রাশিয়া থেকে ভারতে সরাসরি রেল যোগাযোগের কথা ভাবছে মস্কো

বসফরাস প্রণালি ও হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরতা কমাতে ভারত মহাসাগর পর্যন্ত সরাসরি রেলপথ নির্মাণের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কথা বলেছে রাশিয়া। দেশটির উপপ্রধানমন্ত্রী মারাত খুসনুলিন সম্প্রতি রুশ বার্তা সংস্থা তাসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এ কথা জানিয়েছেন।

খুসনুলিন বলেছেন, রাশিয়ার উচিত ভারত মহাসাগর পর্যন্ত একটি রেল যোগাযোগব্যবস্থা নির্মাণের সম্ভাব্যতা পরীক্ষা করা। বসফরাস ও হরমুজ প্রণালিতে চলাচলের ঝুঁকি বাড়ায় বিকল্প রুটের প্রয়োজন হতে পারে। এ ক্ষেত্রে তুর্কমিনিস্তান, ইরান, আফগানিস্তান ও পাকিস্তান হয়ে ভারত পর্যন্ত যেসব পথ তৈরি করা সম্ভব, সেগুলো বিবেচনা করা যেতে পারে।

সংবাদ সংস্থা তাস রুশ উপপ্রধানমন্ত্রী খুসনুলিনকে উদ্ধৃত করে লিখেছে, ‘ভারত মহাসাগর পর্যন্ত একটি রেলপথ করা যায় কি না, ভেবে দেখা উচিত। বসফরাস ও হরমুজ প্রণালিসংক্রান্ত ঝুঁকির কারণে তুর্কমিনিস্তান, ইরান, আফগানিস্তান ও পাকিস্তান হয়ে বিকল্প রুটের প্রয়োজন হতে পারে। ভারত পর্যন্ত সংযোগ তৈরি করে এমন যেকোনো বিকল্প গ্রহণযোগ্য।’

সাক্ষাৎকারটি প্রকাশের পর ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি বলছে, প্রস্তাবটি বাস্তবায়িত হলে রাশিয়া ও ভারতের মধ্যে সরাসরি স্থলপথে পণ্য পরিবহনের সুযোগ তৈরি হতে পারে। এর ফলে দুই দেশের বাণিজ্যে সামুদ্রিক পথের ওপর নির্ভরতা কমানোর একটি বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে উঠবে।

আরও পড়ুন:  এইচএসসির ফল প্রকাশ হবে ৬ থেকে ৯ অক্টোবরের মধ্যে

হরমুজ প্রণালিতে সাম্প্রতিক অস্থিরতার মধ্যেই রাশিয়ার পক্ষ থেকে এই বিকল্প বাণিজ্যপথের প্রস্তাব সামনে এল। যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে সামরিক সংঘাতের পর গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথে জাহাজ চলাচল নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ সামরিক হামলা শুরু হয়। হামলায় তেহরানসহ ইরানের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি নগর এলাকা লক্ষ্যবস্তু করা হয়। এর জবাবে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) ইসরায়েল, বাহরাইন, জর্ডান, ইরাক, কাতার, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং সৌদি আরবে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়। এরপরই হরমুজ বন্ধ করে দেয় তেহরান।

বিশ্ব বাণিজ্যে হরমুজ প্রণালি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাশিয়ার প্রস্তাবিত বিকল্প রেলপথের অন্যতম কারণ হিসেবে এই নৌপথের ঝুঁকিকেই তুলে ধরেছেন খুসনুলিন। হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের মোট তেল বাণিজ্যের প্রায় ২৫ শতাংশ এবং বৈশ্বিক তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রায় ২০ শতাংশ পরিবহন হয়। কিন্তু ইরান যুদ্ধ শুরুর পর থেকে রুটটি অনিরাপদ হয়ে পড়েছে এবং বিশ্ববাজারের জ্বালানি তেল ও গ্যাসের সংকট দেখা দিয়েছে।

এই নৌপথে দীর্ঘস্থায়ী কোনো বাধা তৈরি হলে জ্বালানি সরবরাহ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে আরও বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে। এমন পরিস্থিতিতে রাশিয়া স্থলপথে ভারতসহ দক্ষিণ এশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্যিক যোগাযোগ বাড়ানোর বিকল্প খুঁজছে বলেই প্রস্তাবটি থেকে ধারণা পাওয়া যায়।

আরও পড়ুন:  ২০২৬ সালে বিশ্বে ক্ষমতার মোড় ঘোরাতে পারে সন্ত্রাসবাদ-এআই

খুসনুলিন সম্ভাব্য রেলপথের নির্দিষ্ট দৈর্ঘ্য, ব্যয় বা নির্মাণ শুরুর সময়সীমা সম্পর্কে কোনো তথ্য দেননি। তবে তিনি বলেছেন, ভারত পর্যন্ত যোগাযোগ তৈরি করতে পারে এমন যেকোনো বিকল্প রুট বিবেচনা করা হবে।

সম্ভাব্য রুট হিসেবে তুর্কমিনিস্তান, ইরান, আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ রাশিয়া থেকে মধ্য এশিয়া হয়ে দক্ষিণে নেমে ইরান ও আফগানিস্তানের মধ্য দিয়ে পাকিস্তান হয়ে ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে পৌঁছানোর একটি স্থলপথ বিবেচনায় থাকতে পারে।

তবে প্রস্তাবটি এখনো সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের পর্যায়েই রয়েছে। এর বাস্তবায়নে একাধিক দেশের ভূখণ্ড, অবকাঠামো, নিরাপত্তা ও আন্তঃদেশীয় সহযোগিতার বিষয় জড়িত থাকবে। খুসনুলিন এসব চ্যালেঞ্জ বা সম্ভাব্য ব্যয় সম্পর্কে বিস্তারিত কিছুই বলেননি।

নির্মাণ খাতেও বিনিয়োগ বাড়ানোর কথা

সাক্ষাৎকারে খুসনুলিন শুধু আন্তর্জাতিক পরিবহন ব্যবস্থা নয়, রাশিয়ার অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির বিষয়েও কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন, দেশটির নির্মাণ খাতকে দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক সহায়তা দিতে হবে।

খুসনুলিন বলেন, ‘রুশ নির্মাণশিল্প ইতিমধ্যে বছরে অতিরিক্ত এক ট্রিলিয়ন রুবেল ব্যবস্থাপনা করার সক্ষমতা রাখে। তবে আগামী পাঁচ বছরের জন্য যদি এমন পরিমাণ অর্থ নিশ্চিত করা যায়, তাহলে সক্ষমতা বাড়িয়ে আরও বেশি নির্মাণ করা সম্ভব হবে।’

আরও পড়ুন:  নতুন আইজিপি মো. ময়নুল ইসলাম

অর্থাৎ রাশিয়ার পরিবহন অবকাঠামো সম্প্রসারণের পাশাপাশি দেশটির নির্মাণ খাতেও দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের ওপর জোর দিয়েছেন উপপ্রধানমন্ত্রী।

ভারতের সঙ্গে সরাসরি রেল যোগাযোগের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের প্রস্তাবটি এমন এক সময়ে এল, যখন আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে সামরিক উত্তেজনা তৈরি হলে বিকল্প স্থলপথের গুরুত্ব বাড়তে পারে।

রাশিয়ার প্রস্তাবিত রেলপথ বাস্তবে রূপ নিলে দেশটির সঙ্গে ভারত ও ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের পণ্য পরিবহনে নতুন একটি করিডর তৈরি হতে পারে। তবে খুসনুলিনের বক্তব্য অনুযায়ী, এ মুহূর্তে এটি একটি সম্ভাব্য বিকল্প হিসেবে বিবেচনায় রয়েছে; প্রকল্পটির বাস্তবায়ন বা নির্মাণ শুরুর বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়নি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

three + 14 =