যুক্তরাষ্ট্রে দাবানলে ঘরছাড়া ৬০ হাজার মানুষ

যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ব ওয়াশিংটন অঙ্গরাজ্যের স্পোকেন এলাকায় ভয়াবহ দাবানল ছড়িয়ে পড়েছে। এর প্রভাবে অন্তত ৬০ হাজার মানুষ বাড়িঘর ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যেতে বাধ্য হয়েছেন। এখন পর্যন্ত প্রায় ৬০০টি ঘরবাড়ি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও অন্যান্য স্থাপনা পুড়ে ছাই হয়ে গেছে বলে জানিয়েছে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ।

ওয়াশিংটনের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর স্পোকেন ও এর আশপাশের এলাকার প্রায় ৮ দশমিক ২ বর্গমাইল (২১ বর্গকিলোমিটার) এলাকা পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। আমেরিকার পশ্চিমাঞ্চলজুড়ে একই সঙ্গে ছড়িয়ে পড়া ডজন ডজন দাবানলের মধ্যে এটি অন্যতম। দাবানল নেভাতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে দেশটির কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় উদ্ধারকারী সংস্থাগুলো। পুরো ওয়াশিংটন অঙ্গরাজ্যজুড়ে ইতোমধ্যেই প্রায় ৩৯০ বর্গমাইল এলাকা ভস্মীভূত হয়ে গেছে। স্পোকেন এলাকার আগুন এখনও নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়নি।

কর্তৃপক্ষ জানায়, স্পোকেন থেকে যেসব মানুষকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে, তাদের মধ্যে স্থানীয় ভেটেরান্স অ্যাফেয়ার্স হাসপাতালের চিকিৎসাধীন রোগীরাও রয়েছেন।

স্পোকেন এলাকা থেকে আসা বিভিন্ন ভিডিও চিত্রে দেখা যায়, সুউচ্চ ভবনগুলোতে দাউদাউ করে আগুন জ্বলছে এবং আবাসিক এলাকার ওপর কালো ধোঁয়ার কুণ্ডলী ভাসছে। পুড়ে যাওয়া ঘরবাড়ির ধ্বংসস্তূপের মাঝে শুধু চিমনিগুলোই কেবল দাঁড়িয়ে আছে। আবহাওয়া শুষ্ক থাকায় আগামী দিনগুলোতে পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ার কোনো লক্ষণ নেই বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন কর্মকর্তারা।

আরও পড়ুন:  যুক্তরাষ্ট্র স্থল অভিযান শুরু করলে ইরানে যাবে দুর্ধর্ষ চেচেন আর্মি!

এক সংবাদ সম্মেলনে মার্কিন সেনেটর মারিয়া কান্টওয়েল বলেন, ‘আমরা এখনও বিপদ থেকে মুক্ত হতে পারিনি। আগামী কয়েকটি দিন আমাদের জন্য প্রচণ্ড চ্যালেঞ্জিং হতে যাচ্ছে।’

তবে কেবল স্পোকেন শহরই নয়, যুক্তরাষ্ট্রের পুরো পশ্চিমাঞ্চলজুড়ে দাবানল ছড়িয়ে পড়েছে। পশ্চিম আইডাহো এবং পূর্ব ওরেগনের প্রায় ৫২৫ বর্গমাইল এলাকার তৃণভূমি জুড়ে জ্বলতে থাকা আগুন নেভাতে টানা ১০ দিন ধরে কাজ করছেন উদ্ধারকর্মীরা। বুলডোজার ও হেলিকপ্টার ব্যবহার করে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা চলছে। গবাদি পশুর খামার সমৃদ্ধ এই এলাকার আরও ৬০০টি ঘরবাড়ি এবং ৮০০টি স্থাপনা বর্তমানে মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছে।

চলতি সপ্তাহেও এ অঞ্চলের আবহাওয়া শুষ্ক ও প্রখর রৌদ্রোজ্জ্বল থাকবে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া অফিস। বুধবার নাগাদ তাপমাত্রা ৩২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের (৯০ ডিগ্রি ফারেনহাইট) ওপরে উঠতে পারে। ধারণা করা হচ্ছে, আকস্মিক বজ্রপাতের কারণেই এই অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত হয়েছে।

পরিস্থিতি বিবেচনায় জাতীয় আবহাওয়া সংস্থা পূর্ব ওয়াশিংটন, পূর্ব ওরেগন, পশ্চিম ও মধ্য আইডাহো এবং পশ্চিম মনটানায় বায়ুর মান নিয়ে সতর্কতা জারি করেছে। এ ছাড়া ইউটাহ, মনটানা ও নেব্রাস্কায় রেড ফ্ল্যাগ এবং অ্যারিজোনা, ক্যালিফোর্নিয়া, নেভাদা ও মনটানায় চরম তাপদাহের সতর্কতা দেওয়া হয়েছে।

ক্যালিফোর্নিয়া থেকে আসা অগ্নিনির্বাপক দলের কর্মকর্তা বেনিয়ামিন কসেল জানান, স্পোকেনে তাপমাত্রা কিছুটা কম থাকলেও বিকেলে ঘণ্টায় ৩৫ থেকে ৪৫ মাইল বেগে তীব্র বাতাসের আশঙ্কা রয়েছে। আবহাওয়া ও এই এলাকার ভৌগোলিক অবস্থান দুটোই এখন প্রতিকূলে কাজ করছে।

আরও পড়ুন:  বাংলাদেশকে ১.১৫ বিলিয়ন ডলার ঋণ দিতে রাজি হলো আইএমএফ

বর্তমানে স্পোকেন এলাকায় তিনটি বড় দাবানল সক্রিয় রয়েছে। দাবানলগুলো হলো, ওল্ড ট্রেইলস ফায়ার, ফেয়ারভিউ ফায়ার এবং মেডোভিউ ফায়ার। অঙ্গরাজ্যের গভর্নর বব ফার্গুসন ইতোমধ্যে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছেন এবং জাতীয় আবহাওয়া সংস্থা এই অঞ্চলের জন্য বিশেষ বিপজ্জনক লাল সতর্কতা জারি করেছে। বাস্তুচ্যুত মানুষদের জন্য শহরের মূল কনভেনশন সেন্টারে একটি আশ্রয়কেন্দ্র তৈরি করেছে স্পোকেন কর্তৃপক্ষ।

স্পোকেন কাউন্টির কমিশনার ক্রিস জর্ডান জানান, স্বজনদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যাওয়ার সময় তিনি কথা বলেছেন। পুরো এলাকা ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিল এবং যা অত্যন্ত ভীতিকর অভিজ্ঞতা ছিল।

এদিকে স্থানীয় বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ‘অ্যাভিস্টা কর্পের’ প্রধান হিদার রোজেনস্ট্রেটার জানান, দাবানলের কারণে ওই এলাকার প্রায় ১০ হাজার গ্রাহক বর্তমানে বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন অবস্থায় রয়েছেন। ক্ষতিগ্রস্ত দুটি ট্রান্সমিশন লাইন দ্রুত মেরামতের চেষ্টা চলছে।

স্পোকেনের উত্তর-পশ্চিমে কম জনবহুল এলাকাগুলোতেও বেশ কয়েকটি বড় দাবানল জ্বলছে। শহরটি থেকে ৮০ মাইল দূরের একটি দাবানলে ইতোমধ্যে ২ ২০১০ বর্গমাইল এলাকা পুড়ে গেছে। অন্যদিকে স্টিংকিংওয়াটার পর্বতমালার কাছে অন্য একটি আগুনে ভস্মীভূত হয়েছে ৩৩৬ বর্গমাইল এলাকা।

আরও পড়ুন:  যুক্তরাষ্ট্রে সোমবার থেকে রোজা শুরু

পুরো পশ্চিমাঞ্চলীয় এলাকার সার্বিক সংকট নিয়ে ক্যালিফোর্নিয়ার উদ্ধারকারী দলের মুখপাত্র কেইলা ভিজকারা জানান, উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল এখন দাবানলের তাণ্ডবে মারাত্মকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে।

তদন্তকারীরা এখনো নিশ্চিত করতে পারেননি, কীভাবে দাবানলের সূত্রপাত হয়েছে। ওয়াশিংটনের পাশাপাশি আইডাহো, ওরেগন ও ইউটাহ অঙ্গরাজ্যেও বড় ধরনের দাবানল ছড়িয়ে পড়েছে। পশ্চিম আইডাহো ও পূর্ব ওরেগনে প্রায় ১ হাজার ৩৬০ বর্গকিলোমিটার তৃণভূমি পুড়ে গেছে। সেখানে আগুনের হুমকিতে রয়েছে ৬০০টির বেশি বাড়ি এবং আরও ৮০০টি স্থাপনা।

অন্যদিকে ইউটাহ অঙ্গরাজ্যের মধ্যাঞ্চলে সপ্তাহান্তে একটি দাবানলের আয়তন কয়েকগুণ বেড়ে প্রায় ১৪৫ বর্গকিলোমিটারে পৌঁছেছে। স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সেখানে আগুনে অন্তত ১০০টির বেশি গবাদিপশু মারা গেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিমাঞ্চলে চলমান একাধিক দাবানল মোকাবিলায় ফেডারেল, অঙ্গরাজ্য ও স্থানীয় সংস্থাগুলো একযোগে কাজ করছে। তবে শুষ্ক আবহাওয়া ও অনুকূল নয় এমন পরিবেশের কারণে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

11 − nine =