ধারণ ক্ষমতার চেয়ে দুই গুণেরও বেশি কয়েদি বন্দি আছেন দেশের কারাগারগুলোতে। ঢাকাসহ সারাদেশের ৭০টি কারাগারে থাকার ব্যবস্থা আছে ৪২ হাজার ৮৮৭ জন বন্দির; আছে ৯৮ হাজার। অর্থাৎ কারাগারগুলোতে ধারণ ক্ষমতার চেয়ে ৫৫ হাজার ১১৩ জন বেশি কয়েদি বন্দি অবস্থায় রয়েছেন। এদিকে ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানকালে বিভিন্ন কারাগর থেকে পালিয়ে যাওয়া ২ হাজার ২৪৭ কয়েদির মধ্যে ৬৯০ জন এখনো পলাতক। তাদের মধ্যে নরসিংদী থেকে পালানো ১৬৬ জনের কোনো তথ্য উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। কারাগারের তথ্য ও সার্ভার পুড়ে যাওয়ায় তাদের পরিচয়-সংক্রান্ত তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না। তবে পলাতকদের তথ্য উদ্ধারে আদালত থেকে তথ্য নেওয়া হচ্ছে। অন্য পলাতকদের বিষয়ে তথ্য পাওয়া গেছে এবং তাদের নামে মামলা করা হয়েছে।
মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) দুপুরে পুরান ঢাকার বকশীবাজার-সংলগ্ন উমেশ দত্ত রোডে কারা অধিদপ্তরে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানিয়েছেন কারা মহাপরিদর্শ ক (আইজি প্রিজন) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ মো. মোতাহের হোসেন।
কারাগারের সাম্প্রতিক বিভিন্ন কার্যক্রম ও সংস্কার নিয়ে কথা বলতে এদিন সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন তিনি।
কারাগারে থাকা কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা মুঠোফোনসহ কোনো অবৈধ সুবিধা ভোগ করছেন কি না, সাংবাদিকের এমন প্রশ্নের জবাবে আইজি প্রিজন বলেন, অবৈধ মুঠোফোনের ব্যবহার ঠেকাতে গত এক বছরে বিভিন্ন কারাগার থেকে প্রায় তিন হাজারের বেশি মুঠোফোন জব্দ করা হয়েছে। এ সময় বিভিন্ন অনিয়মের সঙ্গে জড়িত অভিযোগে এক হাজারের বেশি কারারক্ষীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
আইজি প্রিজন বলেন, শুরুর দিকে অবৈধ মুঠোফোনের সংখ্যা বেশি থাকলেও ধীরে ধীরে তা কমে এসেছে। কোনো কারারক্ষী বা অন্য কেউ অবৈধভাবে মুঠোফোন ঢোকানোর সঙ্গে জড়িত থাকলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
কারাগার নিয়ে বিভিন্ন অভিযোগের বিষয়ে আইজি প্রিজন বলেন, অভিযোগগুলো চিহ্নিত করে সমাধানের চেষ্টা চলছে। দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি প্রায় ৬০টি কারাগার পরিদর্শন করেছেন। এসব সফরে জেল সুপারদের উপস্থিতির বাইরে বন্দিদের সঙ্গে আলাদাভাবে কথা বলার চেষ্টা করেছেন বলেও জানান তিনি।
কারাগারের খাবারের পরিমাণ নিয়ে বর্তমানে তার কাছে কোনো অভিযোগ নেই বলে জানান আইজি প্রিজন। বিভিন্নভাবে তদন্ত করে তা দেখেছেন, বরাদ্দের পুরো চাল রান্না করলে অনেক সময় খাবার নষ্ট হয়। এ কারণে চালের পরিমাণ কিছুটা কমিয়ে অন্য কাজে ব্যবহারের জন্য সরকারের কাছে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
সকালের রুটি, সবজি, মাছ ও তরকারির বিষয়ে তিনি বলেন, শক্ত হওয়া ছাড়া বাকি খাবার তার দৃষ্টিতে পর্যাপ্ত। তবে খাবারের স্বাদ নিয়ে অভিযোগ আছে। বন্দীদের দিয়েই রান্না করানো হয় বলে দক্ষতার অভাবে অনেক সময় খাবারের স্বাদে সমস্যা হতে পারে। এ কারণে মসলা বাড়ানোর প্রক্রিয়া নেওয়া হয়েছে।
আইজি প্রিজনের ভাষ্য, আগে বাইরে থেকে রান্না করা খাবার বা বাসা থেকে খাবার কারাগারে যাওয়ার অভিযোগ থাকলেও বর্তমানে দু-একটি ব্যতিক্রম ছাড়া তা হচ্ছে না। প্রায় ৮৫ থেকে ৯০ হাজার বন্দি এই ব্যবস্থার খাবার গ্রহণ করছেন। আর্থিকভাবে সক্ষম বন্দিদের জন্য কারাগারের ক্যানটিন থেকে সীমিত পরিমাণে বিভিন্ন জিনিস কেনার সুযোগ আছে।
ক্যানটিনে অতিরিক্ত দামের অভিযোগের বিষয়ে কারা মহাপরিদর্শক বলেন, কেন্দ্রীয় দলের মাধ্যমে দাম নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হয়। কোথাও অতিরিক্ত দাম বা অব্যবস্থাপনা পাওয়া গেলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। স্বচ্ছতা বাড়াতে বন্দিদের জন্য নির্ধারিত পণ্যের দাম বড় অক্ষরে টাঙানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়েছে, ক্যানটিনের লেনদেনে ক্যাশলেস ব্যবস্থা চালু করা হচ্ছে। এতে বন্দি তার আরএফআইডি ও আঙুলের ছাপ ব্যবহার করে টাকা উত্তোলন ও কেনাকাটা করতে পারবেন। ফলে পুরো লেনদেনের রেকর্ড থাকবে। মুন্সীগঞ্জে এই ব্যবস্থা চালু হয়েছে। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারেও তা চালুর পরিকল্পনা আছে। সরকারি অতিরিক্ত অর্থ ছাড়াই পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপের মাধ্যমে এটি করা হচ্ছে।
কারাগারে মাদক প্রবেশের বিষয়ে কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হচ্ছে না জানিয়ে আইজি প্রিজন বলেন, বর্তমানে প্রায় ২০ হাজার বন্দি মাদকসংক্রান্ত মামলায় কারাগারে আছেন। তাদের বড় একটি অংশ মাদকসেবী। মাদক না পেলে তাদের কেউ অসুস্থ হয়ে পড়ছেন, কেউ সহিংস আচরণ করছেন, আবার কেউ কথা শুনছেন না।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়েছে, এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় ফেনী-২ ও কিশোরগঞ্জে দুটি মাদক বিশেষ কারাগার চালু করা হয়েছে। সম্প্রতি কাশিমপুরের একটি কারাগারকেও মাদক বিশেষ কারাগার হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। এসব কারাগারে শুধু মাদকসংক্রান্ত মামলার বন্দিরা থাকবেন। তাদের জন্য শারীরচর্চা, কাউন্সেলিং, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও খেলাধুলাসহ আলাদা রুটিন চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
সংবেদনশীল বন্দিদের বিশেষায়িত জোনে রাখা হয়েছে জানিয়ে আইজি প্রিজন বলেন, এসব এলাকায় ব্যাপক জ্যামিং ব্যবস্থা রয়েছে। কোনো কারণে মুঠোফোন কারাগারে ঢুকলেও সেখানে তা ব্যবহার করা সম্ভব হয় না।
তৃতীয় লিঙ্গের বন্দিদের বিষয়ে তিনি বলেন, তাদের সাধারণ ওয়ার্ডে না রেখে আলাদা জোন, সেল বা বিভিন্ন স্থানে রাখা হচ্ছে। ভবিষ্যতে তার জন্য আলাদা ওয়ার্ড বা বিশেষ জোন তৈরির বিষয়টি ভাবতে হবে। কারা ব্যবস্থাপনায় এটি একটি বড় চ্যালেঞ্জ বলে উল্লেখ করেন তিনি।
কারাগারে চিকিৎসকের অনুমোদিত পদ ১৫১টি। এর মধ্যে মাত্র দুজন চিকিৎসক পদায়িত আছেন। অন্য কারাগারগুলোতে সিভিল সার্জনের মাধ্যমে সাময়িকভাবে চিকিৎসক পাওয়া যায়। বর্তমানে বিভিন্ন কারাগারে ১০১ জন চিকিৎসক অস্থায়ী ভিত্তিতে কাজ করছেন বলে জানান আইজি প্রিজন।
কারা মহাপরিদর্শক বলেছেন, চিকিৎসকের স্বল্পতার কারণে ফার্মাসিস্ট ও ডিপ্লোমা নার্সদের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। সম্প্রতি পিএসসি থেকে ৫৫ জন নার্সের নিয়োগপত্র দেওয়া হয়েছে। তারা শিগগিরই যোগ দেবেন বলে আশা করা হচ্ছে। ফার্মাসিস্টও নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে আইজি প্রিজন জানিয়েছেন, ২০২৫ সালে কারাগারে ১৮৬ বা ১৮৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। চলতি বছর এখন পর্যন্ত ১২২ জনের মৃত্যুর তালিকা আছে। বর্তমানে ১২২ জন বন্দি কারাগারের বাইরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। গত সাত মাসে ৫৬ হাজার বন্দিকে বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে







