনপির ৩৭ জন, শতকরা হিসাবে যা প্রায় ৬৬ শতাংশ, জামায়াতে ইসলামীর ছয়জন, যা ১১ শতাংশ এবং আওয়ামী লীগের (কার্যক্রম নিষিদ্ধ) তিনজন।
এ ছাড়া ৮৩০টি সহিংসতার ঘটনার ৬৭৩টিই ঘটেছে বিএনপির অন্তর্কোন্দল ও বিএনপির সঙ্গে অন্যান্য রাজনৈতিক দলের মধ্যে; যা শতকরা হিসাবে ৮১ শতাংশ।
প্রতিবেদনে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতার তথ্যে বলা হয়, গত ছয় মাসে নির্বাচনকেন্দ্রিক ৩৯৬টি সহিংসতার ঘটনায় ১৩ জন নিহত ও ২ হাজার ৫৭৮ জন আহত হয়েছেন।
এ ছাড়া নির্বাচনপূর্ব ও নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে ৬০০টির বেশি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, বাড়িঘর ও নির্বাচনী কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা সংঘটিত হয়েছে।
রাজনৈতিক মামলা ও আটকের বিষয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ছয় মাসে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগ (কার্যক্রম নিষিদ্ধ) এবং বিএনপি-জামায়াতের নেতা-কর্মীদের মধ্যকার সহিংসতায় এবং বিভিন্ন সন্ত্রাসবিরোধী আইনের ধারায় কমপক্ষে ১৪৪টি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় ৩ হাজার ২৬৮ জনের নাম উল্লেখ করে ও ২৪ হাজার ৫১৮ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ছয় মাসে ১ হাজার ৬২১ জন নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে, যা ২০২৫ সালের একই সময়ে ১ হাজার ৪২ জন ছিল। অর্থাৎ, নির্যাতনের ঘটনা প্রায় ৫৬ শতাংশ বেড়েছে। এ বছর নির্যাতনের শিকার ১ হাজার ৬২১ জন নারী ও কন্যাশিশুর মধ্যে ধর্ষণের শিকার হয়েছে ৪০৪ জন; যাদের মধ্যে ২৩৮ জন (৫৯ শতাংশ) ১৮ বছরের কম বয়সী শিশু ও কিশোরী। ৮৮ জন (২৭ শতাংশ) নারী ও কন্যাশিশু দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছে এবং ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ১৭ জনকে।
যৌতুকের জন্য নির্যাতনের ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১৯ জন ও আহত আটজন এবং তিনজন নারী আত্মহত্যা করেছেন। পারিবারিক সহিংসতার শিকার হয়ে নিহত হয়েছেন ৩২০ জন, আহত হয়েছেন ২১১ জন এবং আত্মহত্যা করেছেন ১৪৭ জন নারী।
মত প্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ছয় মাসে ৪০টি সভা ও সমাবেশ আয়োজনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সরাসরি বা পরোক্ষভাবে বাধা দেয়। এতে ৩১১ জন ব্যক্তি আহত ও ৩৮ জন আটক হন, যাদের মধ্যে রাজনৈতিক কর্মী, শিক্ষার্থী, শ্রমিক ও সাধারণ পথচারীও অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। এই সময়ে সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ২০২৫-এর বিভিন্ন ধারার অধীনে পৃথক ৩০টি মামলায় ৮১ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। গ্রেপ্তার করা হয়েছে ৪৪ জনকে।
সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনার তথ্য উল্লেখ করে বলা হয়েছে, ছয় মাসে ২০০টি হামলার ঘটনায় ৩৮৩ জন সাংবাদিক নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। এসব ঘটনায় আহত হয়েছেন ২৩৪ জন, লাঞ্ছনার শিকার হয়েছেন ৬০ জন ও হুমকির সম্মুখীন হয়েছেন ৪৯ জন সাংবাদিক এবং ১১ জন সাংবাদিককে আটক করা হয়েছে।
সংখ্যালঘু নির্যাতন ও হামলার ঘটনার উদ্বেগ জানিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ছয় মাসে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর ৫০টি হামলার ঘটনায় ৫৬ জন আহত হয়েছেন এবং ১৯টি মন্দির, ১৫টি প্রতিমা ও ৪৩টি বসতবাড়িতে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে।
সীমান্তে হতাহত ও আটকের ঘটনায় উদ্বেগ জানিয়ে এইচআরএসএসের প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ছয় মাসে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে ৩২টি হামলার ঘটনায় ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) হামলায় ৯ জন নিহত ও ৩৫ জন আহত হয়েছেন, এর মধ্যে গুলিবিদ্ধ ১৪ জন। বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে ২০টি সহিংসতার ঘটনায় একজন নিহত, পাঁচজন আহত ও পাঁচজন গুলিবিদ্ধ হন।
বিচারবহির্ভূত হত্যার (হেফাজতে/নির্যাতনে/গুলি/বন্দুকযুদ্ধে মৃত্যু) বিষয়ে সংস্থাটির পক্ষ থেকে উদ্বেগ জানিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজত, নির্যাতন, গুলিবর্ষণ ও কথিত ‘বন্দুকযুদ্ধের’ ঘটনায় ১১ জনের মৃত্যু হয়েছে। প্রথম ছয় মাসে সারা দেশে কারাগারে কমপক্ষে ৫৮ জন আসামি মারা গেছেন। এর মধ্যে ১৫ জন আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের এবং একজন বিএনপির ও ৪২ জন সাধারণ কয়েদি।
সার্বিক বিষয়ে এইচআরএসএসের নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে রাজনৈতিক ও নির্বাচনী সহিংসতা, মব সহিংসতা, কারাগার ও হেফাজতে মৃত্যু, নারী ও শিশু নির্যাতন, সাংবাদিক ও শ্রমিক নির্যাতন, রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং মত প্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ—এসব বিষয় সমাধান করা না হলে মানবাধিকার পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে যেতে পারে।







