বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার উদ্বোধনী ম্যাচের ইতিহাস

এই বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা প্রথমবারের মতো মাঠে নামবে বুধবার। বাংলাদেশ সময় সকাল ৭টায় তারা মুখোমুখি হবে আলজেরিয়ার। এই আসরের আগে আর্জেন্টিনা মোট ১৮টি বিশ্বকাপে অংশ নিয়েছে। বছরের পর বছর ধরে নিজেদের প্রথম ম্যাচগুলোতে কেমন খেলেছে তারা?

উরুগুয়ে ১৯৩০: আর্জেন্টিনা ১-০ ফ্রান্স

১৯৩০ সালের ১৫ জুলাই আর্জেন্টিনা তাদের ইতিহাসের প্রথম বিশ্বকাপ ম্যাচ খেলে। ৮১ মিনিটে লুইস মন্তির জয়সূচক গোলে ফ্রান্সের বিপক্ষে জয় নিশ্চিত করে আলবিসেলেস্তেরা। মজার ব্যাপার হলো, মন্তি পরের বিশ্বকাপটি ইতালির হয়ে জিতেছিলেন। প্রথম বিশ্বকাপে রানার্স-আপ হয়ে সফর শেষ করে আর্জেন্টিনা। ফাইনালে স্বাগতিক উরুগুয়ের কাছে তারা ৪-২ ব্যবধানে হেরেছিল।

ইতালি ১৯৩৪: আর্জেন্টিনা ২-৩ সুইডেন

নিজেদের দ্বিতীয় বিশ্বকাপে প্রথম ম্যাচেই হারের মুখ দেখে আর্জেন্টিনা। সেটিই ছিল টুর্নামেন্টে তাদের শেষ ম্যাচ, কারণ সেবার প্রতিযোগিতাটি সরাসরি নকআউট ফরম্যাটে অনুষ্ঠিত হয়েছিল।

বোলোগনার রেনাতো দাল্লারা স্টেডিয়ামে আর্নেস্তো বেলিসের গোলে আর্জেন্টিনা প্রথমে এগিয়ে গেলেও সভেন ইয়োনাসন দ্রুতই সমতা ফেরান। আলবার্তো গালাতেও আর্জেন্টিনাকে আবারও এগিয়ে দেন। কিন্তু ইয়োনাসন ও নাট ক্রুনের একটি করে গোলে স্ক্যান্ডিনেভিয়ানরা জয় তুলে নেয়।

সুইডেন ১৯৫৮: আর্জেন্টিনা ১-৩ পশ্চিম জার্মানি

টানা তিনটি বিশ্বকাপে অংশ নিতে অস্বীকৃতি জানানোর পর ১৯৫৮ সালে বৈশ্বিক মঞ্চে ফেরে আর্জেন্টিনা। তবে তাদের ফেরা মোটেও সুখকর হয়নি। ওরেস্তে করবাত্তার গোলে আর্জেন্টিনা শুরুতে লিড নিলেও হেলমুট রানের জোড়া গোল ও উভে সিলারের এক গোলে জয় তুলে নেয় পশ্চিম জার্মানি। পরে চেকোস্লোভাকিয়ার কাছে ৬-১ গোলে বিধ্বস্ত হয়ে গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নেয় আর্জেন্টিনা। তাদের একমাত্র জয়টি এসেছিল উত্তর আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে।

চিলি ১৯৬২: আর্জেন্টিনা ১-০ বুলগেরিয়া

রানকাগুয়ায় হেক্টর ফাকুন্দোর একমাত্র গোলে জয় দিয়ে শুরু করেছিল আর্জেন্টিনা। তবে পরের ম্যাচগুলোতে ইংল্যান্ডের কাছে ৩-১ গোলে হার ও হাঙ্গেরির সঙ্গে গোলশূন্য ড্র করায় তারা পরবর্তী রাউন্ডে যেতে ব্যর্থ হয়।

ইংল্যান্ড ১৯৬৬: আর্জেন্টিনা ২-১ স্পেন

টানা দ্বিতীয় আসরে জয় দিয়ে শুরু করল আর্জেন্টিনা। লুইস আরতিমের জোড়া গোলে স্পেনের বিপক্ষে জয় দিয়ে বিশ্বকাপ অভিযান শুরু করে আর্জেন্টিনা। পশ্চিম জার্মানির সঙ্গে ড্র ও সুইজারল্যান্ডকে হারিয়ে তারা গ্রুপ রানার্স-আপ হিসেবে পরের পর্বে গেলেও কোয়ার্টার ফাইনালে স্বাগতিক ইংল্যান্ডের কাছে হেরে বিদায় নেয়।

আরও পড়ুন:  ল্যুভর জাদুঘরে দুর্ধর্ষ চুরি, বন্ধ ঘোষণা

পশ্চিম জার্মানি ১৯৭৪: আর্জেন্টিনা ২-৩ পোল্যান্ড

১৯৭০ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপে কোয়ালিফাই করতে পারেনি আর্জেন্টিনা। তাদের ইতিহাসে এমন ঘটনা কেবল ওই একবারই ঘটেছে। ১৯৭৪ সালে তাদের প্রত্যাবর্তন ম্যাচটিও শুরু হয় হার দিয়ে। স্টুটগার্টে পোল্যান্ডের কাছেহারে তারা। অবশ্য ইতালির সঙ্গে ড্র ও হাইতির বিপক্ষে দারুণ জয়ে তারা দ্বিতীয় রাউন্ডে উঠেছিল। কিন্তু নেদারল্যান্ডস, ব্রাজিল ও পূর্ব জার্মানির কাছে হেরে তাদের মিশন শেষ হয়।

আর্জেন্টিনা ১৯৭৮: আর্জেন্টিনা ২-১ হাঙ্গেরি

ঘরের মাঠের বিশ্বকাপে কষ্টার্জিত জয় দিয়ে শুরু করে আর্জেন্টিনা। দানিয়েল বের্তোনির শেষ মুহূর্তের গোলে হাঙ্গেরির বিপক্ষে জয় নিশ্চিত হয় সিজার লুইস মেনোত্তির দলের। পরবর্তীতে ফাইনালে নেদারল্যান্ডসকে ৩-১ গোলে হারিয়ে তারা প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ ট্রফি উঁচিয়ে ধরে।

স্পেন ১৯৮২: আর্জেন্টিনা ০-১ বেলজিয়াম

ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন হিসেবে শুরুতেই বড় ধাক্কা খায় আর্জেন্টিনা। ক্যাম্প ন্যুতে এরউইন ভ্যানডেনবার্গের গোলে বেলজিয়ামের কাছে প্রথম ম্যাচেই হেরে যায় তারা। এরপর হাঙ্গেরি ও এল সালভাদরকে হারিয়ে পরের রাউন্ডে পৌঁছালেও ইতালি ও ব্রাজিলের কাছে হেরে বিদায় নিতে হয়।

মেক্সিকো ১৯৮৬: আর্জেন্টিনা ৩-১ দক্ষিণ কোরিয়া

যে টুর্নামেন্টে ডিয়েগো ম্যারাডোনা বিশ্বকাপ উঁচিয়ে ধরেছিলেন, সেটির শুরুটা হয়েছিল জয় দিয়ে। মেক্সিকো সিটির অলিম্পিক স্টেডিয়ামে হোর্হে ভালদানোর জোড়া গোল ও অস্কার রুগেলির এক গোলে দক্ষিণ কোরিয়াকে হারায় আর্জেন্টিনা। পরবর্তীতে অ্যাজটেকা স্টেডিয়ামে ফাইনালে পশ্চিম জার্মানিকে ৩-২ গোলে হারিয়ে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয় তারা।

