গণমাধ্যম বিশেষজ্ঞদের পরামর্শে গঠিত হবে মিডিয়া কমিশন: তথ্যমন্ত্রী

গণমাধ্যম খাতে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও সুস্থ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে গণমাধ্যম বিশেষজ্ঞদের পরামর্শের ভিত্তিতে একটি গ্রহণযোগ্য গণমাধ্যম কমিশন গঠন করা হবে বলে জানিয়েছেন তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন।

আজ রোববার (৩ মে) দুপুরে রাজধানীর শান্তিনগরের সার্কিট হাউস রোডে চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তর মিলনায়তনে বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস উপলক্ষে ‘জবাবদিহির সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠার প্রধান সহযোগী স্বাধীন ও দায়িত্বশীল গণমাধ্যম’ শীর্ষক আলোচনা সভায় তথ্যমন্ত্রী এসব কথা বলেন।

তথ্যমন্ত্রী জানান, প্রথম ধাপে গ্রহণযোগ্য গণমাধ্যম বিশেষজ্ঞদের সামনে রেখে সংশ্লিষ্ট সব অংশীজনের সমন্বয়ে একটি পরামর্শ কমিটি গঠন করা হবে। এই কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতেই পরে একটি পূর্ণাঙ্গ গণমাধ্যম কমিশন গঠন করা হবে।

জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, ‘গণমাধ্যমে একটি হেলদি রেগুলেশন দরকার। তবে রেগুলেশন মানেই নিয়ন্ত্রণ নয়; বরং এটি একটি সহায়ক ও কাঠামোগত ব্যবস্থা।’ এ ক্ষেত্রে যুক্তরাজ্যের অফকম এবং যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল কমিউনিকেশন কমিশনের উদাহরণ তুলে ধরেন তিনি।

তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী বলেন, সরকারের ভূমিকা হওয়া উচিত সহায়ক ও ফ্যাসিলিটেটরের, নিয়ন্ত্রকের নয়। সরকার গণমাধ্যমকে আইনি, প্রাতিষ্ঠানিক ও প্রয়োজনে আর্থিক সহায়তা দিতে পারে, যাতে গণমাধ্যম তার কাজ স্বাধীন ও স্বাভাবিকভাবে পরিচালনা করতে পারে।

পত্রিকার প্রকৃত ছাপার সংখ্যা নির্ধারণে নির্ভরযোগ্য মানদণ্ডের অভাব এবং টেলিভিশনের দর্শকসংখ্যা (টিআরপি) পরিমাপের সীমাবদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে সম্প্রচারমন্ত্রী বলেন, ডেটাবিহীন কোনো তথ্যই প্রকৃত তথ্য নয়; তা কেবল মতামত মাত্র। কোটি কোটি টেলিভিশন দর্শকের দেশে মাত্র কয়েক শ ডিভাইসের মাধ্যমে টিআরপি নির্ধারণ বাস্তবতার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। একইভাবে পত্রিকার সার্কুলেশন নিয়েও স্বচ্ছতার ঘাটতি রয়েছে বলে জানান তিনি।

আরও পড়ুন:  এই কষ্ট সাময়িক, দুর্দিন চলে যাবে: কাদের

তথ্যমন্ত্রী আরও বলেন, ‘সত্য তথ্য প্রতিষ্ঠার জন্য নির্ভরযোগ্য ডেটা অপরিহার্য। ডেটা ছাড়া কোনো তথ্য নয়, আর ফ্যাক্ট ছাড়া কোনো খবর নয়।’

সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে এ বিষয়ে স্বচ্ছ অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। মূল কমিশন গঠনের আগপর্যন্ত জরুরি সমস্যাগুলোর অন্তর্বর্তী সমাধান বের করারও প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন তথ্যমন্ত্রী।

অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব শাহ আলম। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক ড. এস এম শামীম রেজা।

মূল প্রবন্ধে শামীম রেজা বলেন, ‘মুক্ত সাংবাদিকতার যে প্রতিকূলতা তা সম্পূর্ণভাবে অপসারণ করা যায়নি। আমাদের এই মুহূর্তে একটি নিজস্ব ব্যবস্থার অভাব আছে। রাজনৈতিক সংস্কৃতি নির্মাণে ব্যর্থতা স্বাধীন সাংবাদিকতা বিকাশে অন্তরায়। সংবাদমাধ্যম ও সাংবাদিকের দায়িত্বশীলতা একে অপরের ওপর নির্ভরশীল। জবাবদিহি ও স্বচ্ছতার স্বার্থে বিএনপি তাদের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করবে বলে আশা করি।’

ঢাবির গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক আরও বলেন, ডিজিটাল কনটেন্ট, প্ল্যাটফর্মের অতি বাণিজ্যিকীকরণ এবং অ্যালগরিদমের উপস্থিতি সংকট বাড়াচ্ছে। ভুয়া ও অপতথ্য মোকাবিলা বিশ্বব্যাপী সমস্যা। এ বিষয়ে সরকারের দায়িত্ব হবে নাগরিকদের ডিজিটাল স্বাক্ষরতা নিশ্চিত করা। দায়িত্বশীল গণমাধ্যমকে পাঠকের রুচি তৈরিতেও ভূমিকা রাখতে হবে।

আরও পড়ুন:  ড. ইউনূস শ্রমিকের পাওনা বুঝিয়ে দেননি, ঘুষেও রফা হয়নি: তথ্যমন্ত্রী

ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রধান বার্তা সম্পাদক মোস্তফা আকমল বলেন, টেলিভিশন সাংবাদিকতাকে এখনো শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করানো যায়নি। এখানে ওয়েজ বোর্ডসহ অনেক বিষয়ই অনুপস্থিত। টেলিভিশন সাংবাদিকতার পূর্ণাঙ্গ সংস্কার জরুরি বলে তিনি মনে করেন।

দৈনিক বণিক বার্তার সম্পাদক ও সম্পাদক পরিষদের সাধারণ সম্পাদক দেওয়ান হানিফ মাহমুদ বলেন, স্বাধীনতার পর রাষ্ট্রীয় ও বেসরকারি কোনো প্রতিষ্ঠানই জবাবদিহির মধ্য দিয়ে সুপ্রতিষ্ঠিত করা যায়নি। শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া হলেও আমাদের রাষ্ট্রীয় ইকোসিস্টেমে তা দুর্বল রয়ে গেছে। সামগ্রিক ব্যবস্থায় পচন ধরেছে, যেখান থেকে গণমাধ্যমও মুক্ত নয়। এই অবস্থায় রাষ্ট্রকে সংবেদনশীলতার সঙ্গে গণমাধ্যমকে এগিয়ে নিতে হবে বলে তিনি মত দেন।

বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন (বিএফইউজে) এর মহাসচিব কাদের গণি চৌধুরী বলেন, সংবাদমাধ্যম যেমন দেশ ও জাতিকে এগিয়ে নিতে পারে, তেমনি ধ্বংসও করতে পারে। তাই দায়িত্বশীল ভূমিকা অপরিহার্য। বর্তমানে দু-একটি বাদ দিলে অধিকাংশ গণমাধ্যমই শক্ত প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে উঠতে পারেনি। ভুয়া সাংবাদিক ও গণমাধ্যমের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং প্রকৃত সাংবাদিকদের তালিকা প্রণয়নের আহ্বান জানান তিনি।

অ্যাটকোর মহাসচিব ও একুশে টেলিভিশনের চেয়ারম্যান আব্দুস সালাম বলেন, মুক্ত গণমাধ্যমে বিশ্বাসের কারণে গত ১৭ বছরে তাঁকে নানা নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে। অতীতে নির্যাতিতদের একটি পূর্ণাঙ্গ ডকুমেন্টেশন জরুরি বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

আরও পড়ুন:  টিয়ারশেল-সাউন্ড গ্রেনেডে জবি শিক্ষার্থীদের ছত্রভঙ্গের চেষ্টা

নোয়াব সভাপতি ও দৈনিক মানবজমিনের প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী বলেন, অনুগত সাংবাদিকতা সরকারকে কখনোই সহায়তা করে না। রাজনীতি সঠিক না হলে সাংবাদিকতাও সঠিক পথে এগোয় না। দেশ বিভক্ত অবস্থায় থাকলে সাংবাদিকতার উন্নয়ন সম্ভব নয়। তিনি সতর্ক করে বলেন, এখনই ব্যবস্থা না নিলে সামনে বড় সংকট তৈরি হতে পারে। ভারতের ‘গদি সাংবাদিকতা’ উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, বাংলাদেশেও এমন অনুগত সাংবাদিকতা তৈরি করা উচিত নয়।

বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিলের চেয়ারম্যান বিচারপতি এ কে এম আব্দুল হাকিম বলেন, তিনি ৪০টির বেশি জেলা-উপজেলায় ঘুরে সাংবাদিক ও মালিকদের সঙ্গে আলোচনা করেছেন। শহরকেন্দ্রিক আলোচনার তুলনায় আঞ্চলিক সাংবাদিকতা উপেক্ষিত থাকে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

আব্দুল হাকিম আরও বলেন, পেশাজীবীদের অধিকারের জন্য দেশে অনেক আইন রয়েছে, তবে অধিকারের পাশাপাশি কর্তব্যের বিষয়টিও গুরুত্ব দিতে হবে। সাংবাদিকদের নিবন্ধন ও তালিকাভুক্তি জরুরি উল্লেখ করে তিনি বলেন, আইন প্রণয়নই যথেষ্ট নয়, এর কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *