নেইমারের ফেরার ম্যাচে ভিনির জোড়া গোলে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়ে নকআউটে ব্রাজিল

নিজেদের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা নেইমার জুনিয়রকে আবার মাঠে পেতে ব্রাজিলকে অপেক্ষা করতে হয়েছে দীর্ঘ ৭৮১ দিন। চোটজর্জর সময় পেরিয়ে তার প্রত্যাবর্তনের ম্যাচে অবশ্য মাঠের আলোটা কাড়লেন ভিনিসিয়ুস জুনিয়র ও ম্যাথিউস কুনহা। তাদের গোলেই স্কটল্যান্ডকে ৩-০ ব্যবধানে উড়িয়ে দিয়ে ‘সি’ গ্রুপের চ্যাম্পিয়ন হিসেবে নকআউট পর্বে জায়গা করে নিয়েছে ব্রাজিল।

মায়ামির হার্ড রক স্টেডিয়ামে ম্যাচের শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ছিল সেলেসাওরা। মাত্র সপ্তম মিনিটেই ব্রাজিলকে এগিয়ে দেন ভিনিসিয়ুস জুনিয়র। স্কটল্যান্ডের সেন্টার-ব্যাক স্কট ম্যাককেনার ভুলে পাওয়া সুযোগটি কাজে লাগাতে ভুল করেননি তিনি। স্কটিশ গোলরক্ষক অ্যাঙ্গাস গুনকে কাটিয়ে ঠান্ডা মাথায় বল জালে পাঠান এই ব্রাজিলিয়ান তারকা। এরপর প্রথমার্ধের যোগ করা সময়ে ব্রুনো গুইমারেসের বাড়ানো দারুণ ক্রসে মাথা ছুঁইয়ে ব্যবধান দ্বিগুণ করেন ভিনি। চলতি বিশ্বকাপে সেটি ছিল তার চতুর্থ গোল।

প্রথমার্ধেই দুই গোলে পিছিয়ে পড়া স্কটল্যান্ড বিরতির পর ম্যাচে ফেরার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে। একের পর এক আক্রমণও চালায় তারা। তবে ব্রাজিলের গোলরক্ষক অ্যালিসন বেকার হয়ে ওঠেন তাদের সবচেয়ে বড় বাধা। গোললাইন থেকে একাধিক বল ফিরিয়ে স্কটিশদের হতাশ করেন তিনি। উল্টো ৬০তম মিনিটে আবারও গোল হজম করে বসে স্কটল্যান্ড। ব্রুনো গুইমারেসের দ্বিতীয় অ্যাসিস্ট থেকে নিজের তৃতীয় গোলটি করেন ম্যাথিউস কুনহা। গোলের পর স্বভাবসুলভ সার্ফার ভঙ্গির উদযাপনে মেতে ওঠেন তিনি, যোগ দেন লুকাস পাকেতাও।

আরও পড়ুন:  বিজেপি সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারালেও এনডিএ আসন পেয়েছে ২৯৬টি

অনেক দিন ধরে নির্ভরযোগ্য নাম্বার নাইন খুঁজতে থাকা ব্রাজিলের জন্য কুনহা যেন হয়ে উঠছেন সেই কাঙ্ক্ষিত সমাধান। আগের ম্যাচে হাইতির বিপক্ষেও জোড়া গোল করেছিলেন তিনি। স্কটল্যান্ডের বিপক্ষেও গোল করে নিজের ধারাবাহিকতা ধরে রাখলেন এই ফরোয়ার্ড।

ম্যাচে আরও কয়েকটি সুযোগ কাজে লাগাতে পারলে জয়ের ব্যবধান আরও বড় হতে পারত ব্রাজিলের। তবে ২০২৩ সালের ১৭ অক্টোবরের পর নেইমারের প্রত্যাবর্তন, স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে দাপুটে জয় এবং গ্রুপসেরা হয়ে নকআউটে ওঠা, সব মিলিয়ে সন্তুষ্ট থাকারই কথা পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের। বিশেষ করে দ্বিতীয়ার্ধে স্কটল্যান্ডের একের পর এক আক্রমণ সামলে অ্যালিসনের দুর্দান্ত সেভগুলো ব্রাজিলকে বড় স্বস্তি দিয়েছে। স্কটিশ তারকা স্কট ম্যাকটোমিনের একাধিক প্রচেষ্টা রুখে দিয়েছেন তিনি।

পরিসংখ্যানেও ছিল ব্রাজিলের আধিপত্য। প্রথমার্ধে বলের দখলে কিছুটা পিছিয়ে থাকলেও দ্বিতীয়ার্ধে খেলার নিয়ন্ত্রণ নেয় আনচেলত্তির দল। ম্যাচে তারা মোট ২১টি শট নেয়, যার ৮টি ছিল লক্ষ্যে। বিপরীতে স্কটল্যান্ড ৯টি শটের ৫টি লক্ষ্যে রাখতে পেরেছে। তিন ম্যাচে ৭ পয়েন্ট নিয়ে ‘সি’ গ্রুপের শীর্ষে থেকে শেষ করেছে ব্রাজিল। আর ৩ পয়েন্ট নিয়ে তৃতীয় স্থানে থেকে বিদায় নিয়েছে স্কটল্যান্ড।

আরও পড়ুন:  যুদ্ধাপরাধে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বাচ্চু রাজাকারের আত্মসমর্পণ

তবে এই জয়ের আরেকটি বড় গল্প ভিনিসিয়ুস জুনিয়রকে ঘিরে। চলতি বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বের তিন ম্যাচেই গোল করেছেন তিনি। মরক্কোর বিপক্ষে প্রথম ম্যাচে দলের একমাত্র গোল, হাইতির বিপক্ষে আরেকটি গোল, আর স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে জোড়া গোল, সব মিলিয়ে তিন ম্যাচ শেষে তার গোলসংখ্যা দাঁড়িয়েছে চারটিতে।

ব্রাজিলের ফুটবল ইতিহাসে একটি বিশেষ পরিসংখ্যান আছে। বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বের প্রতিটি ম্যাচে যে ব্রাজিলিয়ান ফুটবলার গোল করেছেন, শেষ পর্যন্ত তার হাতেই উঠেছে বিশ্বকাপের ট্রফি। ১৯৭০ সালে জাইরজিনিও, ১৯৯৪ সালে রোমারিও এবং ২০০২ সালে রোনালদো নাজারিও ও রিভালদো এই কীর্তি গড়েছিলেন। কাকতালীয়ভাবে প্রতিবারই বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়েছিল ব্রাজিল। সেই ইতিহাসই এবার নতুন করে আলোচনায় এনে দিয়েছেন ভিনিসিয়ুস।

বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে তিন ম্যাচে চার গোল করা মাত্র চতুর্থ ব্রাজিলিয়ান ফুটবলার হিসেবেও ইতিহাসে নাম লিখিয়েছেন তিনি। তার আগে এই কীর্তি ছিল জাইরজিনিও, রোনালদো এবং নেইমারের। ১৯৭০ বিশ্বকাপে জাইরজিনিও চেকোস্লোভাকিয়ার বিপক্ষে দুটি এবং ইংল্যান্ড ও রোমানিয়ার বিপক্ষে একটি করে গোল করেছিলেন। ২০০২ সালে রোনালদো তুরস্ক ও চীনের বিপক্ষে একটি করে এবং কোস্টারিকার বিপক্ষে দুটি গোল করেন। ২০১৪ বিশ্বকাপে নেইমার ক্রোয়েশিয়া ও ক্যামেরুনের বিপক্ষে দুটি করে গোল করলেও মেক্সিকোর বিপক্ষে গোল পাননি।

আরও পড়ুন:  হাইতিকে ৩-০ গোলে হারিয়েছে ব্রাজিল

এখন ভিনিসিয়ুসের সামনে আরও বড় মঞ্চ। গ্রুপ পর্বে চার গোল করলেও জাইরজিনিও সেই বিশ্বকাপ শেষ করেছিলেন সাত গোল নিয়ে, আর ২০০২ সালে আট গোল করে টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়েছিলেন রোনালদো। ফলে নকআউট পর্বে নিজের এই দুর্দান্ত ফর্ম ধরে রাখতে পারলে শুধু কিংবদন্তিদের পাশে নাম লেখানোই নয়, গোলসংখ্যায় তাদের ছাড়িয়ে যাওয়ারও সুযোগ আছে ভিনিসিয়ুসের সামনে।

নেইমারের প্রত্যাবর্তনের আনন্দ, কুনহার গোলের ধারাবাহিকতা, অ্যালিসনের নির্ভরতা আর ভিনিসিয়ুসের টানা গোল, সব মিলিয়ে ব্রাজিলের শিবিরে এখন নতুন আশার আলো। ইতিহাস যদি আবারও একই পথে হাঁটে, তবে ভিনিসিয়ুসের এই ধারাবাহিকতা সেলেসাওদের ‘হেক্সা’ স্বপ্নকে আরও জোরালো করেই তুলছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *