ছাদে সৌরবিদ্যুৎ বা রুফটপ সোলার স্থাপনে সহায়তা দিতে বিদ্যমান সবুজ অর্থায়ন (গ্রিন ফাইন্যান্সিং) তহবিল থেকে ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছে সরকার। এই তহবিলের আওতায় উদ্যোক্তাদের সর্বোচ্চ ৬ শতাংশ সুদে ঋণ দেওয়া হবে। আর ঋণ পরিশোধে সময় পাবেন ১২ বছর।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গ্রিন ট্রান্সফরমেশন ফান্ড (জিটিএফ) থেকে এই অর্থের জোগান দেওয়া হবে। সরকার সরাসরি কোনো একক প্রকল্পে অর্থায়ন না করে ছাদে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার দ্রুত বাড়াতে চায়। সে লক্ষ্যে ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেড (ইডকল), বাংলাদেশ ইনফ্রাস্ট্রাকচার ফাইন্যান্স ফান্ড লিমিটেড (বিআইএফএফএল) ও পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ)—এই তিন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ঋণ বিতরণ করা হবে।
প্রাথমিক বরাদ্দ থেকে ইডকলকে ইতিমধ্যে ৫০০ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি রুফটপ সোলার প্রকল্পে বিনিয়োগ সহজ করতে বিআইএফএফএল ও পিকেএসএফকেও তহবিল দেওয়া হবে।
গতকাল টিবিএসের সঙ্গে এই অর্থায়ন কাঠামো নিয়ে কথা বলেন বিদ্যুৎ সচিব মিরানা মাহরুখ। তিনি জানান, সরকারি কোষাগার থেকে সরাসরি নতুন অর্থ বরাদ্দ না করে কম কার্বন নিঃসরণমূলক কর্মকাণ্ডের জন্য নির্ধারিত বিদ্যমান সবুজ তহবিল ও উৎস থেকেই প্রাথমিকভাবে এই ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা সংগ্রহ করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, প্রাথমিক বরাদ্দের অর্থ ব্যবহৃত হয়ে গেলে সরকার পর্যায়ক্রমে আরও তহবিল জোগান দিতে পারে। সেক্ষেত্রে আরও ৫০০ কোটি টাকা ছাড় করার সম্ভাবনা রয়েছে।
বিদ্যুৎ বিভাগের রূপরেখা অনুযায়ী, মোট বিনিয়োগের ২০ শতাংশ দেবে বেসরকারি বিনিয়োগকারী, আরও ২০ শতাংশ দেবেন ভবনের ছাদের মালিক। বাকি ৬০ শতাংশ অর্থ নির্ধারিত অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে ঋণ হিসেবে দেওয়া হবে।
সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনায় ছাদের মালিকদের আর্থিক অংশীদারত্ব নিশ্চিত করতে এই ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এতে তাদের মধ্যে মালিকানাবোধ তৈরি হবে এবং তারা সিস্টেমগুলো সঠিকভাবে রক্ষণাবেক্ষণে উৎসাহিত হবেন।
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের জেরে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ওপর নির্ভরতা কমাতে চাইছে সরকার। একইসঙ্গে গ্রীষ্মকালে ক্রমাগত লোডশেডিং মোকাবিলায় আগামী ফেব্রুয়ারির মধ্যে ছাদে সৌরবিদ্যুৎ থেকে ৩-৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নিয়ে জোর প্রচেষ্টা চালাচ্ছে বিদ্যুৎ বিভাগ।
এই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে বিদ্যুৎ বিভাগ ও ইডকল ৩ ও ৪ নভেম্বর দুই দিনব্যাপী একটি সোলার এক্সপোর আয়োজন করেছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আজ এর উদ্বোধন করেছেন।
কনফিডেন্স পাওয়ার অ্যান্ড এনার্জি পিএলসির চেয়ারম্যান ইমরান করিম রুফটপ সোলার উদ্যোক্তাদের জন্য সরকারের এই স্বল্প সুদের অর্থায়ন উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন। তিনি বলেন, গ্রিড ও সাব-গ্রিড পর্যায়ের প্রকল্পের পাশাপাশি জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার করতে বাংলাদেশে সৌরবিদ্যুৎ খাতে আরও বড় বিনিয়োগ প্রয়োজন।
তিনি বলেন, ‘১২ বছরের কিস্তি সুবিধা একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। তবে তহবিলের অর্থ সঠিকভাবে আদায়, স্বচ্ছ ব্যবহার এবং গ্রাহকের সুফল নিশ্চিত করার কার্যকর ব্যবস্থা থাকা অত্যন্ত জরুরি।’
প্রকল্পের কার্যকর বাস্তবায়নে সুস্পষ্ট স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর (এসওপি) তৈরির জন্য অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনারও আহ্বান জানান তিনি।
সৌরবিদ্যুৎ অর্থায়নে আগ্রহী দেশি-বিদেশি ঋণদাতারা
এ কর্মসূচি সম্প্রসারণের লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগী ও বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকেও অতিরিক্ত তহবিল সংগ্রহের চেষ্টা করছে সরকার।
এ উদ্যোগে বিশ্বব্যাংক ৫০০ মিলিয়ন ডলার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। চলমান প্রক্রিয়া শেষে আগামী মার্চের মধ্যে এই অর্থ পাওয়া যাবে বলে আশা করছে সরকার।
¬প্রস্তাবিত এই অর্থায়নে জলবায়ু ও সবুজ অর্থায়ন সুবিধাসহ একাধিক তহবিলের সমন্বয় থাকবে।
এছাড়া এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকও (এআইআইবি) প্রাথমিকভাবে ৫০০ মিলিয়ন ডলার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, যা বর্তমানে প্রক্রিয়াধীন।
বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, এসব প্রতিষ্ঠানের ঋণ তুলনামূলক ব্যয়বহুল হতে পারে। তাই সামগ্রিক খরচ কমিয়ে আনতে সরকার বিভিন্ন উৎসের তহবিলের সমন্বয় করার কথা ভাবছে।
এইচএসবিসি, সিটি ও ব্র্যাক ব্যাংকসহ দেশি ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংকের সঙ্গেও আলোচনা চালাচ্ছে সরকার। ব্যাংকগুলো রুফটপ সোলার প্রকল্পের জন্য তুলনামূলক সাশ্রয়ী ঋণ সুবিধা দিতে আগ্রহ দেখিয়েছে।
বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্যমতে, বেসরকারি ব্যাংকগুলো প্রায় ৫ শতাংশ সুদে অর্থায়নের বিষয়টি বিবেচনা করছে। এটি বাস্তবায়িত হলে দেশীয় আর্থিক বাজার থেকে অতিরিক্ত তহবিল সংগ্রহে সহায়ক হবে।
একাধিক উন্নয়ন সহযোগীকে যুক্ত করে একটি যৌথ প্ল্যাটফর্ম গড়ে তুলতে বাংলাদেশের সঙ্গে আলোচনা শুরু করেছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)।
প্রস্তাবিত এই প্ল্যাটফর্মে এডিবি প্রাথমিকভাবে ২৫০ মিলিয়ন ডলার দেওয়ার কথা ভাবছে। ভবিষ্যতে এর পরিধি বাড়িয়ে কয়েক বিলিয়ন ডলারের অর্থায়ন সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে।
বিদ্যুৎ সচিব বলেন, ‘বিভিন্ন শ্রেণির রুফটপ সোলার ব্যবহারকারীদের জন্য সাশ্রয়ী ঋণ সুবিধা তৈরি করতে সরকার তুলনামূলক কম সুদের তহবিলসহ বিভিন্ন উৎসের অর্থায়ন একত্রিত করার কাজ করছে।’
সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনার ধরন অনুযায়ী ফাইন্যান্সিং প্রোডাক্ট প্রস্তুত করতে ইডকলকেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
মান নিয়ন্ত্রণ ও যন্ত্রপাতির মানদণ্ড
বাজারে নিম্নমানের পণ্য প্রবেশের আশঙ্কা থাকায় অর্থায়নের পাশাপাশি আমদানি করা সোলার প্যানেল, ব্যাটারি ও অন্যান্য যন্ত্রপাতির নির্ধারিত মান নিশ্চিত করতেও কাজ করছে সরকার।
সোলার প্যানেলের মান নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশনকে (বিএসটিআই) এ উদ্যোগে যুক্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি সৌর যন্ত্রপাতির জন্য টেকনিক্যাল স্পেসিফিকেশন নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে।
ইডকলও নিজস্ব মানদণ্ড জারি করেছে, যা ঋণ অনুমোদনের আগে অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে অনুসরণ করতে হবে।
এছাড়া আমদানিকারকদের দেশে আনা পণ্যের মানের বিষয়ে অঙ্গীকারনামা দিতে হবে।
কাস্টমস ক্লিয়ারেন্সের সময় আমদানি করা যন্ত্রপাতি নির্ধারিত মানদণ্ড পূরণ করছে কি না, তা তদারকি ও নিশ্চিত করতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকেও (এনবিআর) সম্পৃক্ত করা হয়েছে।
বিদ্যুৎ বিভাগ জানিয়েছে, সোলার প্যানেল ও ব্যাটারি স্টোরেজের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কোনো ব্র্যান্ড বা উৎপাদনকারী দেশের নাম উল্লেখ করার বিষয়ে আইনি বাধা রয়েছে। সে কারণে সোলার মডিউলের জন্য কঠোর কারিগরি শর্ত নির্ধারণ করা হয়েছে, যেখানে জিনকো সোলার ও লংগির মতো শীর্ষস্থানীয় নির্মাতাদের মানদণ্ডকে ভিত্তি ধরা হয়েছে।
বিএসটিআইয়ের কারিগরি সক্ষমতা বাড়াতে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) ছয়জন প্রকৌশলীকে প্রতিষ্ঠানটিতে সংযুক্ত করেছে বিদ্যুৎ বিভাগ।
যন্ত্রপাতির মানদণ্ড বাস্তবায়নের বিষয়টি তদারকি করতে এই প্রকৌশলীদের সাত দিনের বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।
প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে সোলার প্যানেল সুরক্ষিত রাখতে সৌর স্থাপনাগুলোর জন্য বিমা চালুর বিষয়েও কাজ শুরু করেছে বিদ্যুৎ বিভাগ। তবে চুরির কারণে কোনো ক্ষতি হলে তার দায়ভার ভবনের ছাদের মালিককেই বহন করতে হবে।







