ইউরোপ ভ্রমণের কথা ভাবলেই আমাদের চোখের সামনে সবার আগে যে দেশটির ছবি ভেসে ওঠে, সেটি হলো ইতালি। পিৎজা, পাস্তা আর রেনেসাঁ শিল্পের এই দেশটিতে এমন কিছু জাদু আছে, যা প্রতিবছর বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বের লাখো পর্যটককে আকর্ষণ করে। আপনি কি কখনো রোমের কলোসিয়ামের সামনে দাঁড়িয়ে ইতিহাসের ঘ্রাণ নিতে চেয়েছেন? কিংবা ভেনিসের শান্ত খালে নৌকায় চড়ে প্রিয়জনের হাত ধরতে চেয়েছেন? যদি উত্তর ‘হ্যাঁ’ হয়, তবে আজকের এই ভ্রমণ ব্লগটি আপনার জন্যই। ইতালির দর্শনীয় স্থান নিয়ে সাজানো এই ভ্রমণ গাইডে আমরা জানবো এমন কিছু জায়গার কথা, যা আপনার ভ্রমণ তালিকায় থাক উছিত।
ইতালি শুধু একটি দেশ নয়, এটি একটি জীবন্ত জাদুঘর। এখানকার প্রতিটি গলিতে লুকিয়ে আছে হাজার বছরের ইতিহাস। বাংলাদেশের মানুষের কাছে ইতালি মানেই স্বপ্নের দেশ। আমাদের অনেক আত্মীয়-স্বজন সেখানে থাকেন, তাই ইতালির প্রতি আমাদের এক অন্যরকম টান কাজ করে। চলুন তবে দেরি না করে ইউরোপের এই সুন্দরতম দেশটির অলিগলিতে হারিয়ে যাই।
ইতালির প্রধান পর্যটন কেন্দ্রগুলো
ইতালির কথা বলবেন আর রোমের কথা আসবে না, তা কি হয়? বলা হয়ে থাকে, “সব রাস্তা রোমের দিকেই যায়।” প্রাচীন রোমান সাম্রাজ্যের কেন্দ্রবিন্দু এই শহরটি যেন ইতিহাসের এক বিশাল ভাণ্ডার। আপনি যখন রোমের রাস্তায় হাঁটবেন, তখন আপনার মনে হবে আপনি টাইম মেশিনে করে কয়েক হাজার বছর পিছিয়ে গেছেন।
কলোসিয়াম
রোমের সবচেয়ে আইকনিক স্থাপনা হলো কলোসিয়াম। এটি ছিল প্রাচীন বিশ্বের সবচেয়ে বড় এম্ফিথিয়েটার। গ্ল্যাডিয়েটরদের লড়াই থেকে শুরু করে নানা রাজকীয় উৎসবের সাক্ষী এই বিশাল স্থাপনাটি। আপনি যখন এর ভেতরে দাঁড়াবেন, তখন কল্পনা করতে পারবেন কীভাবে হাজার হাজার মানুষ চিৎকার করে যোদ্ধাদের উৎসাহ দিত। বাংলাদেশ থেকে যারা প্রথমবার ইতালি যান, তাদের ছবি তোলার জন্য এটিই সেরা জায়গা।
প্যানথিয়ন ও রোমান ফোরাম
রোমের আরেকটি বিস্ময় হলো প্যানথিয়ন। এর বিশাল গম্বুজটি আজও স্থাপত্যবিদদের অবাক করে দেয়। এর পাশেই রয়েছে রোমান ফোরাম, যা একসময় রোমের প্রশাসনিক ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র ছিল। ধ্বংসাবশেষ হলেও এর প্রতিটি পাথর আপনাকে প্রাচীন সভ্যতার গল্প শোনাবে।
ভেনিস জলের ভাসমান শহর
আপনি কি কল্পনা করতে পারেন এমন একটি শহর যেখানে কোনো গাড়ি চলে না? হ্যাঁ, ভেনিস ঠিক তেমনই। পুরো শহরটি খালের ওপর গড়ে উঠেছে এবং যাতায়াতের প্রধান মাধ্যম হলো নৌকা বা ‘গন্ডোলা’। ভেনিসকে বলা হয় বিশ্বের অন্যতম রোমান্টিক শহর।
গ্র্যান্ড ক্যানেল ও গন্ডোলা রাইড
ভেনিসের প্রাণ হলো গ্র্যান্ড ক্যানেল। আপনি যদি ভেনিস যান, তবে গন্ডোলায় চড়ে এই খালে ঘোরা আপনার জন্য বাধ্যতামূলক। পানির ওপর দিয়ে ভেসে যেতে যেতে দুই ধারের প্রাচীন ভবনগুলো দেখা এক অপূর্ব অনুভূতি। বিশেষ করে গোধূলি বেলায় যখন আকাশ লাল হয়ে ওঠে, তখন ভেনিসকে মনে হয় কোনো শিল্পীর আঁকা ছবি।City & Local Guides
সেন্ট মার্কস স্কয়ার ও ব্যাসিলিকা
ভেনিসের প্রধান চত্বর হলো সেন্ট মার্কস স্কয়ার। এখানে আপনি শত শত পায়রা দেখতে পাবেন, যা আমাদের ঢাকার বায়তুল মোকাররমের কথা মনে করিয়ে দিতে পারে। এখানকার সেন্ট মার্কস ব্যাসিলিকার কারুকাজ এতটাই নিখুঁত যে আপনি মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকবেন।
ফ্লোরেন্স
আপনি যদি শিল্প এবং সংস্কৃতি প্রেমী হন, তবে ফ্লোরেন্স আপনার জন্য স্বর্গ। ইতালির টাস্কানি অঞ্চলের এই শহরটিকে রেনেসাঁর জন্মস্থান বলা হয়। মাইকেলেঞ্জেলো থেকে শুরু করে লিওনার্দো দা ভিঞ্চির মতো কিংবদন্তিদের ছোঁয়া লেগে আছে এই শহরের প্রতিটি কোণায়।
ফ্লোরেন্সের আকাশরেখায় সবচেয়ে বড় যে জিনিসটি আপনার চোখে পড়বে তা হলো ‘ডুমো’। লাল ইটের তৈরি এই বিশাল গম্বুজটি স্থাপত্যের এক অনন্য নিদর্শন। এর চূড়ায় উঠলে আপনি পুরো ফ্লোরেন্স শহরের এক প্যানোরামিক ভিউ পাবেন যা আপনার সারাজীবন মনে থাকবে।
উফিজি গ্যালারি
পৃথিবীর অন্যতম সেরা আর্ট মিউজিয়াম হলো উফিজি গ্যালারি। এখানে বোত্তিচেল্লি, দা ভিঞ্চি এবং রাফায়েলের মতো শিল্পীদের অমর কাজগুলো সংরক্ষিত আছে। শিল্পবোদ্ধাদের কাছে এটি একটি তীর্থস্থানের মতো।
ইতালির প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও উপকূলীয় অঞ্চল
ইতালি মানেই শুধু পুরনো দালান নয়, এর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যও চোখ ধাঁধানো। বিশেষ করে দক্ষিণ ইতালির উপকূলীয় অঞ্চলগুলো এতটাই সুন্দর যে আপনার মনে হবে আপনি কোনো ক্যালেন্ডারের পাতায় ঢুকে পড়েছেন।
আমালফি কোস্ট ও পোসিতানো
আমালফি কোস্টকে বলা হয় পৃথিবীর অন্যতম সুন্দর উপকূল। পাহাড়ের গায়ে রঙ-বেরঙের বাড়ি আর নিচে নীল সমুদ্র—এই দৃশ্য দেখে আপনি ভাষা হারিয়ে ফেলবেন। এখানকার পোসিতানো গ্রামটি পর্যটকদের কাছে খুবই জনপ্রিয়। পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে গড়ে ওঠা এই শহরটির সৌন্দর্য বর্ণনাতীত।
লেক কোমো
