৭৬.৫ শতাংশ টুথপেষ্টে বিপজ্জনক প্লাষ্টিক কণা

সুস্থতার অভ্যাসে অদৃশ্য বিষপ্রতিদিন ঘুম থেকে উঠে কিংবা রাতে ঘুমানোর আগে দাঁত পরিষ্কার করা সুস্থ ও পরিচ্ছন্ন জীবনের একটি মৌলিক অংশ। শৈশব থেকেই পরিবার, সমাজ ও চিকিৎসকদের মাধ্যমে শেখানো হয়—সুস্থ থাকার অন্যতম পূর্বশর্ত হলো সঠিক মুখগহ্বরের পরিচ্ছন্নতা বা ‘ওরাল হাইজিন’। কিন্তু অবচেতন মনে গড়ে ওঠা এই স্বাস্থ্যকর সুঅভ্যাসই যদি অজান্তে দেহে মরণঘাতী বিষ পৌঁছে দেয়, তবে তা কতটা শঙ্কার? এ জবাব এসেছে পরিবেশ বিষয়ক গবেষণাধর্মী সংস্থা ‘এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন’ (এসডো) এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায়; উন্মোচিত হয়েছে চাঞ্চল্যকর ও ভয়াবহ তথ্য। রোববার (২৬ জুলাই) রাজধানীর লালমাটিয়ায় এসডোর কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে গবেষণার বিস্তারিত ফলাফল তুলে ধরেছে সংস্থাটি।

সংস্থাটির গবেষণা বলছে, বাংলাদেশের বাজারে বিক্রি হওয়া ৩৪টি বিভিন্ন ব্র্যান্ডের টুথপেস্ট পরীক্ষা করে ২৬টিতেই মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর ক্ষুদ্র প্লাস্টিকের কণা বা মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে। প্রতি ১০০ গ্রাম টুথপেস্টে প্লাস্টিকের কণা মিলেছে সর্বনিম্ন ২০টি থেকে সর্বোচ্চ ৩২০টি পর্যন্ত।

গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশ, ভারত, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামে উৎপাদিত টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিক রয়েছে। উদ্বেগের বিষয় হলো, পরীক্ষা করা কোনো টুথপেস্টের মোড়কেই মাইক্রোপ্লাস্টিক বা কৃত্রিম পলিমার ব্যবহারের তথ্য উল্লেখ ছিল না।

বিশেষজ্ঞদের মতে, মাইক্রোপ্লাস্টিক দীর্ঘমেয়াদে শ্বাসতন্ত্র, পরিপাকতন্ত্র, হৃদরোগ, স্নায়ুতন্ত্র, রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা এবং প্রজনন স্বাস্থ্যের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে।

সংস্থাটি জানায়, গত বছরের জুলাই থেকে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত পরিচালিত এ গবেষণায় দেশের ১৯টি ব্র্যান্ডের ৩৪টি টুথপেস্টের নমুনা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের এনভায়রনমেন্টাল হেলথ অ্যান্ড ইকোটক্সিকোলজি ল্যাবরেটরিতে স্টিরিওমাইক্রোস্কোপি ও ফুরিয়ার ট্র্যান্সফর্ম ইনফ্রারেড স্পেকট্রোস্কোপি প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়। পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন এলাকার ২ হাজার ৭৬০ জন ভোক্তার ওপর জরিপ চালানো হয়।

এসডোর চেয়ারম্যান সৈয়দ মারঘুব মোর্শেদ বলেন, বাংলাদেশে টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিক নিয়ে এটিই প্রথম বৈজ্ঞানিক গবেষণা। এটি ভবিষ্যতে জাতীয় মানদণ্ড প্রণয়ন, কার্যকর নিয়ন্ত্রণ এবং ভোক্তা ও পরিবেশ সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

আরও পড়ুন:  জোয়ার ভাটার সম্ভাবনা আছে - আতঙ্কের মধ্যে ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী

গবেষ্ণা প্রতিবেদনে বলা হয়, পরীক্ষা করা টুথপেস্টগুলোর মধ্যে বাংলাদেশে উৎপাদিত ২৫টির ২২টিতে, ভারতে উৎপাদিত ৫টির ১টিতে, থাইল্যান্ডে উৎপাদিত ২টির ১টিতে এবং ভিয়েতনামে উৎপাদিত ২টি ব্র্যান্ডের দুটিতেই মাইক্রোপ্লাস্টিক মিলেছে। আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, শিশুদের জন্য তৈরি বিশেষ ৬টি টুথপেস্টের ৪টিতেই ক্ষতিকর প্লাস্টিকের কণা শনাক্ত করা গেছে।

ফলাফলে উল্লেখ করা হয়, প্রতি ১০০ গ্রাম টুথপেস্টে সবচেয়ে বেশি ৩২০টি মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে মেডিপ্লাস ফ্লুরিড জেলে। এ ছাড়া ক্লোজ আপ রেড হট-এ ১৬০টি, ক্লোজ আপ মেন্থল ফ্রেশ-এ ১৬০টি, কুডুমু আল্ট্রা শিল্ড ফর্মুলা স্ট্রবেরিতে ১৪০টি, সিগন্যাল গ্রিন টি-তে ১২০টি, পেপসোডেন্ট অ্যাডভান্স সল্ট-এ ১০০টি, হিমালয়া কমপ্লিট কেয়ার-এ ১০০টি এবং সেনসোডাইন ফ্রেশ মিন্টে ৮০টি মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে।

শিশুদের ব্যবহারের জন্য তৈরি টুথপেস্টের মধ্যে কুডুমু আল্ট্রা শিল্ড ফর্মুলায় ১৪০টি, মেরিল বেবি স্ট্রবেরিতে ৬০টি, মেরিল বেবি অরেঞ্জে ৪০টি এবং পেপসোডেন্ট কিড অরেঞ্জে ২০টি প্লাস্টিকের কণা ধরা পড়েছে।

এসডোর মহাসচিব ড. শাহরিয়ার হোসেন বলেন, টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিক থাকতে পারে—এ বিষয়ে অধিকাংশ মানুষই অবগত নন। তাই জনসচেতনতা বৃদ্ধি, পণ্যের লেবেলে উপাদানের স্বচ্ছ তথ্য প্রকাশ এবং কার্যকর নিয়ন্ত্রক তদারকি জরুরি।

এসডোর নির্বাহী পরিচালক সিদ্দীকা সুলতানা বলেন, এই গবেষণা বাংলাদেশে টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিক বিষয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক ভিত্তি তৈরি করেছে, যা ভবিষ্যতে মানদণ্ড নির্ধারণ ও নীতিমালা প্রণয়নে সহায়ক হবে।

তবে সব টুথপেস্টে প্লাস্টিক কণা মেলেনি। গবেষণায় দেখা গেছে, দেশীয় ব্র্যান্ড জেনফ্রেশ, প্যারাস্যুট জাস্ট ফর বেবি (ম্যাঙ্গো) এবং ক্লোজ আপ রেড হট জিংক ফ্রেশ টেকনোলজিতে কোনো মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া যায়নি। পাশাপাশি শিশুদের জন্য বাইরে থেকে আমদানিকৃত কুডুমু অরেঞ্জেও ক্ষতিকর মাইক্রোপ্লাস্টিক ধরা পড়েনি বলে নিশ্চিত করেছে এসডো।

দন্ত চিকিৎসক অধ্যাপক ডা. মো. মোশাররফ হোসেন খন্দকার বলেন, দাঁতের পরিচর্যার পণ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিক থাকা উচিত নয়। এটি দাঁত সাদা করতে সহায়তা করলেও এনামেলের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। দাঁতের সুরক্ষায় ফ্লোরাইড, কার্বনেট ও সিলিকাই বেশি প্রয়োজনীয়।

আরও পড়ুন:  উপজেলা নির্বাচনে দলীয় প্রতীক না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে আওয়ামী লীগ

বিএসটিআইয়ের উপপরিচালক মো. মনজুরুল করিম বলেন, বর্তমান টুথপেস্টের মানদণ্ডে মাইক্রোপ্লাস্টিক অন্তর্ভুক্ত নেই। তবে এসআরও সংশোধনের মাধ্যমে মাইক্রোপ্লাস্টিকের মানদণ্ড বা সহনশীল মাত্রা নির্ধারণে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে।

এসডো গবেষণার ভিত্তিতে ব্যক্তিগত পরিচর্যার পণ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিকের জন্য বিজ্ঞানভিত্তিক জাতীয় মানদণ্ড প্রণয়ন, নিয়মিত বাজার তদারকি, পরীক্ষাগারের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং পণ্যের লেবেলে উপাদানের তথ্য প্রকাশ বাধ্যতামূলক করার সুপারিশ করেছে।

মাইক্রোপ্লাস্টিক কী, কেন ক্ষতিকর: ৫ মিলিমিটারের চেয়ে ছোট প্লাস্টিক কণাকে মাইক্রোপ্লাস্টিক বলা হয়। টুথপেস্টে ব্যবহৃত কণাগুলো এতটাই সূক্ষ্ম যে তা খালি চোখে দেখা অসম্ভব। এগুলো প্রধানত দুইভাবে ক্ষতি সাধন করে—

১. মানবদেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি করে। ব্রাশ করার সময় মুখের মিউকাস মেমব্রেন (শ্লেষ্মা ঝিল্লি) দিয়ে অতিসূক্ষ্ম প্লাস্টিক সরাসরি রক্তে মিশে যেতে পারে। প্লাস্টিকে থাকা ‘বিসফেনল-এ’ এবং থ্যালেটস শরীরের হরমোন নিঃসরণে বাধা সৃষ্টি করে, যা শিশুদের স্বাভাবিক বিকাশে ব্যাঘাত ঘটায় এবং প্রাপ্তবয়স্কদের প্রজনন ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। এছাড়া পরিপাকতন্ত্র, যকৃৎ ও বৃক্কে প্লাস্টিক জমা হতে থাকলে তা কোষের ভেতরে ক্রমাগত প্রদাহ ও টিস্যু ড্যামেজ তৈরি করে ক্যানসারের পথ প্রশস্ত করে।

২. প্রতিদিন ব্রাশ করার পর বেসিন থেকে কোটি কোটি প্লাস্টিক কণা ড্রেনের পানির সাথে নদী ও সাগরে গিয়ে পড়ে। সাধারণ ওয়াটার ফিল্টারেও এসব অতিসূক্ষ্ম কণা আটকায় না। সামুদ্রিক মাছ ও জলজ প্রাণী এগুলোকে খাবার মনে করে গ্রহণ করে। পরবর্তীতে ‘বায়ো-অ্যাকিউমুলেশন’ বা জৈব-সঞ্চয়ন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সেই প্লাস্টিক আক্রান্ত মাছ মানুষের পাতেই ফিরে আসে—তৈরি হয় ভয়াবহ বিষচক্র!

সচেতনতার অভাব ও আইনি শূন্যতা: পরীক্ষা করা কোনো টুথপেস্টের মোড়কে বা লেবেলে মাইক্রোপ্লাস্টিক বা সিনথেটিক পলিমার ব্যবহারের তথ্য উল্লেখ না থাকায় সচেতন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। ভোক্তা জরিপ অনুযায়ী ৪১.৯ শতাংশ মানুষ টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিক থাকা সম্পর্কে ইতিপূর্বে কখনো শোনেনইনি। ৩১.৩ শতাংশ কিছুটা শুনলেও বিস্তারিত বা এর পরিণতি সম্পর্কে জানেন না। আর মাত্র ২৬.৯ শতাংশ উত্তরদাতা এ বিষয়ে কিছুটা সচেতন।

আরও পড়ুন:  ৭ মাসে অনেক কিছু হয়েছে, এনাফ ইজ এনাফ : সেনাপ্রধান

এই নীরব মহামারি থেকে বাঁচতে পরিবেশবিদ ও বিশেষজ্ঞরা সুনির্দিষ্ট কিছু পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

তারা বলেছেন, বিএসটিআই ও সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাকে অবিলম্বে প্রসাধন সামগ্রী ও টুথপেস্টে ‘মাইক্রোবিডস’ বা অণু-প্লাস্টিকের ব্যবহার কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করতে হবে। টুথপেস্ট প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানগুলোকে কৃত্রিম পলিমারের বদলে চারকোল, প্রাকৃতিক সিলিকা, বেকিং সোডা বা নিম-তুলসীর মতো পরিবেশবান্ধব উপাদান ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। টুথপেস্টের প্যাকেজিংয়ে সঠিক রাসায়নিক উপাদান ও মাইক্রোপ্লাস্টিক-মুক্ত কি না তা স্পষ্টভাবে লেখা বাধ্যতামূলক করতে হবে। শিশুদের ব্রাশ করার সময় সঠিক পরিমাণ (সর্বোচ্চ মটরশুঁটি দানার সমান) টুথপেস্ট দেওয়া এবং ব্রাশ করার পুরো সময় পাশে থেকে গিলে ফেলা রোধ করতে হবে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, দাঁত ও মুখের সুরক্ষায় যে পণ্যটি আমরা প্রতিদিন অপরিহার্য মনে করে অন্তত দু’বার ব্যবহার করছি, তাতেই যদি এমন মরণঘাতী উপাদান লুকিয়ে থাকে, তবে তা শুধু হতাশাজনকই নয়—একই সাথে আমাদের অস্তিত্বের জন্যও বিরাট এক প্রশ্নবোধক চিহ্ন। ইএসডিও (ESDO) এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের এই গবেষণা আমাদের চোখের সামনের পর্দা সরিয়ে দিয়েছে। এখন প্রয়োজন সরকারের কঠোর মনিটরিং, প্রস্তুতকারকদের বাণিজ্যিক সততা এবং সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন আমাদের নিজস্ব সচেতনতা। নিরাপদ টুথপেস্ট বেছে নেওয়ার এই আন্দোলন শুরু হোক আজ আপনার ঘর থেকেই!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *