ডিজিটাল ব্যাংকের প্রাথমিক অনুমোদন দিল বাংলাদেশ ব্যাংক

শাখা নেই, কাউন্টার নেই, নেই নিজস্ব এটিএম; তবু পূর্ণাঙ্গ ব্যাংকিং সেবা। মোবাইল ফোনের পর্দাতেই হিসাব খোলা থেকে টাকা স্থানান্তর, লেনদেন ও ঋণের আবেদন- সবকিছু। দীর্ঘদিনের আলোচনা ও নানা দফার যাচাই-বাছাই শেষে দেশে এমন ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাস্তবায়ন এখন আর কাগজে আটকে নেই। দ্বিতীয় দফায় আবেদন করা ১২টি উদ্যোগের মধ্যে চারটিকে প্রাথমিক অনুমোদন দিয়ে লেটার অব ইনটেন্ট (এলওআই) দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

একই সঙ্গে আগে অনুমোদন পাওয়া কড়ি ডিজিটাল ব্যাংকও প্রাথমিক অনুমোদন বা এলওআই দেয়া হয়েছে। ফলে কয়েক বছরের অপেক্ষার পর দেশে শাখাবিহীন পাঁচটি ডিজিটাল ব্যাংক চালুর প্রক্রিয়া প্রবেশ করল চূড়ান্ত বাস্তবায়নের পথে। গতকাল বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সভায় এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান।

প্রাথমিক অনুমোদন পাওয়া পাঁচ ডিজিটাল ব্যাংক হলো- ডিকে ডিজিটাল ব্যাংক, বিকাশ ডিজিটাল ব্যাংক, নোভা ডিজিটাল ব্যাংক ও বুস্ট ডিজিটাল ব্যাংক এবং কড়ি। ডিকে ডিজিটাল ব্যাংকের উদ্যোক্তা ভুটানের ডিকে ব্যাংক। বিকাশ ডিজিটাল ব্যাংকের উদ্যোক্তা মোবাইল আর্থিক সেবাদাতা বিকাশের শেয়ারধারীরা। নোভা ডিজিটাল ব্যাংকের উদ্যোগে রয়েছে বাংলালিংক ও স্কয়ার গ্রুপ।

আর বুস্ট ডিজিটাল ব্যাংকের উদ্যোক্তা রবির মূল প্রতিষ্ঠান আজিয়াটা। তবে বেসরকারি খাতের কিছু উদ্যোক্তাদের উদ্যোগে গঠিত একটি আর্থিক প্রযুক্তিভিত্তিক প্রতিষ্ঠান কড়ি। এলওআই পাওয়া মানেই ব্যাংকিং কার্যক্রম শুরুর চূড়ান্ত অনুমোদন নয়

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্ধারিত শর্ত পূরণ, প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত ও সাংগঠনিক অবকাঠামো তৈরি এবং অন্যান্য নিয়ন্ত্রক শর্ত পরিপালনের পর চূড়ান্ত লাইসেন্সের বিষয়টি বিবেচনা করা হবে। বর্তমানে একটি ডিজিটাল ব্যাংক প্রতিষ্ঠায় ন্যূনতম পরিশোধিত মূলধন ৩০০ কোটি টাকা নির্ধারিত রয়েছে।

আরও পড়ুন:  ফেলেপসের রেকর্ড ভাঙলেন মার্শ

প্রচলিত ব্যাংকের মতো ডিজিটাল ব্যাংকের সেবা দিতে শাখা, উপশাখা বা নিজস্ব এটিএম নেটওয়ার্ক থাকবে না। গ্রাহককে ব্যাংকিং সেবা দিতে মূলত মোবাইল ফোন, অ্যাপ ও অন্যান্য ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করা হবে। হিসাব খোলা থেকে শুরু করে টাকা জমা, স্থানান্তর, লেনদেন ও ঋণের আবেদন- সবই হবে প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থায়।

ডিজিটাল ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় থাকবে; তবে সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে কোনো ভৌত স্থাপনা থাকবে না। ব্যাংকগুলো সরাসরি কাউন্টারে সেবা দেবে না। নিজস্ব শাখা, উপশাখা, এটিএম, সিডিএম বা সিআরএমও রাখা যাবে না। প্রয়োজনীয় লেনদেনের জন্য প্রচলিত ব্যাংক, মোবাইল আর্থিক সেবা এবং বিদ্যমান এটিএম, সিডিএম ও সিআরএম নেটওয়ার্ক ব্যবহার করা যাবে।

গ্রাহকদের জন্য দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা ডিজিটাল সেবা দেওয়ার সুযোগ থাকবে। ভার্চ্যুয়াল কার্ড, কিউআর কোডসহ বিভিন্ন প্রযুক্তিনির্ভর পণ্য চালু করতে পারবে ডিজিটাল ব্যাংক। তবে প্রচলিত প্লাস্টিক কার্ড ইস্যু করার সুযোগ থাকবে না।

ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রেও থাকবে নির্দিষ্ট সীমাবদ্ধতা। ডিজিটাল ব্যাংক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক বিকল্প ঋণ মূল্যায়ন পদ্ধতি ব্যবহার করতে পারবে। জামানতবিহীন ছোট ঋণের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কথা রয়েছে। তবে বৈদেশিক বাণিজ্য ঋণ, ঋণপত্র এবং মাঝারি ও বড় শিল্প খাতে ঋণ দেওয়ার সুযোগ থাকবে না। নিয়ন্ত্রক কাঠামো ও ডিজিটাল রেকর্ড সংরক্ষণের শর্ত পূরণ সাপেক্ষে সাধারণ অনুমোদিত বৈদেশিক রেমিট্যান্স গ্রহণ করতে পারবে এসব ব্যাংক।

২০২৩ সালের ১৪ জুন প্রথমবারের মতো ডিজিটাল ব্যাংক প্রতিষ্ঠার নীতিমালা জারি করে বাংলাদেশ ব্যাংক। তখন একটি ডিজিটাল ব্যাংকের ন্যূনতম পরিশোধিত মূলধন নির্ধারণ করা হয়েছিল ১২৫ কোটি টাকা। তবে ২০২৫ সালের ২৪ আগস্ট জারি করা প্রজ্ঞাপনে তা বাড়িয়ে ৩০০ কোটি টাকা করা হয়। অর্থাৎ দুই বছরের ব্যবধানে মূলধনের প্রয়োজনীয়তা বেড়েছে ১৭৫ কোটি টাকা।

আরও পড়ুন:  ৬ ব্যাংকের এমডিকে বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠানোর সিদ্ধান্ত

প্রচলিত ব্যাংকের ক্ষেত্রে বর্তমানে ন্যূনতম মূলধন প্রয়োজন ৫০০ কোটি টাকা। ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্স দেওয়া হবে ১৯৯১ সালের ব্যাংক কোম্পানি আইনের আওতায়। আর পেমেন্ট সেবা পরিচালিত হবে ২০১৪ সালের বাংলাদেশ পেমেন্ট অ্যান্ড সেটেলমেন্ট সিস্টেমস রেগুলেশনের অধীনে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা অনুযায়ী, লাইসেন্স পাওয়ার পাঁচ বছরের মধ্যে প্রতিটি ডিজিটাল ব্যাংককে প্রাথমিক গণপ্রস্তাব বা আইপিওতে যেতে হবে। আইপিওর আকার উদ্যোক্তাদের প্রাথমিক বিনিয়োগের অন্তত সমপরিমাণ হতে হবে।

দেশে ডিজিটাল ব্যাংক চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয় কয়েক বছর আগে। প্রথম দফায় কড়ি ডিজিটাল ব্যাংক ও নগদ ডিজিটাল ব্যাংককে এলওআই দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে নগদ ডিজিটাল ব্যাংকের অনুমোদনের বিষয়টি পুনর্বিবেচনার আওতায় আসে।

এরপর দ্বিতীয় দফায় ২০২৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর থেকে ২ নভেম্বর পর্যন্ত ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্সের জন্য আবেদন নেওয়া হয়। এতে ১২টি প্রতিষ্ঠান আবেদন করে। আবেদনকারীদের মধ্যে মোবাইল আর্থিক সেবাদাতা, টেলিযোগাযোগ প্রতিষ্ঠান, শিল্পগোষ্ঠী, ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠান এবং বিদেশি অংশীদার থাকা বিভিন্ন উদ্যোগ ছিল।

আবেদন যাচাই-বাছাই ও মূল্যায়নে দীর্ঘ সময় লাগার পর বৃহস্পতিবার চারটি উদ্যোগকে প্রাথমিক অনুমোদন এবং এলওআই দেওয়ার সিদ্ধান্ত হলো। ফলে কয়েক বছর ধরে চলা ডিজিটাল ব্যাংক চালুর উদ্যোগ এখন বাস্তবায়নের আরও কাছাকাছি পৌঁছেছে।

উল্লেখ্য, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ডিজিটাল ব্যাংকের অনুমোদনের জন্য ন্যূনতম পরিশোধিত মূলধন ১২৫ কোটি টাকা নির্ধারিত ছিল। পরে নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর বাংলাদেশ ব্যাংক মূলধনের সীমা বাড়িয়ে ৩০০ কোটি টাকা করে।

আরও পড়ুন:  সংসদে রুমিন ফারহানাকে অশালীন ভাষায় গালাগালের অভিযোগ

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিকল্পনায় ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের অন্যতম লক্ষ্য হলো প্রযুক্তির মাধ্যমে ব্যাংকিং সেবা আরও সহজ ও বিস্তৃত করা। বিশেষ করে প্রত্যন্ত এলাকার মানুষ এবং কুটির, মাইক্রো ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের আনুষ্ঠানিক আর্থিক ব্যবস্থার আওতায় আনতে এ ধরনের ব্যাংক ভূমিকা রাখতে পারে।

প্রচলিত ব্যাংকের শাখা পরিচালনায় ভবন, জনবল ও অন্যান্য অবকাঠামোগত ব্যয় রয়েছে। ডিজিটাল ব্যাংকের ক্ষেত্রে এসব ভৌত অবকাঠামোর প্রয়োজন না থাকায় প্রযুক্তিনির্ভরভাবে তুলনামূলক কম ব্যয়ে সেবা দেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।

বিশেষ করে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের একটি অংশ এখনো অনানুষ্ঠানিক উৎস থেকে অর্থায়ন নিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করেন। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে তাদের ঋণ ও অন্যান্য আর্থিক সেবায় যুক্ত করা গেলে আনুষ্ঠানিক অর্থায়নের পরিধি বাড়তে পারে।

তবে ডিজিটাল ব্যাংককে প্রচলিত ব্যাংকের বিকল্প হিসেবে নয়, বরং বিদ্যমান ব্যাংকিং ব্যবস্থার পরিপূরক হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। প্রযুক্তিনির্ভর ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, গ্রাহকের তথ্য সুরক্ষা এবং কার্যকর নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করেই এ খাতের বিকাশ ঘটানোর লক্ষ্য বাংলাদেশ ব্যাংকের।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

20 − one =