ইতালি ১৯৯০: আর্জেন্টিনা ০-১ ক্যামেরুন

স্পেন বিশ্বকাপের মতোই ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন হিসেবে শিরোপা ধরে রাখার মিশনে নেমে প্রথম ম্যাচেই হোঁচট খায় আর্জেন্টিনা। ফ্রাঁসোয়া ওমাম-বিয়িকের গোলে ক্যামেরুন এক ঐতিহাসিক জয় পায়। অবশ্য এই ধাক্কার পরও আর্জেন্টিনা ফাইনালে উঠেছিল। কিন্তু আন্দ্রেয়াস ব্রেহমের পেনাল্টি গোলে পশ্চিম জার্মানির কাছে ১-০ ব্যবধানে হেরে যায়।

আরও পড়ুন:  আর্জেন্টিনার ইতিহাস গড়া জয়, কোপার শিরোপা মেসিদের

যুক্তরাষ্ট্র ১৯৯৪: আর্জেন্টিনা ৪-০ গ্রিস

ক্যামেরার সামনে ম্যারাডোনার সেই বুনো উদযাপনের জন্য এই ম্যাচটি স্মরণীয় হয়ে আছে। আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে অনায়াসে জয় ছিল এটি। গ্যাব্রিয়েল বাতিস্তুতার হ্যাটট্রিকে গ্রিসকে উড়িয়ে দেয় আর্জেন্টিনা। তবে ডোপ টেস্টে ম্যারাডোনা পজিটিভ প্রমাণিত হওয়ায় টুর্নামেন্টটি দ্রুতই আর্জেন্টিনার জন্য অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। ফেভারিট হিসেবে অংশ নিলেও শেষ পর্যন্ত রাউন্ড অব ১৬-এ রোমানিয়ার কাছে ৩-২ গোলে হেরে বিদায় নেয় তারা।

ফ্রান্স ১৯৯৮: আর্জেন্টিনা ১-০ জাপান

বিশ্বকাপে প্রথমবার খেলতে আসা জাপানের বিপক্ষে জিততে বেশ বেগ পেতে হয়েছিল আর্জেন্টিনার। বাতিস্তুতা জয়সূচক গোলটি করেন। কোয়ার্টার ফাইনালে নেদারল্যান্ডসের কাছে ২-১ গোলে হেরে তাদের তৃতীয় শিরোপার স্বপ্ন ভেঙে যায়।

দক্ষিণ কোরিয়া-জাপান ২০০২: আর্জেন্টিনা ১-০ নাইজেরিয়া

কাশিমা স্টেডিয়ামে বাতিস্তুতার একমাত্র গোলে আবারও জয় দিয়ে শুরু করে আর্জেন্টিনা। মার্সেলো বিয়েলসার অত্যন্ত শক্তিশালী দলটির জন্য নাইজেরিয়ার বিপক্ষে এই জয়টিই ছিল একমাত্র সান্ত্বনা। কারণ এরপর ইংল্যান্ডের কাছে হার এবং সুইডেনের সাথে ড্র করে তারা গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নেয়। অথচ কোয়ালিফায়ারে দাপট দেখিয়ে ফেভারিট হিসেবে তারা ওই আসরে অংশ নিয়েছিল।

জার্মানি ২০০৬: আর্জেন্টিনা ২-১ আইভরি কোস্ট

বিশ্বকাপে নবাগত দল আইভরি কোস্টের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে শুরু করে আর্জেন্টিনা। হার্নান ক্রেসপো ও হাভিয়ের সাভিওলার গোলে তারা ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে যায়, পরে দিদিয়ের দ্রগবা একটি গোল শোধ করেন। কোয়ার্টার ফাইনালে স্বাগতিক জার্মানির কাছে পেনাল্টি শুটআউটে হেরে বিদায় নেয় আর্জেন্টাইন ফুটবলারদের অন্যতম সেরা প্রজন্ম।

দক্ষিণ আফ্রিকা ২০১০: আর্জেন্টিনা ১-০ নাইজেরিয়া

টানা তৃতীয়বারের মতো আফ্রিকান কোনো প্রতিপক্ষের বিপক্ষে বিশ্বকাপ মিশন শুরু করে আর্জেন্টিনা। দ্বিতীয়বার তারা মুখোমুখি হয় নাইজেরিয়ার, যাদের গোলরক্ষক ভিনসেন্ট এনিয়েমার অসাধারণ পারফরম্যান্স সত্ত্বেও গ্যাব্রিয়েল হেইঞ্জের জোরালো হেডার ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করে দেয়। ম্যারাডোনার কোচিংয়ে থাকা আর্জেন্টিনা সেবারও কোয়ার্টার ফাইনালে জার্মানির কাছে ৪-০ গোলে বিধ্বস্ত হয়ে বিদায় নেয়।

আরও পড়ুন:  আমাশয় প্রতিরোধ করার উপায়

ব্রাজিল ২০১৪: আর্জেন্টিনা ২-১ বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা

বসনিয়া সেবারই প্রথম বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করেছিল। কিন্তু কাজটা সহজ ছিল না। সিড কোলাসিনাকের একটি আত্মঘাতী গোল ও লিওনেল মেসির একটি দুর্দান্ত স্ট্রাইকে আর্জেন্টিনা এগিয়ে যায়। যদিও শেষ দিকে বেদাদ ইবিসেভিচ গোল করে ম্যাচটি জমিয়ে তুলেছিলেন। আলেহান্দ্রো সাবেয়ার অধীনে আর্জেন্টিনা ফাইনালে উঠলেও অতিরিক্ত সময়ের গোলে জার্মানির কাছে ১-০ ব্যবধানে শিরোপা হারায়।

রাশিয়া ২০১৮: আর্জেন্টিনা ১-১ আইসল্যান্ড

মস্কোর স্পার্তাক এরেনা বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার অন্যতম বাজে শুরুর সাক্ষী হয়েছিল। সার্জিও আগুয়েরো গোল করলেও আলফ্রেড ফিনবোগাসন সমতা ফেরান ও লিওনেল মেসি পেনাল্টি মিস করলে ম্যাচটি ড্রতে শেষ হয়। এটি ছিল হোর্হে সাম্পাওলির দলের পতনের শুরু। নাইজেরিয়ার বিপক্ষে নাটকীয় জয়ে গ্রুপ পর্ব পার হয়েছিল তারা। কিন্তু শেষ ষোলোতে ফ্রান্সের কাছে ৪-৩ গোলে হেরে বিদায় নেয় আর্জেন্টিনা।

কাতার ২০২২: আর্জেন্টিনা ১-২ সৌদি আরব

আর্জেন্টিনার সর্বশেষ বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচের ধাক্কা এখনও সবার স্মৃতিতে তাজা। লিওনেল মেসি পেনাল্টি থেকে আর্জেন্টিনাকে লিড এনে দিলেও সালেহ আল-শেহরি ও সালেম আল-দাওসারির গোলে সৌদি আরব এক অবিস্মরণীয় জয় তুলে নেয়। তাতে আর্জেন্টিনার টানা ৩৬ ম্যাচের অপরাজিত থাকার রেকর্ড ভেঙে যায়। তবে এরপর কী ঘটেছিল তা সবারই জানা। মেক্সিকোকে হারিয়ে সেই যে ঘুরে দাঁড়াল, ফাইনালে ফ্রান্সকে হারিয়ে শেষ পর্যন্ত বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয় আর্জেন্টিনা।

সব মিলিয়ে ১৮টি বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচের মধ্যে আর্জেন্টিনা ১১টিতে জয় পেয়েছে, ৬টিতে হেরেছে এবং ১টি ম্যাচ ড্র হয়েছে। তারা মোট ২৭টি গোল করেছে এবং হজম করেছে ১৯টি। কেবল ১৯৮২ ও ১৯৯০ সালের বিশ্বকাপেই তারা নিজেদের প্রথম ম্যাচে কোনো গোল করতে পারেনি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *