আত্মহত্যার ঝুঁকিতে মার্কিন রণতরির ৫ হাজার নাবিক

টানা ২৬৫ দিনের বেশি সমুদ্রে মোতায়েন থাকা ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনের বদলে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন বিমানবাহী রণতরি পাঠিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের মধ্যে রণতরিটিতে খাদ্য, প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও নাবিকদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সংকট দেখা দেওয়ার পর ইউএসএস জর্জ ওয়াশিংটনকে সেখানে পাঠানো হচ্ছে।

ব্রিটিশ দৈনিক দ্য টেলিগ্রাফের প্রতিবেদনে থেকে জানা যায়, মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত ও যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে রণতরিটির মোতায়েনের মেয়াদ গত মে মাসে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও তা দফায় দফায় বৃদ্ধি করা হয়। প্রায় ৫ হাজার সেনাসদস্য সংবলিত এই রণতরিতে দীর্ঘদিন ধরে টয়লেট, শাওয়ার, মানসম্মত খাবার এবং প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের তীব্র সংকট চলছিল। দীর্ঘ সময় স্থলভাগে নামতে না পারা এবং চরম শারীরিক ও মানসিক চাপের কারণে জাহাজের নাবিকেরা মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে।

এ ছাড়া নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, যুদ্ধের প্রথম সপ্তাহেই ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন নৌবাহিনীর মূল লজিস্টিক হাব বা রসদ সরবরাহ কেন্দ্রটি ধ্বংস হয়ে যায়। ফলে রণতরিটিতে রসদ পাঠাতে মার্কিন বাহিনীকে হাজার হাজার মাইল দূরে ভারত মহাসাগরের ডিয়েগো গার্সিয়া ঘাঁটির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছিল। দূরত্বের কারণে সরবরাহে বিঘ্ন ঘটে এবং রণতরিটির নাবিকদের তীব্র সংকটের মুখে পড়তে হয়।

আরও পড়ুন:  পদত্যাগ করেছেন প্রধান বিচারপতি

শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, কয়েকজন নাবিক জাহাজ থেকে সাগরে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছেন। সম্প্রতি একজন নাবিক জাহাজ থেকে ঝাঁপ দেন বলেও বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

দিয়েগো গার্সিয়ায় মার্কিন সামরিক কার্যক্রম নিয়ে যুক্তরাজ্যের সঙ্গেও বিরোধ হয়েছিল। সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার প্রথমে ইরানে হামলার জন্য পেন্টাগনকে ঘাঁটিটি ব্যবহারের অনুমতি দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। পরে ট্রাম্পের সমালোচনার মুখে ১ মার্চ তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে ‘নির্দিষ্ট ও সীমিত প্রতিরক্ষামূলক উদ্দেশে’ ঘাঁটিটি ব্যবহারের অনুমতি দেন।

এর জেরে মার্চে ইরান দিয়েগো গার্সিয়ায় দুটি মাঝারি পাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে। তবে কোনোটি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারেনি।

আব্রাহাম লিংকন ২০২৫ সালের ২১ নভেম্বর ক্যালিফোর্নিয়ার সান দিয়েগো থেকে দক্ষিণ চীন সাগরে যাওয়ার জন্য যাত্রা করে। পরে ফেব্রুয়ারিতে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’র আগে সেটিকে মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানো হয়। মে মাসে ফেরার কথা থাকলেও কোনো নির্দিষ্ট ফেরার তারিখ ছাড়াই মোতায়েনের সময় বাড়ানো হয়।

আরও পড়ুন:  মধ্যপ্রাচ্যে বিমানবাহী রণতরি ‘জর্জ ওয়াশিংটন’ মোতায়েন

এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প রণতরিটির নাবিকদের মানসিক ও শারীরিক সংকটের বিষয় সম্পর্কিত প্রশ্ন এড়িয়ে বলেছেন, এই মোতায়েনের সময় ‘মোটেও দীর্ঘ ছিল না’। তবে তিনি নিশ্চিত করেছেন, ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনের স্থলাভিষিক্ত হতে অন্য একটি সমমানের বিমানবাহী রণতরি পাঠানো হচ্ছে। আজ শুক্রবার সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘আব্রাহাম লিংকন খুব শিগগিরই ফিরছে এবং এর জায়গায় একই ধরনের আরেকটি রণতরি পাঠানো হচ্ছে।’

নতুন রণতরি ইউএসএস জর্জ ওয়াশিংটনও নিমিটজ শ্রেণির। এটি জাপানে অবস্থান করছিল এবং সাম্প্রতিক সময়ে প্রশান্ত মহাসাগরে কার্যক্রম চালাচ্ছিল। মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানোর সিদ্ধান্ত আগে থেকেই নির্ধারিত রোটেশন পরিকল্পনার অংশ। আগামী নয় দিনের মধ্যে রণতরিটি সেখানে পৌঁছে ইরান যুদ্ধে থাকা মার্কিন বাহিনীকে সহায়তা করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

আরও পড়ুন:  ব্রিকসের যৌথ ঘোষণায় ঐকমত্য, সব ধরনের আগ্রাসনের নিন্দা

তবে জর্জ ওয়াশিংটনের মধ্যপ্রাচ্যে যাত্রার ফলে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে সাময়িকভাবে মার্কিন নৌবাহিনীর উপস্থিতিতে ঘাটতি তৈরি হবে। একই সময়ে ওই অঞ্চলে চীনও একটি বিমানবাহী রণতরি মোতায়েন করেছে। আরেক মার্কিন রণতরি ইউএসএস জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশও মার্চের ৩১ তারিখ নরফোক থেকে যাত্রার পর কয়েক মাস ধরে মধ্যপ্রাচ্যে রয়েছে।

জর্জ ওয়াশিংটনে সর্বোচ্চ ৬ হাজার ২৫০ জন নাবিক থাকতে পারেন এবং এতে প্রায় ৯০টি বিমান রাখা যায় (আব্রাহাম লিংকনের সমান)।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

12 + 13 =