উচ্চ মজুরির দাবিতে আজ মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) ঢাকা মহানগরীর মিরপুর, গাজীপুর ও আশুলিয়ায় পোশাকশ্রমিকদের বিক্ষোভ অব্যাহত রয়েছে। এ সময় শ্রমিকরা সড়ক অবরোধের চেষ্টা করেন এবং বিভিন্ন সময়ে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ান।
বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) তথ্য অনুযায়ী, শ্রমিক অসন্তোষের মধ্যে আজ সকাল ১১টা পর্যন্ত মিরপুর, গাজীপুর, ময়মনসিংহ এবং সাভারের আশুলিয়া ও জিরানী এলাকার ৩০৬টি কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়। এতে ৬ লাখ ৯৪ হাজার ৭৯৩ জন শ্রমিকের কাজ ব্যাহত হয়েছে।
বিজিবির জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. শরীফুল ইসলাম জানিয়েছেন, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জসহ পার্শ্ববর্তী শিল্পাঞ্চলে শ্রমিক অসন্তোষের প্রেক্ষাপটে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা, জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং শিল্পকারখানার কার্যক্রম নির্বিঘ্ন রাখতে ১২ প্লাটুন বিজিবি সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে।
গাজীপুরে মহাসড়কে আগুন, যান চলাচলে বাঁধা
বেতন বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন দাবিতে গাজীপুরের বিভিন্ন এলাকায় পোশাক শ্রমিকরা ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে যান চলাচল ব্যাহত করার চেষ্টা করেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে গাজীপুরে ১১ প্লাটুন বিজিবিসহ অতিরিক্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে।
আজ মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) সকাল সাড়ে ৯টার দিকে গাজীপুর মহানগরীর নাওজোড় এলাকার ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে দিগন্ত সোয়েটার কারখানার সামনে সড়ক অবরোধ করেন শ্রমিকরা।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, মহাসড়কের পাশে থাকা বর্জ্য এনে সড়কে ফেলে তাতে আগুন ধরিয়ে দেন বিক্ষোভকারীরা। এর ফলে জয়দেবপুর চৌরাস্তা থেকে নাওজোড় মোড় এলাকার সড়কে যান চলাচল পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। এ সময় অটোরিকশা ও মোটরসাইকেলের মতো ছোট যান চলাচলেও বাধা দেওয়া হয় এবং অনেক শ্রমিককে মহাসড়কে ক্রিকেট খেলতে দেখা যায়। সংবাদ সংগ্রহ করতে গেলে আন্দোলনরত শ্রমিকরা সাংবাদিকদের ছবি ও ভিডিও ধারণে বাধা দেন।
এর আগে, সকালে কালিয়াকৈর উপজেলার চন্দ্রা এলাকায় সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলমের মালিকানাধীন ‘ইন্টার স্টফ’ কারখানার শ্রমিকরা কারখানা থেকে বের হয়ে মহাসড়কে আসার চেষ্টা করেন। তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও স্থানীয় বিএনপি নেতারা চারপাশ থেকে ঘিরে রাখায় তারা মহাসড়কে উঠতে পারেননি।
এছাড়া ভোগড়া এবং কালিয়াকৈরের পল্লী বিদ্যুৎ ও চন্দ্রা এলাকায় কয়েকটি কারখানার শ্রমিকরাও মহাসড়কে আসার চেষ্টা চালালে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়।
এদিকে, কারখানায় প্রবেশের পরও কাজে যোগ না দেওয়ায় গাজীপুরের বিভিন্ন এলাকার ১০ থেকে ১২টি কারখানায় আজকের জন্য সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ।
শ্রম অসন্তোষ নিরনে ও আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সকাল সাড়ে ৬টা থেকে ২৫ জন এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে মাঠে নেমেছেন বিজিবি সদস্যরা।
গাজীপুর শিল্প পুলিশের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আমজাদ হোসাইন বলেন, ‘আজ সকালে গাজীপুরের বিভিন্ন এলাকায় আট দশটি কারখানায় শ্রমিকরা কারখানার ভিতরে প্রবেশ করে। কিন্তু পরে তারা কাজের যোগদান না করে কারখানা থেকে বেরিয়ে আসেন। এ কারণে আট দশটি কারখানায় আজকের জন্য সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে।’
তিনি আরো জানান, সকাল ৮টার কিছু সময় আগে কালিয়াকৈরের মৌচাক এলাকায় কিছু শ্রমিক মহাসড়ক অবরোধের চেষ্টা করলেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কোনো ধরনের সংঘাত ছাড়াই তাদের বুঝিয়ে সরিয়ে দিয়েছে। মহাসড়কের প্রতিটি পয়েন্টে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত ঢাকা-টাঙ্গাইল ও ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের বিভিন্ন পয়েন্টে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কড়া পাহারা ও নিয়ন্ত্রণ বজায় রয়েছে।
আশুলিয়ায় শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া, ৬০ থেকে ৭০টি কারখানা ছুটি ঘোষণা
গত কয়েকদিনের ধারাবাহিকতায় আজও পোশাক খাতের শ্রমিকদের জন্য ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবিতে চলমান শ্রমিক আন্দোলনের জেরে উত্তপ্ত রয়েছে ঢাকার আশুলিয়া শিল্পাঞ্চল।
সকাল ৯টার দিকে আশুলিয়ার বাইপাইল-আবদুল্লাহপুর সড়কের বিভিন্ন পয়েন্টে শ্রমিক-পুলিশদের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে এবং এখনো থেমে থেমে সেটি চলছে।
সকাল থেকে আশুলিয়া অঞ্চলের শ্রমিকরা কাজে যোগ দিলেও সকাল সাড়ে ৮টার পর নরসিংহপুর এলাকার হামীমসহ আশপাশের কয়েকটি কারখানা ছুটি ঘোষণা করে। এরপর শ্রমিকরা সড়কে নেমে আসেন।
এ সময় গত কয়েক দিনের মতো আজও শ্রমিকরা বিভিন্ন কারখানার সামনে ও সড়কে জড়ো হওয়ার চেষ্টা করেন। পুলিশ টিয়ার শেল নিক্ষেপ করে তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। এছাড়া, পুলিশের সঙ্গে শ্রমিকদের ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া হয়। একপর্যায়ে আন্দোলনরত শ্রমিকরা সড়কের বিভিন্ন স্থানে আগুন জ্বালিয়ে যান চলাচল বন্ধের চেষ্টা করেন।
আজ সকাল থেকেই আশুলিয়ার বাইপাইল-আবদুল্লাহপুর সড়কের নিশ্চিন্তপুর, ইউনিকসহ বিভিন্ন স্থানে উত্তপ্ত পরিস্থিতি বিরাজ করছিল।
শিল্প পুলিশ-১ এর পুলিশ র মোহাম্মদ মুমিনুল ইসলাম ভূইয়া বেলা পৌনে ১২টা নাগাদ দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে জানান, শ্রমিক অসন্তোষের জেরে এই অঞ্চলে আজ প্রায় ৬০ থেকে ৭০ টি কারখানা ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে
এর মধ্যে কিছু কারখানার শ্রমিকরা সকালে কাজে যোগ দিলেও কাজ না করায় মালিকপক্ষ তাদের ছুটি দিতে বাধ্য হয় বলে জানিয়েছেন তিনি।
এদিকে, সকাল থেকে আশুলিয়ার বাইপাইল-আবদুল্লাহপুর সড়কের বিভিন্ন পয়েন্টে বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের অবস্থান করতে দেখা যায়। এ ছাড়া স্থানীয় বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের একাংশের নেতাকর্মীকে মোটরসাইকেল নিয়ে বিভিন্ন এলাকায় মহড়া দিতেও দেখা গেছে।
মিরপুরে ফের পোশাক শ্রমিক-পুলিশ সংঘর্ষ
রাজধানীর মিরপুরে পোশাকশ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ থামার পর যান চলাচল স্বাভাবিক হয়েছে। সংঘর্ষের সময় অন্তত চারজনকে আটক করেছে পুলিশ।
মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) বেলা সাড়ে ১১টার দিকে পল্লবী থেকে মিরপুর-১০ সড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়। এর আগে সকাল ১০টার দিকে মিরপুর-১১ নম্বরে পুলিশের সঙ্গে পোশাকশ্রমিকদের সংঘর্ষের ঘটনায় এ সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।
ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে এদিন সকাল ১০টার দিকে মিরপুর-১১ নম্বরে সড়কে নামেনপোশাকশ্রমিকেরা। এ সময় পুলিশ তাদের সরিয়ে দিতে গেলে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ বাধে। আন্দোলনকারীরা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেন। জবাবে পুলিশও আন্দোলনকারীদের লক্ষ্য করে কাঁদানে গ্যাসের শেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। প্রায় এক ঘণ্টা সংঘর্ষ ও ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার পর আন্দোলনকারীরা বিভিন্ন অলিগলিতে ঢুকে পড়েন।
সংঘর্ষের সময় অন্তত চারজনকে আটক করেছে পুলিশ। তবে তাৎক্ষণিকভাবে তাদের নাম-পরিচয় জানা যায়নি
এ সময় ঘটনাস্থলে ডিএমপির উপপুলিশ কমিশনার (পিওএম-দক্ষিণ) মোহাম্মদ তৌহিদুল আরিফ বলেন, পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলনে দুষ্কৃতকারীরা অনুপ্রবেশ করেছে। শ্রমিকনেতারা গতকাল বলেছেন, শ্রমিকেরা এ আন্দোলন থেকে সরে আসবেন। এরপরও যারা বিক্ষোভ চালিয়ে যাবেন, তারা কোনোভাবেই শ্রমিক নন, বরং দুষ্কৃতকারী। সুতরাং যারা এখন আন্দোলনে নামবেন, তাদের বিরুদ্ধে ক
এদিকে পোশাকশ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের কারণে সকাল ১০টা ২২ মিনিট থেকে মিরপুর-১১ নম্বর মেট্রোরেল স্টেশন বন্ধ রয়েছে। বেলা ১২টা ২২ মিনিটে জানতে চাইলে এমআরটি পুলিশের পরিদর্শক (তদন্ত) মো. মহসিন শেখ টিবিএসকে বলেন, ‘এখনো স্টেশন চালু হয়নি। আরও পাঁচ মিনিট পর চালু হতে পারে।’
অন্যদিকে পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলনকে ঘিরে আজও মিরপুরের বিভিন্ন এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। মিরপুর-১০ নম্বরে একটি জলকামান ও দুটি সাঁজোয়া যান প্রস্তুত রাখা হয়েছে। পুলিশের পাশাপাশি স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়নের (এসআরবি) সদস্যদের উপস্থিতিও দেখা গেছে।
এ ছাড়া কিছুক্ষণ পরপর আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে যুবদলের নেতাকর্মীদের মিছিল করতে দেখা গেছে।
৩০৬ কারখানায় উৎপাদন বন্ধ
শ্রমিকরা কর্মস্থল থেকে বেরিয়ে যাওয়ায় আজ মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) বেলা ১১টা পর্যন্ত দেশের ৩০৬টি পোশাক কারখানায় উৎপাদন বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছেন মালিকেরা। এসব কারখানায় প্রায় সাত লাখ শ্রমিক কর্মরত রয়েছেন।
বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) তথ্য অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি কারখানায় উৎপাদন বন্ধ রয়েছে গাজীপুর ও ময়মনসিংহে। এ দুই এলাকায় ১৬১টি কারখানায় উৎপাদন বন্ধ রয়েছে, যেখানে প্রায় ৪ লাখ ২৯ হাজার শ্রমিক কর্মরত।
এ ছাড়া সাভারের আশুলিয়া ও জিরানী এলাকায় ৯৩টি এবং রাজধানীর মিরপুরে ৫২টি কারখানায় উৎপাদন বন্ধ রয়েছে।
বিজিএমইএর প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, সংগঠনটির সদস্যভুক্ত ২ হাজার ১৩৪টি কারখানার মধ্যে মঙ্গলবার ১ হাজার ৮২৮টি চালু ছিল। অর্থাৎ সদস্যভুক্ত প্রায় ১৪ শতাংশ কারখানায় উৎপাদন বন্ধ রয়েছে।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, উৎপাদন বন্ধ থাকা কারখানাগুলোর একটি বড় অংশ বৃহৎ শিল্পপ্রতিষ্ঠান, যেখানে বিপুলসংখ্যক শ্রমিক কর্মরত রয়েছেন।
তবে নারায়ণগঞ্জ ও চট্টগ্রামসহ উল্লিখিত এলাকার বাইরে অন্য কোথাও কারখানা বন্ধের খবর পাওয়া যায়নি।







