এলএনজি কার্গোর অভাবে এক্সিলারেট এনার্জির ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল (এফএসআরইউ) বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর দেশে গ্যাস সরবরাহ আরও কমেছে। এর প্রভাব পড়েছে বিদ্যুৎ উৎপাদনে। সন্ধ্যার পর বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ার সঙ্গে গ্যাসের সরবরাহ কমে যাওয়ায় বেড়েছে লোডশেডিং। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় সন্ধ্যার পর একাধিকবার বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে। গ্রামাঞ্চলেও পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। প্রচণ্ড গরমের মধ্যে লোডশেডিংয়ে ভোগান্তি বেড়েছে মানুষের।
এলএনজি কার্গোর অভাবে আজ বুধবার দুপুর ২টা ৪০ মিনিটের দিকে এক্সিলারেটের টার্মিনালের মজুত পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়। ফলে সেখান থেকে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। এখন নতুন কার্গো না আসা পর্যন্ত মূলত সামিটের টার্মিনাল থেকেই আমদানি করা এলএনজি সরবরাহ করতে হচ্ছে।
পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, বুধবার দুপুর ১২টায় দুই এলএনজি টার্মিনাল থেকে জাতীয় সঞ্চালন লাইনে ৬৬ কোটি ১০ লাখ ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ হচ্ছিল। দেশীয় কূপ থেকে পাওয়া ১৬২ কোটি ৮০ লাখ ঘনফুটসহ মোট গ্যাস সরবরাহ ছিল ২২৮ কোটি ৯০ লাখ ঘনফুট। ছয় ঘণ্টা পর সন্ধ্যা ৬টায় এলএনজি সরবরাহ কমে দাঁড়ায় ৫৬ কোটি ২০ লাখ ঘনফুটে। দেশীয় গ্যাসও সামান্য কমে ১৬২ কোটি ৭০ লাখ ঘনফুটে নামে। ফলে মোট সরবরাহ দাঁড়ায় ২১৮ কোটি ৯০ লাখ ঘনফুট।
সরকারি হিসাবে দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট। এর বিপরীতে সন্ধ্যায় সরবরাহ ছিল ২১৮ কোটি ৯০ লাখ ঘনফুট। অর্থাৎ, ঘাটতি ছিল ১৬১ কোটি ১০ লাখ ঘনফুট।
গ্যাস সরবরাহ কমার প্রভাব বুধবার সন্ধ্যার পর বিদ্যুৎ উৎপাদনেও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। পাওয়ার গ্রিডের তথ্য অনুযায়ী, সকাল ১০টায় দেশে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৪ হাজার ১৭ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে সরবরাহ ছিল ১৩ হাজার ৯০০ মেগাওয়াট। তখন লোডশেডিং ছিল মাত্র ১১৭ মেগাওয়াট।
দুপুর ২টায় চাহিদা ১৫ হাজার ২০৬ মেগাওয়াটে উঠলেও সরবরাহ ছিল ১৪ হাজার ১৩৯ মেগাওয়াট। ফলে লোডশেডিং দাঁড়ায় ১ হাজার ৬৭ মেগাওয়াটে। বিকেল ৫টায় চাহিদা ছিল ১৫ হাজার ৫০৪ মেগাওয়াট এবং সরবরাহ ১৩ হাজার ৭০০ মেগাওয়াট। এ সময় লোডশেডিং ছিল ১ হাজার ৮০৪ মেগাওয়াট।
সন্ধ্যায় পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়। সন্ধ্যা ৬টায় ১৫ হাজার ২৩৪ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ ছিল ১৩ হাজার ৮০০ মেগাওয়াট। ফলে লোডশেডিং হয় এক হাজার ৪৩৪ মেগাওয়াট। সন্ধ্যা ৭টায় চাহিদা বেড়ে ১৭ হাজার ৩৪৫ মেগাওয়াট হলে সরবরাহ নেমে আসে ১৪ হাজার ৮১৫ মেগাওয়াটে। এ সময় লোডশেডিং ছিল ২ হাজার ৫৩০ মেগাওয়াট। রাত ৮টায়ও ১ হাজার ৮৮৩ মেগাওয়াট লোডশেডিং ছিল। অর্থাৎ, দিনের শুরুতে যেখানে লোডশেডিং প্রায় ছিল না, সন্ধ্যার পর তা দুই হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যায়। বিদ্যুতের চাহিদা বৃদ্ধির পাশাপাশি গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ায় উৎপাদন সক্ষমতা কাজে লাগানো কঠিন হয়ে পড়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
কার্গো সংকটে বন্ধ টার্মিনাল
আরপিজিসিএলের এক কর্মকর্তা জানান, এক্সিলারেটের টার্মিনালে বুধবার দুপুরে মজুত এলএনজি পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়। ফলে টার্মিনালটি বন্ধ হয়ে গেছে। তবে সামিটের টার্মিনাল সচল রয়েছে। সেখান থেকে প্রায় ৫৬ কোটি ঘনফুট গ্যাস জাতীয় সঞ্চালন লাইনে সরবরাহ করা হচ্ছে।
এক্সিলারেটের টার্মিনাল বন্ধ হওয়ার পেছনে কার্গো সংকটকেই মূল কারণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। টার্মিনালের বয়লার মেরামত নিয়েও তথ্যের বিভ্রাট ছিল বলে জানিয়েছেন ওই কর্মকর্তা। তার ভাষ্য, বয়লার সচল করতে এক্সিলারেট ৭২ ঘণ্টা বিরতির কথা জানিয়েছিল। পরে বয়লার ঠিক হয়ে গেলেও ততক্ষণে কার্গো সংকট তৈরি হয়। ফলে টার্মিনাল চালানোর মতো এলএনজি মজুত ছিল না।
সংকট সামলাতে সরকার জরুরি ভিত্তিতে নতুন কার্গো কেনার উদ্যোগ নিয়েছে। মঙ্গলবার রাতে সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত কমিটির জরুরি বৈঠকে সিঙ্গাপুর থেকে দুটি এলএনজি কার্গো কেনার প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়েছে। এর একটি আগামী ২৩ আগস্ট দেশে আসার কথা রয়েছে। কার্গোটি এক্সিলারেটের টার্মিনালে যুক্ত হওয়ার কথা।
এর বাইরে বুধবারের নিয়মিত ক্রয় কমিটির বৈঠকে সিঙ্গাপুরের একটি প্রতিষ্ঠান থেকে আরও এক কার্গো এলএনজি কেনার প্রস্তাব অনুমোদনের সুপারিশ করা হয়েছে। প্রতি এমএমবিটিইউ এলএনজির দাম পড়ছে ২৩ দশমিক ৯৩ ডলার। আন্তর্জাতিক স্পট বাজারের বর্তমান দরের চেয়ে এই দাম প্রায় ৩ ডলার বেশি।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কার্গো সময়মতো না আসায় টার্মিনাল সচল থাকলেও তার সক্ষমতা পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না। ফলে গ্যাসের ঘাটতি বাড়ছে। এর প্রভাব পড়ছে বিদ্যুৎ উৎপাদনেও। একই সঙ্গে শিল্প, সিএনজি ও অন্যান্য খাতেও গ্যাস সরবরাহ কমছে। নতুন কার্গো ২৩ আগস্ট সময়মতো দেশে এলে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হতে পারে। তবে নিয়মিত কার্গো সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে গ্যাসের ঘাটতির সঙ্গে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সংকটও বারবার ফিরে আসতে পারে।







