লবণাক্ততায় প্রজনন স্বাস্থ্য সংকটে উপকূলীয় নারীরা

দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমের উপকূলীয় অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত লবণাক্ততা কৃষিসহ পরিবেশগত সংকটের সঙ্গে স্থানীয় নারীদের প্রজনন স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা উপকূলীয় এলাকার প্রায় ৮৬ শতাংশ নারীই ‘পেলভিক ইনফ্ল্যামেটরি ডিজিজ (পিআইডি) নামের প্রজননতন্ত্রের সংক্রমণে ভুগছে। গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পার্টিসিপেটরি রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (সিপিআরডি) গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে।

দীর্ঘদিন লবণাক্ত পানির সংস্পর্শ, সুপেয় পানির অভাব এবং পুষ্টিহীনতাকে উপকূলীয় নারীদের এই স্বাস্থ্য সমস্যার প্রধান কারণ হিসেবে গবেষণায় চিহ্নিত করা হয়েছে।

আজ শনিবার রাজধানীর মহাখালীর ব্র্যাক সেন্টারে সিপিআরডি আয়োজিত এক নীতি সংলাপে দুটি পৃথক গবেষণার ফলাফল উপস্থাপন করা হয়। সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার সাতটি ইউনিয়নের ৪০০ নারীর ওপর পরিচালিত গবেষণাটি উপস্থাপন করেন সিপিআরডির গবেষণা কর্মকর্তা সোহানুর রহমান ও শাহাদাত হোসেন। এর বিষয়বস্তু বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে নারীদের প্রজনন স্বাস্থ্যের ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মূল্যায়ন।

গবেষকেরা জানান, গত অক্টোবর-নভেম্বর মাসে খানা জরিপ, নৃমানবিক পরিমাপ এবং ল্যাবরেটরি পরীক্ষার মাধ্যমে মাঠপর্যায়ের তথ্য সংগ্রহ করা হয়।

এতে দেখা যায়, উপকূলীয় নারীরা বছরের বিভিন্ন সময় একাধিক জলবায়ুঘটিত দুর্যোগের সম্মুখীন হন। এগুলোর মধ্যে ৯২ শতাংশ নারী ঘূর্ণিঝড় এবং ৬৩ শতাংশ নারী লবণাক্ততার প্রত্যক্ষ প্রভাবের শিকার। ৮৩ শতাংশ নারী নিরাপদ পানির তীব্র অভাবে রয়েছে। তারা বৃষ্টির পানি (৫৬ শতাংশ) ও নলকূপের লবণাক্ত পানির (৪০ শতাংশ) ওপর নির্ভর করে। ৩৯ শতাংশ নারী বেশি দামে পানি কিনতে বাধ্য হয়। ১৬ শতাংশ পুকুরের দূষিত পানিই ব্যবহার করে।

আরও পড়ুন:  হাদির কবর জিয়ারত করলেন তারেক রহমান

গবেষণায় বলা হয়, লবণাক্ত ও দূষিত পানির দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহার নারীদের স্বাস্থ্য ও প্রজনন ব্যবস্থার ওপর গুরুতর প্রভাব ফেলছে। অংশগ্রহণকারী নারীদের ৫০ শতাংশ অনিয়মিত ঋতুস্রাবজনিত সমস্যায় ভুগছে। জরিপে অংশ নেওয়া ৪০০ নারীর মধ্যে ৩৪৪ জনই (৮৬ শতাংশ) প্রজননতন্ত্রের সংক্রমণের অন্তত একটি উপসর্গে ভুগছে।

নারীরা গৃহস্থালি কাজ, পানি সংগ্রহ, চিংড়িঘের বা লবণাক্ত কৃষিজমির কাজে দীর্ঘ সময় নোনাপানির সংস্পর্শে থাকায় সংক্রমণের ঝুঁকি বেড়ে যায় বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়। পাশাপাশি ৬৯ শতাংশ নারীই সপ্তাহে তিন দিন বা তার কম সময় প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার গ্রহণ করে, যা গর্ভকালীন জটিলতা বাড়াচ্ছে। উপকূলীয় প্রায় ৮০ শতাংশ পরিবারের মাসিক আয় ১৫ হাজার টাকার কম হওয়ায় এই সংকট আরও গভীর হয়েছে।

সংলাপে দেশের স্বাস্থ্য খাতে জলবায়ু অর্থায়নের নীতিগত লক্ষ্য ও আর্থিক বাস্তবতা বিষয়ের দ্বিতীয় গবেষণাটি উপস্থাপন করেন সিপিআরডির প্রকল্প ব্যবস্থাপক সুমাইয়া বিনতে আনোয়ার। এতে বলা হয়, মাঠপর্যায়ে স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়লেও জাতীয় বাজেটে জলবায়ু-স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ ক্রমাগত কমছে।

আরও পড়ুন:  ২০২৪ সালে প্রতি ১০ মিনিটে একজন নারী হত্যার শিকার: জাতিসংঘ

পাঁচ বছরের বাজেট বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২১-২২ অর্থবছরে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের জলবায়ু-সম্পর্কিত বরাদ্দ ছিল ২ দশমিক ৭৪ শতাংশ। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা কমে ১ দশমিক ৯৭ শতাংশে (৬১০ কোটি টাকা) নেমে এসেছে। সরকার বিভিন্ন জাতীয় নীতি ও পরিকল্পনা গ্রহণ করলেও বাস্তবায়নে অর্থায়নের ঘাটতি রয়েছে। শুধু স্বাস্থ্য খাতের জলবায়ু অভিযোজন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ২০২৬-২০৩০ সময়ে ১৪০ কোটি ডলারের সমপরিমাণ অর্থ প্রয়োজন, যা বর্তমান বরাদ্দের তুলনায় কম।

এই গবেষণায় আরও বলা হয়, বাংলাদেশ ক্লাইমেট চেঞ্জ ট্রাস্ট ফান্ডের (বিসিসিটিএফ) বরাদ্দের ৫৮ শতাংশই অবকাঠামো খাতে ব্যয় হয়। কিন্তু স্বাস্থ্য, খাদ্যনিরাপত্তা ও সামাজিক সুরক্ষার মতো জরুরি খাতে বরাদ্দ মাত্র ৯ শতাংশ।

নীতি সংলাপে বিশেষজ্ঞরা আসন্ন বাজেটের জন্য কয়েকটি সুপারিশ তুলে ধরেন। এগুলোর মধ্যে রয়েছে জাতীয় বাজেটের সঙ্গে স্বাস্থ্য অভিযোজন পরিকল্পনার সরাসরি সমন্বয়, উপকূলীয় নারীদের জন্য বিশেষ প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ, নিরাপদ পানির শতভাগ নিশ্চিতকরণ এবং জলবায়ু তহবিল থেকে মানব উন্নয়ন ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়ানো।

সংলাপের সঞ্চালক এবং অনুষ্ঠানের আয়োজক সিপিআরডির নির্বাহী পরিচালক মো. শামসুদ্দোহা বলেন, ‘জলবায়ু অর্থায়ন এখনো একটি অস্পষ্ট ক্ষেত্র। বৈশ্বিক পর্যায়ে অধিক মনোযোগ ও অর্থায়ন আকর্ষণ করতে হলে আমাদের শক্তিশালী পরিমাণগত প্রমাণ উপস্থাপন করতে হবে।’

আরও পড়ুন:  লাব্বাইক ধ্বনিতে মুখরিত আরাফাত ময়দান

সরকারের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) উপসচিব ড. শাহ আবদুল সাদী বলেন, জলবায়ু অর্থায়নের জন্য সুস্পষ্ট ক্লাইমেট রেশনাল (জলবায়ু যুক্তি) প্রতিষ্ঠা জরুরি। তিনি জলবায়ু বাজেট ট্যাগিং আরও স্পষ্ট করা, ঝুঁকি সূচক উন্নয়ন এবং তৃতীয় পক্ষীয় যাচাই ব্যবস্থার প্রস্তাব দেন।

স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড হেলথ প্রমোশন ইউনিটের (সিসিএইচপিইউ) পরিচালক ও কো-অর্ডিনেটর অধ্যাপক ড. মো. ইকবাল কবির বলেন, ‘বৈশ্বিক জলবায়ু অর্থায়নের মাত্র ৫ শতাংশ স্বাস্থ্য খাতে যায়, যা এই খাতের বৈশ্বিক অবহেলার প্রমাণ।’

অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের অতিরিক্ত সচিব এ কে এম সোহেল আহমেদ বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন এখনো উন্নয়ন পরিকল্পনায় পুরোপুরি মূলধারায় আসেনি, ফলে উদ্যোগগুলো বিচ্ছিন্নভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে।

সংলাপে সরকারি কর্মকর্তা, গবেষক, উন্নয়ন সহযোগী, শিক্ষাবিদ, নাগরিক সমাজ ও গণমাধ্যমকর্মীরা অংশ নেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *