কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে চালু হচ্ছে বন্ধ শিল্পকারখানা

জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির অন্যতম নির্বাচনী ইশতেহার ছিল দেড় বছরে এক কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা। সেই ইশতেহার বাস্তবায়নের ধারাবাহিকতায় বন্ধ কারখানা চালুর উদ্যোগ নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ইতোমধ্যে তিনি এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। কোন কারখানাগুলো দ্রুত চালু করা যায়, সেগুলোর তালিকা তৈরির নির্দেশ দিয়েছেন। ফলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, উৎপাদন বৃদ্ধি এবং বিনিয়োগ পরিবেশ পুনরুদ্ধারের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক থাকায় বন্ধ কারখানা চালু শুধু অর্থনৈতিক পদক্ষেপ নয়, বরং সরকারের কৌশলগত জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। পাশাপাশি অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য ইস্যুতেও পরিণত হয়েছে।

সূত্র জানিয়েছে, বাংলাদেশে গত এক বছরে সাভার, গাজীপুর, চট্টগ্রাম ও নারায়ণগঞ্জসহ প্রধান শিল্পাঞ্চলগুলোতে তিন শতাধিক কারখানা বন্ধ হয়েছে। এর মধ্যে শুধুমাত্র পোশাক শিল্প ও টেক্সটাইল খাতেই অধিকাংশ কারখানা বন্ধ হওয়ায় প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার শ্রমিক কাজ হারিয়েছেন। মূলত আর্থিক সংকট, ঋণের উচ্চ সুদ, গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট এবং শ্রমিক অসন্তোষের কারণে কারখানাগুলো বন্ধ হয়েছে।

সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী প্রথম ১৮ মাসে এককোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য পূরণে বন্ধ কারখানা চালুর উদ্যোগকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। শুধু তহবিল সহায়তা নয়, কারখানাগুলো কীভাবে দ্রুত উৎপাদনে ফিরিয়ে আনা যায়— সেই লক্ষ্যে নীতি সহায়তার বিষয়গুলোও বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ইতোমধ্যে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের বন্ধ থাকা কারখানাগুলো চালু ও নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। তিনি সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) মাধ্যমে কোন কারখানাগুলো দ্রুত চালু করা যায়, সেগুলোর তালিকা তৈরির নির্দেশনা দিয়েছেন।

আরও পড়ুন:  নির্বাচনে সাংবাদিক ও পর্যবেক্ষকদের কার্ড পেতে আবেদন অনলাইনে

ওই নির্দেশনার পর কারখানাগুলো চালু করতে ৪০ হাজার কোটি টাকার একটি বিশাল পুনঃঅর্থায়ন (রিফাইন্যান্স) স্কিম চালুর উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। প্রস্তাবিত প্যাকেজের আওতায়– বড় শিল্প খাতে ২০ হাজার কোটি টাকা; কুটির, অতিক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের (সিএমএসএমই) জন্য ১০ হাজার কোটি টাকা এবং কৃষি খাতে ১০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হবে।

জানা গেছে, তহবিল গঠনের আগে ব্যাংকগুলোর কাছে বন্ধ কারখানার তালিকা ও তাদের ঋণের হালনাগাদ তথ্য চাওয়া হয়েছে। ১০০ কোটি টাকার বেশি ঋণ রয়েছে, শুধু এসব কারখানার তালিকা চাওয়া হয়েছে। এর মধ্যে সম্পূর্ণ বন্ধ ও আংশিক বন্ধের তালিকা আলাদাভাবে চাওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর ড. মো. কবির আহাম্মদের নেতৃত্বে গঠিত ১৯ সদস্যের কমিটি এ বিষয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন প্রস্তুত করছে। কমিটিতে নির্বাহী পরিচালক থেকে শুরু করে বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা রয়েছেন। ইতোমধ্যে ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করে তাদের মতামতও নেওয়া হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, সরকার বন্ধ হয়ে যাওয়া কলকারখানা চালুর জন্য নীতিগত সুবিধা দিতে চাচ্ছে। এটি ইতিবাচক উদ্যোগ; এর ফলে নতুন করে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে পারে। তবে এ কারখানাগুলোর জন্য অর্থ কোথা থেকে আসবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

তিনি বলেন, বর্তমানে দুই ডজনের বেশি ব্যাংক তারল্য সংকটে রয়েছে, অনেক ব্যাংকের মূলধনও নেতিবাচক অবস্থায়। অন্যদিকে সরকারের রাজস্ব আদায়ও আশানুরূপ বাড়ছে না। কারণ, বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কম থাকায় উৎপাদনও কমে গেছে। এর ফলে রাজস্ব সংগ্রহেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। এখন কেন্দ্রীয় ব্যাংক যদি রিফাইন্যান্স স্কিমের আওতায় এসব প্রতিষ্ঠানকে অর্থায়ন করে, তাহলে তা মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ তৈরি করতে পারে। কারণ, বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে অর্থ সরবরাহ করা হলে বাজারে টাকার প্রবাহ বেড়ে যাবে। তিনি সরকারকে দুটি পরামর্শ দিয়ে বলেন, প্রথমত, যেসব ব্যাংকের তারল্য পরিস্থিতি ভালো, সেখান থেকে আংশিকভাবে ফান্ড সংগ্রহ করা যেতে পারে। দ্বিতীয়ত, আসন্ন জাতীয় বাজেট থেকে একটি অংশ এই খাতে বরাদ্দ দেওয়া যেতে পারে। পাশাপাশি তিনি ধাপে ধাপে এই স্কিম বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

আরও পড়ুন:  নির্বাচনের পরিবেশ তৈরিতে অপারেশন শুরু করবে যৌথ বাহিনী: ইসি সানাউল্লাহ

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, ব্যাংকগুলো থেকে তালিকা সংগ্রহ করা হচ্ছে। বন্ধ কারখানা চালু করতে কী ধরনের সুবিধা দেওয়া যায়, তা নিয়ে সরকারের সঙ্গে আলোচনা চলছে। আলোচনা চূড়ান্ত হওয়ার পর তহবিল গঠন ও নীতিমালা জারি করা হবে। এখন মূল্যস্ফীতি বেশি, তাই সরকারি অর্থে তহবিলটি গঠন হতে পারে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা জানান, সহজ শর্তে ঋণ নিয়মিত করে কারখানার কাঁচামাল কিনতে অর্থায়নসুবিধা দিতে হবে। এ জন্য ঋণপত্র খোলার সুবিধা দেওয়া হবে। তবে অর্থ পাচার ও বিভিন্ন অনিয়মে জড়িত থাকা প্রতিষ্ঠানগুলো এই সুযোগ পাবে না। নতুন করে যাতে কোনো অনিয়ম–দুর্নীতি না হয়, সেদিকেও বাড়তি নজর রাখা হবে।

আরও পড়ুন:  ১৫ দিনে রেমিট্যান্স এলো ১১ হাজার ১৫৮ কোটি টাকা

ব্যবসায়ী ও শিল্প উদ্যোক্তারা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তারা বন্ধ কারখানা পুনরায় চালুর ক্ষেত্রে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব দিয়েছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য— ঋণ পুনঃতফসিলের ক্ষেত্রে ডাউন পেমেন্টের শর্ত শিথিল করা। কারখানা চালুর সঙ্গে সঙ্গে দ্রুত অর্থায়ন নিশ্চিত করা। আমদানি-রফতানি কার্যক্রম সহজ করতে ব্যাংকিং সুবিধা বৃদ্ধি। কম মার্জিনে এলসি খোলার সুযোগ দেওয়া।

বিজিএমইএ’র সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, বন্ধ কারখানা পুনরায় চালুর সিদ্ধান্ত ইতিবাচক। এসব কারখানা আগে থেকেই চালু থাকলে অর্থনীতিতে আরও গতি সঞ্চার হতো, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পেত এবং জিডিপিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়ত।

তিনি আরও বলেন, বন্ধ কারখানা পুনরায় চালু করলে দ্বিমুখী সুবিধা পাওয়া সম্ভব। প্রথমত, খুব অল্প সময়ের মধ্যেই উৎপাদনে ফেরা যায়। দ্বিতীয়ত, তুলনামূলক কম ব্যয়ে এসব কারখানা সচল করা সম্ভব। এর বিপরীতে নতুন কারখানা স্থাপনের ক্ষেত্রে জায়গা নির্বাচন, উচ্চ ব্যয় এবং উৎপাদনে যেতে দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন হয়।

মহিউদ্দিন রুবেলের ভাষায়, সরকার যদি কার্যকরভাবে এই উদ্যোগ বাস্তবায়ন করতে পারে, তাহলে অর্থনীতিতে স্থবির হয়ে থাকা অর্থ পুনরায় গতিশীল হবে এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *