হার্ট অ্যাটাকের পর ৪০ ঘণ্টা বন্ধ হৃৎস্পন্দন, ‘অলৌকিকভাবে’ বেঁচে ফিরলেন চীনা ব্যক্তি

চীনে এক আশ্চর্যজনক ঘটনা ঘটেছে। দেশটির ঝেজিয়াংয়ে এক ব্যক্তির হার্ট অ্যাটাক হয় এবং এরপর তাঁর হৃৎস্পন্দন বন্ধ ছিল প্রায় ৪০ ঘণ্টা। কিন্তু তারপরও তিনি আশ্চর্যজনকভাবে বেঁচে ফিরেছেন। এই ঘটনাটি নতুন জীবন রক্ষাকারী চিকিৎসা প্রযুক্তি নিয়ে অনলাইনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

হংকং থেকে প্রকাশিত ইংরেজি দৈনিক সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টের খবরে বলা হয়েছে, চিকিৎসক লু শিয়াও নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘটনাটি প্রকাশ করেন। তাঁর অনুসারীর সংখ্যা প্রায় তিন মিলিয়ন। তিনি ঝেজিয়াং ইউনিভার্সিটি স্কুল অব মেডিসিনের দ্বিতীয় অ্যাফিলিয়েটেড হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক।

লু জানান, ৪০ বছর বয়সী ওই ব্যক্তির কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট বা হার্ট অ্যাটাক হয় এবং একাধিকবার ইলেকট্রিক ডিফিব্রিলেশন দেওয়ার পরও তাঁর কোনো হৃৎস্পন্দন পাওয়া যায়নি। পরে চিকিৎসক দল ওই ব্যক্তির শরীরে এক্সট্রাকর্পোরিয়াল মেমব্রেন অক্সিজেনেশন (ইসিএমও) প্রয়োগ করে এবং প্রায় দুই দিন হৃদ্যন্ত্র বন্ধ থাকার পরও তাঁকে বাঁচাতে সক্ষম হয়।

ইসিএমওএকটি জীবন রক্ষাকারী মেশিন। এটি বাইরে থেকেই কৃত্রিম হৃদ্যন্ত্র ও ফুসফুসের মতো কাজ করে। এটি রক্তে অক্সিজেন জোগায় এবং কার্বন ডাই-অক্সাইড অপসারণ করে। যেসব রোগীর অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বিকল হয়ে গেছে তাদের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়। এই মেশিন সাধারণত হার্ট অ্যাটাকের রোগী এবং হার্ট ও ফুসফুস প্রতিস্থাপন অস্ত্রোপচারের সময় সাময়িক সহায়তা হিসেবে ব্যবহার করা হয়।

আরও পড়ুন:  ১৬৬ উপজেলায় নতুন ইউএনও

এর আগেও বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই মেশিনের সাহায্যে কার্ডিয়াক অ্যারেস্টের পর কয়েক ঘণ্টা পরও রোগীদের উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। গত বছর চীনের মধ্যাঞ্চল হুবেই প্রদেশে ৫৩ বছর বয়সী এক নারীকে তাঁর হৃদ্যন্ত্র থেমে যাওয়ার পাঁচ ঘণ্টা পর ইসিএমও ব্যবহারের মাধ্যমে জীবিত ফিরিয়ে আনা হয়।

তারও আগে, ২০২২ সালে পূর্ব চীনের জিয়াংসু প্রদেশের ইয়ানচেং ১ নম্বর পিপলস হাসপাতাল জানায়, তারা ৩৬ বছর বয়সী এক নারীকে ইসিএমও মেশিনের সাহায্যে বাঁচাতে সক্ষম হয়, যার হৃদ্যন্ত্র ৯৬ ঘণ্টা বন্ধ ছিল। হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, এই মেশিন প্রচলিত সিপিআর-এর মাধ্যমে কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট রোগীর বেঁচে থাকার হার ১ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত নিয়ে যেতে পারে। তবে ইসিএমও চিকিৎসা দীর্ঘায়িত করলে কিছু ঝুঁকিও থাকে।

আরও পড়ুন:  এপ্রিলের দাবদাহে তাপমাত্রা ছাড়াবে ৪২ ডিগ্রি, সঙ্গে ঘূর্ণিঝড়ের শঙ্কা

চিকিৎসক লু জানান, ৪০ বছর বয়সী ওই রোগীর ক্ষেত্রে রক্ত জমাট বাঁধা ঠেকাতে এবং তা প্রাণঘাতী হয়ে ওঠা এড়াতে তাঁদের বিশেষ ব্যবস্থা নিতে হয়েছিল। এ ছাড়া চিকিৎসক দলকে রক্ত জমাট বাঁধা ও অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ—এই দুই বিপজ্জনক জটিলতার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে হয়। ইসিএমও ব্যবহারের সময় সাধারণ একটি ঝুঁকি।

এর জন্য রোগীর অবস্থা সারাক্ষণ পর্যবেক্ষণ করতে হয় এবং চিকিৎসা দলের উচ্চ দক্ষতা থাকা প্রয়োজন। রোগীর হৃৎস্পন্দন ফিরে আসার পরও তিনি প্রায় ১০ দিন ইসিএমও–এর সহায়তায় ছিলেন। লু জানান, প্রায় ২০ দিনের মধ্যে তিনি প্রায় সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ওঠেন, নিজে হেঁটে হাসপাতাল ছাড়েন এবং কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি। সাধারণত এই ধরনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার মধ্যে স্ট্রোক, কিডনি বিকল হওয়া এবং মানসিক সমস্যা যেমন উদ্বেগ ও বিষণ্নতা থাকতে পারে।

লু এই ঘটনাকে ‘এক অলৌকিক ঘটনা’ বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ‘রোগী ভাগ্যবান। প্রতিটি সফল চিকিৎসা চিকিৎসা বিজ্ঞানের অগ্রগতি, চিকিৎসাকর্মীদের দৃঢ়তা এবং ভাগ্যের সমন্বয়।’

আরও পড়ুন:  বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য ভিসা প্রক্রিয়া কঠোর করল অস্ট্রেলিয়া

ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি করে। একজন মন্তব্য করেন, ‘লোকটি খুবই ভাগ্যবান যে তিনি সময়মতো চিকিৎসা পেয়েছেন, না হলে ইসিএমও-ও তাঁকে বাঁচাতে পারত না।’ আরেকজন বলেন, ওই ব্যক্তির পরিবারের প্রতি কৃতজ্ঞ থাকা উচিত, কারণ চিকিৎসার খরচ বহন করা হয়েছে।

চীনে ইসিএমও মেশিন চালু করতে আনুমানিক ৫০ হাজার ইউয়ান (প্রায় ৭ হাজার মার্কিন ডলার) খরচ হয় এবং এরপর প্রতিদিন ১০ হাজার ইউয়ানের বেশি খরচ হয়। সাধারণত এই খরচ সামাজিক বিমার আওতায় পড়ে না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *