ফুটবল বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনাকে ঘিরে বাংলাদেশের উচ্ছ্বাস, ভালোবাসা এখন আর বোধ হয় কোনো ফুটবলপ্রেমী আর্জেন্টাইনের কাছেই অজানা নয়। এবারের বিশ্বকাপের কথাই বলি, এখন আর ভেঙেচুরে পরিচয়ও দিতে হয় না। কোথাও বাংলা কথা শুনলেই আর্জেন্টাইনরা দ্রুত বুঝে ফেলে ‘বাংলাদেশের মানুষ’। তারা এগিয়ে আসে, ‘বাংলাদেশ-আর্জেন্টিনা ভাই-ভাই’ বলে বুকে জড়িয়ে ধরে। নিজেদের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য অনুযায়ী নাচে, গায়, উচ্ছ্বাস করে।
২০২৬ বিশ্বকাপ প্রায় শেষ দিকে। বিশ্বকাপের এ যাত্রায় বাংলাদেশের দর্শকদের চাহিদার কথা বিবেচনা করে যুক্তরাষ্ট্রে কাভার করতে আসা বাংলাদেশি সাংবাদিকেরা ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা দল দুটিকে মূলত বেশি অনুসরণ করেছে। ফাঁকে ফাঁকে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর পর্তুগাল, কিলিয়ান এমবাপ্পেদের ফ্রান্স কিংবা হ্যারি কেইনদের ইংল্যান্ডের ম্যাচ কাভার করা। তবে ব্রাজিল শেষ ষোলোয় বাদ পড়ায় আর্জেন্টিনার পথটাই বেশি অনুসরণ করা হয়েছে বিশ্বকাপ কাভার করতে আসা বাংলাদেশি সংবাদমাধ্যমকে।
কানসাস সিটিতে আর্জেন্টিনা দলের বেসক্যাম্প থেকে শুরু করে তাদের সংবাদ সম্মেলন, মিক্সড জোন, অনুশীলন, ম্যাচ, দর্শকদের প্রতিক্রিয়া—এত বেশি কাভার করা হয়েছে, আর্জেন্টাইন সাংবাদিকদের কাছে বাংলাদেশের অধিকাংশ সাংবাদিকই যেন পরিচিত মুখ। তাঁরা বড় আগ্রহভরে শুধু জানতে চায়, প্রায় ১৭ হাজার কিলোমিটার দূরের একটা দেশ, যারা নিজের মতো করেই ধারণ করেছে আকাশি-সাদা জার্সিকে—কেন? বাংলাদেশের অনেক মানুষ কেন আর্জেন্টিনাকে এত পছন্দ করে, সমর্থন করে?
এই ভালোবাসার স্বীকৃতি ২০২২ বিশ্বকাপেই পেয়েছে বাংলাদেশ। ২০২৬ বিশ্বকাপে যেন সেটি আরেক মাত্রা পেয়েছে। ডালাসে জর্ডানের বিপক্ষে ম্যাচ শেষে মিক্সড জোনে এমিলিয়ানো মার্তিনেস চলে গিয়েও এই প্রতিবেদকের ডাকে আবার ফিরে এসেছিলেন। সেটা যেন একজন সাংবাদিকের কাছে ‘মোমেন্ট অব দ্য ক্যারিয়ারে’র মতো। ‘বাংলাদেশ’ শুনেই ফিরে এসে বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম সেরা গোলরক্ষক বলেছিলেন, ‘ও, বাংলাদেশ। আমি বাংলাদেশকে পছন্দ করি।’ প্রতিবেদক তাঁকে বাংলাদেশের ভক্তদের নিয়ে কিছু বলতে বললে মার্তিনেস বলেন, ‘আমি বাংলাদেশের ভক্তদের অনেক ভালোবাসি। সেখানে গিয়েছিলাম (২০২৩ সালে)। সত্যিই দেশটাকে ভালোবাসি।’ এই ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সৌজন্যে শুধু বাংলাদেশেই নয়, ছড়িয়ে পড়ে পুরো ফুটবল পৃথিবীতেই। যেটির প্রমাণ বিশ্বকাপজুড়ে পেয়েছি।
আটলান্টায় আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ডের সেমিফাইনালের আগে আবারও আলোচনায় বাংলাদেশ। আটলান্টা স্টেডিয়ামে হাজারের কাছাকাছি সাংবাদিকের উপস্থিতিতে জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনকক্ষে একের পর এক প্রশ্ন ধেঁয়ে যাচ্ছে আর্জেন্টিনা কোচ লিওনেল স্কালোনির দিকে। বেশির ভাগ প্রশ্নই সেমিফাইনাল ঘিরে। টেকনিক্যাল প্রশ্ন তো ছিলই, এমনকি আর্জেন্টিনা কেন অ্যাওয়ে জার্সি পরে খেলবে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে, এ প্রশ্নও হলো। এত সাংবাদিকের ভিড়ে বাংলাদেশি কারও প্রশ্ন করার সুযোগ পাওয়ার খুব বেশি যৌক্তিকতা নেই, যেহেতু বাংলাদেশ ফুটবল বিশ্বকাপ থেকে এক আলোকবর্ষ দূরে। তবু শেষ দিকে একটা প্রশ্ন করার সুযোগ মিলল এই প্রতিবেদকের।
নিজের দেশ ও প্রতিষ্ঠানের পরিচয় দিয়ে স্কালোনিকে প্রশ্নটা ছিল, আপনাকে কোনো টেকনিক্যাল প্রশ্ন নয় (অসংখ্য টেকনিক্যাল প্রশ্ন আসলে হয়ে গেছে), বরং সাধারণ এক প্রশ্ন করি। ইংরেজিতে প্রশ্ন শুনেই দ্রুত অনুবাদক অ্যাপের হেডফোন কানে নিলেন আর্জেন্টিনা কোচ। তাঁকে জিজ্ঞেস করা হলো, আপনারা জানেন বাংলাদেশে আর্জেন্টিনার লাখ লাখ উৎসাহী সমর্থক রয়েছেন। আগামীকাল (আজ) আর্জেন্টিনা আরেকটি বিশ্বকাপ সেমিফাইনাল খেলতে যাচ্ছে। বাংলাদেশের যেসব ভক্ত আপনাদের সর্বান্তকরণে সমর্থন করেন, তাঁদের উদ্দেশে কী বার্তা দিতে চান?
স্কালোনি তাঁর স্প্যানিশ ভাষায় বললেন, ‘বাংলাদেশের মানুষ আমাদের প্রতিবারই বিস্মিত করে। আর্জেন্টিনা থেকে এত দূরের একটি দেশ, তবু আপনাদের এই অকৃত্রিম ভালোবাসা সত্যিই অভূতপূর্ব। আপনাদের দেশে মানুষকে আর্জেন্টিনার জার্সি গায়ে গর্বের সঙ্গে দেখতে পাওয়া আমাদের জন্য এক অনন্য অনুভূতি। আপনাদের প্রতি আমাদের আন্তরিক কৃতজ্ঞতা। ধন্যবাদ, অসংখ্য ধন্যবাদ।’
দুই-তিনবার কৃতজ্ঞতার সুরে ‘গ্রাসিয়াস’ শব্দটা উচ্চারণ করলেন স্কালোনি। আর্জেন্টিনা কোচের মুখে এমন কৃতজ্ঞতা মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ল চারদিকে। এটা বাংলাদেশের শুধু আর্জেন্টিনা সমর্থকদেরই নয়, সব বাংলাদেশি ফুটবলপ্রেমীরই কাছে ভালো লাগার বিষয়। এতে যেন প্রমাণ হয়, বিশ্বকাপে খেলার না সুযোগ মিললেও ‘গ্রেটেস্ট শো অন আর্থে’র অংশীদার বাংলাদেশও। এতে প্রমাণ হয়, আর্জেন্টিনা-ব্রাজিলের জন্য গলা ফাটানো নিরর্থক নয়, বরং যথেষ্ট অর্থবহ ও যৌক্তিক। বাংলাদেশের মানুষও খুব ভালো করেই চেনে সেই শৈশব—মোজা গুটিয়ে বানানো বল, জুতা দিয়ে গোলপোস্ট চিহ্নিত করা, আর গলিতে হঠাৎ শুরু হয়ে যাওয়া ফুটবল ম্যাচ। ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার মতো এখানেও ফুটবল শুধু একটি খেলা নয়; এটি মানুষের পরিচয়, আবেগ আর একাত্মতার ভাষা।
সেই ভাষা হতে পারে বাংলা, হতে পারে স্প্যানিশ-পর্তুগিজ, কিন্তু তা এক বিন্দুতে মিলিয়ে একটি চর্মগোলক, নাম তার ফুটবল। ফুটবল বিশ্বকাপ তাই না খেলেও খুব প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে বাংলাদেশ। আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ডের মহারণের আগে আসে বাংলাদেশ প্রসঙ্গ। ফুটবল ছাপিয়ে অযুত-নিযুত বাংলাদেশি ফুটবলপ্রেমীর কাছে এটা বড় প্রাপ্তি কি নয়?







