চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আগামী ৩ বছর ও পরবর্তী সময়ে ‘গঠনমূলক, কৌশলগত ও স্থিতিশীল’ সম্পর্ক বজায় রাখার বিষয়ে একমত হয়েছেন।
বৃহস্পতিবার বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত প্রথম দফার বৈঠক শেষে তারা এ বিষয়ে একমত হন বলে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে। তবে ইরান ইস্যুতে এ বিবৃতিতে তেমন কিছু উল্লেখ না করা হলেও হোয়াইট হাউজ জানিয়েছে ইরান যাতে পরমাণু অস্ত্রের অধিকারী না হতে পারে এবং হরমুজ প্রণালি খোলা রাখার ইস্যুতেও দুপক্ষ একমত পোষণ করেছে। খবর রয়টার্স, এএফপি, বিবিসি, এপি, আলজাজিরার।
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়, দুই নেতা ‘গঠনমূলক, কৌশলগত ও স্থিতিশীল’ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের একটি নতুন ভিত্তি স্থাপন করেছেন। এই অবস্থান আগামী তিন বছর ও তার পরবর্তী সময়ের জন্য দুই দেশের সম্পর্কের দিকনির্দেশনা হিসাবে কাজ করবে। বৈঠকের একটি বড় অংশ জুড়ে ছিল অর্থনৈতিক সহযোগিতা।
প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং জোর দিয়ে বলেন, চীন-মার্কিন অর্থনৈতিক সম্পর্কের মূল ভিত্তি হলো পারস্পরিক সুবিধা ও জয়-জয় সহযোগিতা। তিনি স্পষ্ট করে জানান, মার্কিন ব্যবসায়ীদের জন্য চীনের দরজা আরও বড় করে উন্মুক্ত করা হবে।
তিনি দুই দেশের সামরিক বাহিনীর মধ্যে উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার পাশাপাশি বাণিজ্য, স্বাস্থ্য, কৃষি, পর্যটন, সংস্কৃতি এবং আইন প্রয়োগের মতো ক্ষেত্রগুলোতে সহযোগিতা বৃদ্ধির আহ্বান জানান। তবে আলোচনায় তাইওয়ান ইস্যু নিয়ে জিনপিং স্পষ্ট সতর্কবার্তা দিয়েছেন।
তিনি ট্রাম্পকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘তাইওয়ান ইস্যুটি চীন-মার্কিন সম্পর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল বিষয়। যদি এটি সঠিকভাবে সমাধান করা হয় তাহলে সম্পর্ক স্থিতিশীল থাকবে, এ প্রশ্নে মতপার্থক্য দুই দেশের সম্পর্ককে বিপজ্জনক পথে ঠেলে দিতে পারে। এমনকি সংঘাতও সৃষ্টি করতে পারে।’
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আরও জানিয়েছে, দুই নেতা মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি, ইউক্রেন সংকট ও কোরীয় উপদ্বীপের চলমান অস্থিরতা নিয়েও মতবিনিময় করেছেন।
আর হোয়াইট হাউজের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ট্রাম্প ও শি-র মধ্যে ‘অত্যন্ত ফলপ্রসূ’ বৈঠক হয়েছে। সেখানে মার্কিন কোম্পানিগুলোর জন্য চীনের বাজার উন্মুক্ত করা এবং যুক্তরাষ্ট্রের শিল্প খাতে চীনা বিনিয়োগ বাড়ানোসহ অর্থনৈতিক সহযোগিতা বৃদ্ধির উপায় নিয়ে আলোচনা হয়।
বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তম কিছু কোম্পানির শীর্ষ নির্বাহীও অংশ নেন। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রে ‘ফেন্টানিল’ নামে মাদক তৈরির রাসায়নিকের প্রবাহ বন্ধ করার গুরুত্ব নিয়ে দুই নেতা কথা বলেন।
ইরান যুদ্ধ নিয়ে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় খুব একটা আলোকপাত না করলেও হোয়াইট হাউজের বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, ‘উভয় দেশ একমত হয়েছে যে, ইরান কখনোই পারমাণবিক অস্ত্রের অধিকারী হতে পারবে না।’
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, দুপক্ষই বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহ সচল রাখতে ‘হরমুজ প্রণালি’ উন্মুক্ত রাখার বিষয়ে ঐকমত্য পোষণ করেছে। আলোচনার সময় প্রেসিডেন্ট শি হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরতা কমাতে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আরও বেশি তেল কেনার বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেন।
এর আগে বেইজিংয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের মধ্যে বৈঠক দুই ঘণ্টা ১৫ মিনিট ধরে চলে, যা নির্ধারিত সময়ের দ্বিগুণ।
আলোচনা কেমন হয়েছে, সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প শুধু এক শব্দে বলেন-‘চমৎকার’। সেটারই ইঙ্গিত করে ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠক শুরুর আগে উদ্বোধনী বক্তব্যে শি জিনপিংও বলেন, একটি স্থিতিশীল চীন-মার্কিন সম্পর্ক বিশ্বের জন্য আশীর্বাদ। সহযোগিতা উভয়পক্ষের জন্যই কল্যাণ বয়ে আনে, আর সংঘাত কেবল ক্ষতিরই কারণ হয়। আমাদের উচিত প্রতিদ্বন্দ্বী না হয়ে অংশীদার হওয়া।
তিনি আরও বলেন, আজকের বিশ্ব একটি সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের উচিত মুখোমুখি অবস্থানের বদলে অংশীদারত্বের পথ বেছে নেওয়া।
বেইজিংয়ের গ্রেট হল অব দ্য পিপলে স্থানীয় সময় সকাল প্রায় ১০টার দিকে ট্রাম্প পৌঁছালে তাকে জাঁকজমকপূর্ণ অভ্যর্থনা দেওয়া হয়। বড় একটি সামরিক দল গার্ড অব অনার দিয়ে এবং ডজনখানেক শিশু পতাকা নাড়িয়ে তাকে স্বাগত জানায়। পরে তাদের দ্বিপাক্ষিক আলোচনা প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে চলে। এরপর দুই প্রেসিডেন্ট টেম্পল অব হেভেন পরিদর্শন করেন।
দ্বিপাক্ষিক বৈঠক শুরুর আগে উদ্বোধনী বক্তব্যে ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, আজ শি জিনপিংয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করা তার জন্য ‘সম্মানের’ বিষয়।
তিনি বলেন, ‘আমাদের মধ্যে ভালো সম্পর্ক রয়েছে। কোনো সমস্যার মুখোমুখি হলে আমরা তা সমাধান করেছি। আমি আপনাকে ফোন করতাম, আপনি আমাকে ফোন করতেন। মানুষ জানে না-যখনই আমাদের কোনো সমস্যা হয়েছে, আমরা খুব দ্রুত তা সমাধান করেছি। আপনার সঙ্গে থাকা সম্মানের, আপনার বন্ধু হওয়াও সম্মানের,’ বলার সঙ্গে তিনি আরও যোগ করেন, যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্ক ‘আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে ভালো’ হবে।