উত্তর ইতালিতে অবস্থিত লেক কোমো হলো আভিজাত্যের প্রতীক। চারদিকে পাহাড় আর মাঝখানে স্বচ্ছ নীল জলরাশি। হলিউড তারকাদের অনেকেরই এখানে অবকাশ যাপন কেন্দ্র রয়েছে। আপনি যদি নিরিবিলি এবং শান্ত পরিবেশ পছন্দ করেন, তবে লেক কোমো আপনার তালিকায় অবশ্যই রাখা উচিত।
পিসার
ছোটবেলায় ভূগোলে আমরা অনেকেই পিসার হেলানো মিনারের কথা পড়েছি। বাস্তবে এটি দেখা এক অন্যরকম অভিজ্ঞতা। পিসা শহরটি ছোট হলেও এই একটি মিনারের টানেই প্রতিদিন হাজার হাজার পর্যটক এখানে ভিড় করেন।
অনেকেই প্রশ্ন করেন কেন এটি হেলানো। আসলে নরম মাটির ওপর ভিত্তি স্থাপনের কারণেই নির্মাণের সময় থেকেই এটি হেলতে শুরু করে। পর্যটকরা এখানে এসে মজার সব ছবি তোলেন, যেন তারা মিনারটিকে পড়ে যাওয়া থেকে হাত দিয়ে ঠেকিয়ে রাখছেন। আপনিও কি এমন একটি ছবি তুলতে চান না?
মিলান
আপনি যদি শপিং করতে ভালোবাসেন এবং আধুনিক জীবনযাত্রার ভক্ত হন, তবে মিলান আপনার জন্য সেরা গন্তব্য। এটি ইতালির অর্থনৈতিক রাজধানী এবং বিশ্বের অন্যতম বড় ফ্যাশন হাব।
দুয়োমো ডি মিলানো
মিলানের প্রধান আকর্ষণ হলো এর ক্যাথেড্রাল বা দুয়োমো। সাদা মার্বেল পাথরের তৈরি এই গির্জাটি গথিক স্থাপত্যের এক শ্রেষ্ঠ উদাহরণ। এর ছাদে উঠলে আপনি পুরো মিলান শহর দেখতে পাবেন এবং দূর থেকে আল্পস পর্বতমালাও চোখে পড়বে।
শপিং ও নাইটলাইফ
গ্যালারিয়া ভিত্তোরিও ইমানুয়েল II হলো বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন শপিং মল। এর কাঁচের ছাদ এবং মেঝেতে মোজাইকের কাজ আপনার চোখ ধাঁধিয়ে দেবে। বড় বড় সব ব্র্যান্ডের শোরুম এখানে অবস্থিত।
ইতালির প্রধান পর্যটন কেন্দ্রগুলো
নিচের টেবিলে ইতালির প্রধান শহরগুলোর বিশেষত্ব সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো:
আগে থেকে টিকিট কাটুন: কলোসিয়াম বা উফিজি গ্যালারির মতো জনপ্রিয় জায়গাগুলোর টিকিট কয়েক সপ্তাহ আগেই অনলাইনে বুক করে রাখুন। নয়তো আপনাকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে।
আরামদায়ক জুতো পরুন: ইতালির শহরগুলোতে আপনাকে প্রচুর হাঁটতে হবে। তাই আরামদায়ক কেডস বা স্নিকার্স সাথে রাখুন।
পকেটমার থেকে সাবধান: ইউরোপের বড় শহরগুলোতে ট্যুরিস্ট এলাকায় পকেটমারের উপদ্রব থাকে। তাই নিজের ব্যাগ এবং মানিব্যাগ সাবধানে রাখুন।
পানির বোতল সাথে রাখুন: ইতালির রাস্তায় প্রচুর ‘নাসোনি’ বা পানির কল আছে। এখানকার পানি বিশুদ্ধ ও পানযোগ্য, তাই বোতল ভরে পানি পান করতে পারেন, এতে আপনার টাকা বাঁচবে।







