আলী হায়দার চৌধুরী
সৃষ্টি ও ধ্বংসের লীলা অহরহ চলছে। এ মূহুর্তে যা বাস্তব পর মুহুর্তে তা বিলীন। স্নেহময় ধরিত্রির স্নেহার্ত প্রকৃতি কোন বন্ধনই স্থায়ীত্ব লাভ করতে পারে না। তাই এই পৃথিবীতে শুধু দাবি জানানো চলে, দাবির বস্তুকে রক্ষা করা চলে না। জীবন যার আছে তাকে মরণের স্বাদ অবশ্যই নিতে হবে। এটা যদিও অত্যন্ত নির্মম বেদানাবহ, কিন্তু বাস্তব। তবে কাছের মানুষ যখন চলে যায় তখন কোন যুক্তিই কোন সান্তনা হয় না। যাদের ভাবনা নিয়ে জীবন চলা শুরু হয়েছে, যাদের শিক্ষা নিয়ে জীববোধ তৈরি হয়েছে, যাদের পরিশীলতার প্রখরতায় জীবনের ডানা মেলতে শুরুকরেছে- তারা যদি চলে যায় দৃষ্টির বাইরে, স্পর্শের বাইরে এই পৃথিবী ছেড়ে, কেন জানি মেনে নেয়া যায় না।
দূর নীলিমায় একটি পাখি, একাকী ডানা মেলে উড়ে বেড়ায়, হয়ত তার বুকে ব্যাথা আছে খুঁজে ফেরে হারানো কাউকে, দিগন্ত থেকে দিগন্তে। সে কি খুঁজে তার মাকে?
মা! মমতাময়ী, সিগ্ধমাখা অবয়ব। যার অস্তিত্বে মিশে আছে সন্তানের হাসিমাখা মুখ, নির্মল প্রশান্তি। যার আঁচলে লুকিয়ে স্নেহের পরশ, পৃথিবীর সমস্ত সুখ, ভালবাসা, নির্ণরতা আর নিরাপত্তা। স্রষ্টার অপূর্ব পূর্ণতা। যার কোন তুলনা হয় না। সব সন্তানের কাছে ‘মা’ শ্রেষ্ঠ। যার মা আছে সে পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ।
আমারও শ্রেষ্ঠ সম্পদ মা আজ আর নেই। হারিয়ে গেছে আকাশের দিগন্ত রেখায়। আমি তাকে খুঁজে ফিরি আমার অনুভবে, চেতনায়, কান্নার নোনাজলে। চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে করে- মা তুমি কোথায়, চলে এসো, তোমার মমতাময়ী স্পর্শে ভরিয়ে দাও, শক্তি যোগাও, সাহস যোগাও।
আমার মায়ের নাম নুরজাহান। আলোকিত করেছিলেন আমাদের জীবন। আলোকজ্জল হয়েছিল আমাদের সংসার। বিশেষতঃ আমাদের পিতৃহীন বাল্যকালে তিনি ছিলেন আলোকবর্তিকা হাতে। সন্দ্বীপে জন্ম ও বেড়ে উঠা মেয়েটির প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছিল খুব সামান্য কিন্তু তিনি ছিলেন স্বশিক্ষিত। পারিবারিক পাঠাগার ও কাঠগড় স্কুলের পাঠাগারের সব বই ছিল তাঁর পড়া। গোর্কির ‘মা’ গ্রন্থটি ছিল তাঁর প্রিয় গ্রন্থ। তাইতো ছোট ছেলেটির নাম রাখলেন ‘পাভেল’। বীরপ্রসু সন্দ্বীপের খ্যাতিমান ব্যক্তিদের জীবন কথা আমরা জানি। কিন্তু আমরা কি জানি সেসব সংগ্রামী মায়ের কথা? যারা জীবন ঘষে ঘষে সন্তানের জীবন উত্তাপ ছড়ায় আমৃত্যু। ছোটকালে বাবাকে হারিয়েছি। তখন আমার বয়স ছিল মাত্র ৫ বছর। বাবার কথা আমার মনে নেই। বুঝে উঠার পর থেকে মায়ের আদর-যত্ন, লালন-পালন, আদর্শে বড় হয়েছি। মা ছিলেন দৃড়চেতা, তেজস্বী মহিলা। আমার বাবা গিয়াস উদ্দিন চৌধুরী ছিলেন সন্দ্বীপের কাটগড়ের জমিদার আলী মিয়া চৌধুরীর জেষ্ঠ্য সন্তান। পারিবারিক ঐতিহ্যে বেড়ে উঠা আমার বাবা সামাজিক কর্মকান্ডের সাথে নিবিড়ভাবে জড়িত ছিলেন। ইন্তেকাল করেছেন ১৯৫৮ সালে।
আমার স্কুল জীবন কেটেছে আমাদেরই প্রতিষ্ঠিত কাটগড় গেলাম নবী হাই স্কুলে। বাড়ির সামনে স্কুল মাঠ, বাজার। লেখাপড়ার ফাঁকে ফাঁকে চলত খেলাধুলা, দুরন্তপনা। স্কুলের স্যারদের বেত্রাঘাতের কথা মনে পড়লে আজো শিহরিত হই। দুরন্তপনার কারণে মায়ের বকুনী খেতাম। মা স্যারদের বাসায় ডেকে এনে বলতেন আমাকে কঠোর অনুশাসনে রাখতে। আমাদের পারিবারিক পরিবেশ ছিল সাংস্কৃতিক আবহে পরিমন্ডিত। মা-চাচীদের দেখতাম প্রায়ই উপন্যাস, গল্পের বইয়ে ডুবে থাকতে। নারী শিক্ষায় সন্দ্বীপের মধ্যে আমাদের বাড়ি ছিল অগ্রগামী। আমার আপা, চাচাতো বোনেরা যখন কলেজ ছুটিতে বাড়িতে আসত তখন পুরো বাড়ি হয়ে উঠতো উৎসবমুখর। প্রতি বছর বাড়ির ভেতরে পারিবারিক সদস্যদের নিয়ে মঞ্চস্থ হতো নাটক ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। দায়িত্ব পড়তো আমার চাচাতো বোন সেলিনা চৌধুরী, শিরিনা চৌধুরী এবং আমার বোন পারভীন চৌধুরীর উপর। আর এর সার্বিক কর্মকান্ডের মধ্যমনি থাকতাম আমি। আমাকে সবাই অত্যাধিক আদর করতো । মা ঠিক করতেন মঞ্চে আমি কি উপস্থাপন করবো।
১৯৬৭ সালে আমি নবম শ্রেণীর ছাত্র। স্কুলের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে জি.এস. পদে নির্বাচন করছি। সহপাঠিদের নিয়ে আমাদের বাড়িতে নির্বাচনী পরিকল্পনা করা হচ্ছিল। আম্মা দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে সব দেখছিলেন। তিনি বলতে থাকলেন পড়াশুনার বালাই নেই আবার নির্বাচন। রেগে তেড়ে আসলেন আমার দিকে। আমি কোন কিছু নাই বুঝেই ভয়ে দিলাম দৌড়। রাতে বাড়ি ফিরে মাকে বললাম ‘মা আমার নির্বাচন শ্যাষ’। তিনি হেসে ফেললেন।
আমি তখন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের শাখার সাধারণ সম্পাদক এবং সন্দ্বীপ থানার কার্যনির্বাহী সদস্য। স্কুলের তৎকালীন প্রধান শিক্ষক মরহুম মজিবুল হক (এম. এ.) এবং আমার চাচাতো ভাই মরহুম দবীর উদ্দিন চৌধুরীর রাজনৈতিক আদর্শে আমি প্রভাবিত হয়েছিলাম। ১৯৬৮ সালে বাংলাদেশের রাজপথ উত্তপ্ত। আমি মিটিং-মিছিল আর সংগঠন নিয়ে ব্যস্ত। মাকে দেখতাম অনেকের সাথে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট নিয়ে আলোচনা করতে। রাজনৈতিক পরিবারের মায়ের জন্ম ও বেড়ে উঠা। আমার নানা মৌলভী জিয়াউল হক ছিলেন রাজনৈতিক সচেতন ব্যক্তি। আমার মামা এল.এল.বি. দৌজা তখনকার রাজনৈতিক অঙ্গনে এক পরিচিত নাম। অনেক বিখ্যাত ব্যক্তিেেক দেখেছি মামাসহ আমাদের বাড়ির সামনে মিটিং করতে। ১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধুর ডাকে যখন স্বাধীনতা শুরু হল, তখন আমার চেতনায় জন্মে স্বাধীনতার উন্মাদনা। মা বুঝতে পেরেছিলেন। অবশেষে জুন মাসের কোন এক সময় আমি পাড়ি দিলাম ভারতের উদ্দেশ্যে। মাকে লিখলাম ছোট্ট একটি চিরকুট। ‘মা আমি চলে গেলাম ভারতের উদ্দেশ্যে, বেঁচে থাকলে ফিরে আসবো’। মা স্তব্দ হয়ে গেলেন। আমর ফেরা না ফেরার অনিশ্চয়তায় মাকে চিন্তিত করেছিল, হয়তোবা কারণ আমার ছোট ভাই ‘পাভেল’। ৫ম শ্রেণীতে পড়াবস্থায় মারা যায়। সন্তান হারানোর বেদনায় মা আমাকে ছাড়তে চাচ্ছিল না। কারণ আমি ছিলাম মায়ের সবেধন নীলমনি। ট্রেনিং শেষে সন্দ্বীপ এসে ফুফুর বাড়িতে মায়ের সাথে দেখা করি। সম্ভবত আগষ্ট মাস। প্রচন্ড বৃষ্টি। মা আমাকে জড়িয়ে ধরলেন। আবেগে তিনি কাঁপছিলেন। কাঁদছিলেন কিনা বুঝতে পারলাম না। অনুভব করলাম মমতার দীর্ঘশ্বাস।
এরপর মাকে দেখলাম অন্যরূপে। সন্দ্বীপে মুক্তিযুদ্ধের স্মরণীয় ঘটনা থানা আক্রমণ। সেদিন সকল যোদ্ধারা আমাদের বাড়িতে খাওয়া-দাওয়া করে রণসাজে যখন তৈরী হয়। মা আমাদের মাথায় হাত রেখে আশীর্বাদ করলেন। দেখলাম তাঁর চোখে জল, মুখে বিজয়ী প্রত্যয়। বিদায় বেলায় আমি আমার মায়ের এই বিচিত্র গুণ প্রত্যক্ষ করলাম। অভিভূত হয়ে তাকিয়ে রইলাম। দেখলাম মাতৃত্বের অতুলনীয় এক প্রতিচ্ছবি।
স্বাধীনতার পর কর্ম নিয়ে বিদেশ পাড়ি জমাই। প্রবাস থেকে ফিরে এসে আমি বিয়ে করি। আমার স্ত্রীকে কখনও আমি আমার কর্মস্থলে নিয়ে যাওয়ার চিন্ত করিনি। এর কারণ ছিল মা’কে দেখাশুনা করার মতো তেমন কেউ ছিলনা। তিনি শোক-দুঃখের সাথে যুদ্ধ করতে করতে অনেকটা পরিশ্রান্ত, অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। রক্তচাপ এবং ডায়বেটিস এ আক্রান্ত। আমরা চট্টগ্রামে বাসা নিয়ে থাকতাম। ১৯৮৮ সালে আমি দেশে আসলাম। সকাল বেলায় বারান্দায় বসে আছি। মা আমার পাশে এসে বসলেন, হঠাৎ করে আমার হাত টেনে তাঁর মাথার উপর রাখলেন। বললেন তুমি আমার মাথা ছুয়ে ওয়াদা কর আমার একটা কথা রাখবে? আমি বললাম অবশ্যই রাখবো। মা বললেন বউমাকে বিদেশ নিয়ে যাও। আমি বললাম এটা কি সম্ভব? মা বললেন বাবা আমার জীবন প্রায়ই শেষ। বিদায়ের প্রহর গুনছি। আমি মা, আমি নারী। ওদের যন্ত্রণা, ওদের সুখ কোথায় তা আমি জানি। যত দ্রুত সম্ভব ওদেরকে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা কর।আমি অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলাম। যে জীবনের প্রায়ই দিলেন সংসার, সন্তানদের জন্য। জীবন সায়াহ্নের এই বেলায়ও এর ব্যতিক্রম করলেন না।
আজ আমি সন্তানের বাবা। জীবন প্রান্তের এককোণে দাঁড়িয়ে আমি আঁৎকে উঠি। আমার সন্তানের জন্যে আমার স্ত্রীর ত্যাগ, তীতিক্ষা দেখে মানসপটে ভেসে উঠে আমার মায়ের মধুমাখা মুখখানি। কতনা কষ্ট ভোগ করেছেন আমার জন্যে। অকাতরে কষ্ট ভোগ করেছেন দিনের পরে দিন, রাতের পরে রাত। যখন ভাবি দু’চোখের কোনে জলে ভরে উঠে। কখনো কখনো রাত যত গভীর হতে থাকে, ততই মায়ের স্মৃতি আমার চেতনায় ফুটে উঠে। ‘মা’ হারানোর কাতরতায় অস্থির হয়ে বিছানা ছেড়ে ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে থাকি আকাশের দিকে চেয়ে। মনে মনে বলি, মা তোমাকে মনে পড়ে, এসো মা, স্নেহের পরশ বুলিয়ে দাও। তোমার স্নেহ মাখা ডাক আজও আমি শুনতে পাই। আজও আমি কান পেতে রই, আমার আপন হৃদয়ে গহিন দ্বারে কান পেতে রই।
আমার মা নূরজাহান বেগম পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন ১৯৯৬ সালে ৮-ই জুলাই, লেখাটি তার-ই স্বরণে বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। আমার সুভার্থীদের কাছে আমার মায়ের জন্য দোয়া চাই)।
লেখক-বীর মুক্তিযোদ্ধা।







