নাইন ইলেভেন: ২৫ বছর পরও অমলিন স্মৃতি, থামেনি মৃত্যুর দীর্ঘশ্বাস

২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর সকালে বদলে গিয়েছিল বিশ্বের ইতিহাস। নিউইয়র্কের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার, পেন্টাগন এবং পেনসিলভেনিয়ার একটি নির্জন মাঠে চারটি বিমান হামলায় প্রাণ হারান প্রায় তিন হাজার মানুষ। এক-চতুর্থাংশ শতাব্দী পেরিয়ে গেলেও সেই দিনের শোক, স্বজন হারানোর বেদনা এবং সামাজিক ক্ষত এখনো মুছে যায়নি। শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে গভীর শ্রদ্ধা ও নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে পালিত হয়েছে ভয়াবহ ৯/১১ হামলার ২৫তম বার্ষিকী। নিউইয়র্কের ‘গ্রাউন্ড জিরো’তে জড়ো হন নিহতদের স্বজন, সহকর্মী, উদ্ধারকর্মী ও রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধিরা। স্মরণানুষ্ঠানে অংশ নেন বর্তমান ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং সাবেক চার মার্কিন প্রেসিডেন্ট।

সকাল ৮টা ৪৬ মিনিটে, যে মুহূর্তে প্রথম বিমানটি ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের উত্তর টাওয়ারে আঘাত হেনেছিল, নীরবতা পালনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় স্মরণ অনুষ্ঠান। এরপর হামলার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে নিহতদের স্মরণে নীরবতা পালন করা হয়।

এবারের আয়োজনে যুক্ত হয়েছে বিশেষ তাৎপর্যের আরেকটি নীরব মুহূর্ত। প্রচলিত ছয়টি নীরবতার পাশাপাশি সপ্তম নীরবতা পালন করা হয় সেই হাজার হাজার উদ্ধারকর্মী ও সাধারণ মানুষের স্মরণে, যারা হামলার পর ধ্বংসস্তূপ থেকে ছড়িয়ে পড়া বিষাক্ত ধুলা ও বাতাসের সংস্পর্শে এসে দীর্ঘমেয়াদে নানা জটিল রোগে আক্রান্ত হন এবং পরবর্তী সময়ে প্রাণ হারান।

আরও পড়ুন:  শীতে পিঠ ব্যথা করে—টাইম ম্যাগাজিনকে তারেক রহমান

ধ্বংসস্তূপের মৃত্যু থামেনি: ৯/১১-এর দিন নিউইয়র্ক ফায়ার ডিপার্টমেন্টের ৩৪৩ জন দমকলকর্মী প্রাণ হারান। কিন্তু মৃত্যুর মিছিল সেখানেই শেষ হয়নি। ধ্বংসস্তূপে উদ্ধারকাজ এবং পরবর্তী পরিচ্ছন্নতা অভিযানে বিষাক্ত রাসায়নিক ও ধুলার সংস্পর্শে আসা আরও ৬০০ জনের বেশি ফায়ারফাইটার পরবর্তী সময়ে মারা গেছেন। শুধু ২০২৬ সালেই এ ধরনের কারণে ২৬ জনের মৃত্যুর খবর সামনে এসেছে।

সাবেক ফায়ারফাইটার প্যাট্রিক হোয়েলানের পরিবারের সদস্যরা এখনো সেই সময়ের ক্ষোভ ও প্রশ্ন বয়ে বেড়াচ্ছেন। তার ছেলে মনে করেন, হামলার পর উদ্ধারকর্মীদের যে পরিবেশে কাজ করতে হয়েছিল, সেটি নিরাপদ ছিল না। নিরাপদ বাতাসের আশ্বাসের বিপরীতে পরবর্তী বছরগুলোতে অসুস্থতা ও মৃত্যুর ঘটনা সেই দাবিকে আরও প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।

বদলে গেছে বিশ্বরাজনীতির মানচিত্র: ৯/১১ শুধু একটি সন্ত্রাসী হামলা ছিল না; এর অভিঘাত ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বরাজনীতি, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের প্রায় প্রতিটি স্তরে। হামলার পর যুক্তরাষ্ট্র শুরু করে তথাকথিত ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ’। আফগানিস্তান ও ইরাকে সামরিক অভিযান থেকে শুরু করে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্যবস্থায় আসে ব্যাপক পরিবর্তন।

বিমানবন্দর ও সীমান্ত নিরাপত্তা, গোয়েন্দা তৎপরতা এবং সন্ত্রাসবিরোধী আইন—সব ক্ষেত্রেই নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি হয় বিশ্ব। ৯/১১-পরবর্তী সেই পরিবর্তনের প্রভাব আজও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে দৃশ্যমান।

আরও পড়ুন:  জুলাই অভ্যুত্থান কোনো দল বা ব্যক্তির নয়, গণতন্ত্রকামী মানুষের অর্জন: প্রধানমন্ত্রী

এর পাশাপাশি সামাজিক ক্ষেত্রেও তৈরি হয় গভীর বিভাজন। হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রে মুসলিম জনগোষ্ঠী ও অভিবাসীদের বিরুদ্ধে বৈষম্য এবং ঘৃণাভিত্তিক অপরাধ বেড়ে যায়। ২৫ বছর পরও সেই অভিজ্ঞতার স্মৃতি অনেক পরিবারের কাছে বেদনার।

নিউইয়র্কের প্রথম মুসলিম মেয়র জোহরান মামদানিকে এ বছরের স্মরণানুষ্ঠানে অংশ না নেওয়ার জন্য কিছু রাজনৈতিক গোষ্ঠীর পক্ষ থেকে চাপ দেওয়া হলেও তিনি তা প্রত্যাখ্যান করে অনুষ্ঠানে যোগ দেন। এতে ৯/১১-এর স্মরণকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের বহুমাত্রিক সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতাও সামনে আসে।

নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছাচ্ছে পুরোনো ইতিহাস: ৯/১১-এর ২৫ বছর পর যুক্তরাষ্ট্রে এমন একটি প্রজন্ম বেড়ে উঠেছে, যারা সেই দিনের কোনো প্রত্যক্ষ স্মৃতি বহন করে না। হামলার সময় যারা শিশু ছিলেন, তাদের অনেকেই এখন মধ্যবয়সে। আর নতুন প্রজন্মের কাছে ৯/১১ মূলত ইতিহাসের একটি অধ্যায়।

তবু সেই ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে অসংখ্য পরিবারের ব্যক্তিগত শোক। ফ্লাইট ১১-এর ক্যাপ্টেন জন ওগনোওস্কির মেয়ে ক্যারোলিন ওগনোওস্কি এ বছর প্রথম সন্তানের মা হয়েছেন। বাবার সমাধিতে সন্তানকে নিয়ে গিয়ে তিনি উপলব্ধি করেছেন, প্রজন্ম বদলালেও হারানোর শূন্যতা বদলায় না।

বাবাকে স্মরণ করে তার আকুতি—তার বাবা কোনোদিন নাতিকে দেখে যেতে পারেননি, আর তার সন্তানও কোনোদিন জানতে পারবে না তার নানা কেমন মানুষ ছিলেন। তাই পরবর্তী প্রজন্মের কাছে ৯/১১-এর ইতিহাস এবং সেদিনের নায়কদের গল্প পৌঁছে দেওয়াকে তিনি নিজেদের দায়িত্ব মনে করেন।

আরও পড়ুন:  বেনজীরের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা নেই: পররাষ্ট্রমন্ত্রী

২৫ বছর পরও অমলিন ক্ষত: সময় অনেক কিছু বদলে দিয়েছে। বদলে গেছে নিউইয়র্কের আকাশরেখা, বদলেছে নিরাপত্তা ব্যবস্থা, বদলেছে বিশ্বরাজনীতির গতিপথ। কিন্তু ৯/১১-তে প্রিয়জন হারানো মানুষের কাছে ২৫ বছরও যথেষ্ট দীর্ঘ সময় নয়।

গ্রাউন্ড জিরোর নীরবতা, স্বজনদের চোখের জল এবং উদ্ধারকর্মীদের দীর্ঘমেয়াদি মৃত্যুর স্মৃতি মনে করিয়ে দেয়—৯/১১ শুধু ২০০১ সালের একটি দিনের ঘটনা নয়। এটি এমন এক ক্ষত, যার প্রভাব পরবর্তী প্রজন্মের জীবনেও ছড়িয়ে আছে।

একটি ভয়াবহ সকাল থেকে শুরু হওয়া সেই অধ্যায়ের ২৫ বছর পূর্ণ হলো। শ্রদ্ধায় স্মরণ করা হলো নিহতদের, স্মরণ করা হলো উদ্ধারকর্মীদের আত্মত্যাগ। কিন্তু ইতিহাসের পাতায় ৯/১১ যতই পুরোনো হোক, স্বজন হারানো মানুষের কাছে সেই দিনের বেদনা এখনো তাজা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

1 + two =