হরমুজে নতুন অধ্যায় শুরু হচ্ছে: মোজতবা খামেনি

ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনি ঘোষণা করেছেন, হরমুজ প্রণালি ‘নতুন অধ্যায়’ শুরু হচ্ছে। ইরানের সর্বোচ্চ এই নেতা বলেন, সাম্প্রতিক যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলি আগ্রাসনের পর হরমুজ প্রণালিতে ইরান নতুন ব্যবস্থাপনা নীতি কার্যকর করবে। ইরানি রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম প্রেস টিভির প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা গেছে।

গতকাল বৃহস্পতিবার জাতীয় পারস্য উপসাগর দিবস উপলক্ষে দেওয়া এক লিখিত বার্তায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা এই মন্তব্য করেন। এর আগে, ১৬২২ সালে উপনিবেশিক শক্তিকে পরাজিত করে ইরানের দক্ষিণ উপকূল পুনরুদ্ধার করে ইরানিরা। প্রতিবছর ৩০ এপ্রিল ঐতিহাসিক বিজয় দিবস হিসেবে স্মরণ করে দেশটি।

এ বছর এই দিবসটি এসেছে এমন এক সময়, যার ঠিক দুই মাস আগে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল কোনো উসকানি ছাড়াই ইরানের ওপর সামরিক আগ্রাসন চালায়।

মোজতবা খামেনি পারস্য উপসাগরকে ‘অপরিবর্তনীয় এক নিয়ামত’ হিসেবে আখ্যা দেন। তিনি বলেন, এই জলভাগ এবং হরমুজ প্রণালি শুধু ভৌগোলিক সংযোগ নয়, এটি মুসলিম জাতিগুলোর পরিচয় ও সভ্যতার এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। পাশাপাশি এটি বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ও অনন্য পথ তৈরি করেছে।

তাঁর ভাষায়, ‘এই কৌশলগত সম্পদ অতীতে বহু শয়তানি শক্তির লোভ জাগিয়েছে। ইউরোপীয় ও আমেরিকান আগ্রাসনের ইতিহাস, নিরাপত্তাহীনতা, ক্ষয়ক্ষতি এবং আঞ্চলিক দেশগুলোর বিরুদ্ধে অসংখ্য হুমকি—এসবই বিশ্ব উদ্ধত শক্তিগুলোর অশুভ ষড়যন্ত্রের সামান্য অংশ মাত্র। যার সর্বশেষ উদাহরণ হলো মহা শয়তানের সাম্প্রতিক দস্যুতামূলক আচরণ।’ এখানে তিনি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের আগ্রাসনের দিকেই ইঙ্গিত করেন।

আরও পড়ুন:  নির্বাচনের সম্ভাব্য সময় নিয়ে প্রতিক্রিয়া নেই আওয়ামী লীগের

পারস্য উপসাগরের দীর্ঘতম স্থল উপকূলের মালিক হিসেবে ইরানি জাতি স্বাধীনতার জন্য সবচেয়ে বড় ত্যাগ স্বীকার করেছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। পর্তুগিজদের বিতাড়ন থেকে শুরু করে হরমুজ প্রণালির মুক্তি, ডাচ উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম, ব্রিটিশ উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ—এসব ইতিহাস তুলে ধরেন তিনি। তিনি বলেন, ইসলামি বিপ্লব এই প্রতিরোধের ধারায় একটি মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া ঘটনা, যা ‘উদ্ধত শক্তিগুলোর হাত পারস্য উপসাগর অঞ্চল থেকে ছিন্ন করেছে।’

খামেনির ভাষায়, ‘আজ, বিশ্বের বুলিদের সবচেয়ে বড় সামরিক আগ্রাসনের দুই মাস পর এবং আমেরিকার অপমানজনক পরাজয়ের প্রেক্ষাপটে, পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালির জন্য নতুন অধ্যায় উন্মোচিত হচ্ছে।’

তিনি বলেন, গত ৬০ দিনে আঞ্চলিক দেশগুলো ইরানের নৌবাহিনীর ‘সতর্কতা’ প্রত্যক্ষ করেছে। খামেনি বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে যারা শাসকদের নীরবতা ও আত্মসমর্পণে অভ্যস্ত ছিল, তারা এখন নিজের চোখে দেখেছে সেনাবাহিনী ও আইআরজিসির নৌবাহিনীর সাহসিকতা, সতর্কতা এবং প্রচেষ্টা। একই সঙ্গে ইরানের দক্ষিণাঞ্চলের জনগণ ও তরুণদের উদ্দীপনা বিদেশি আধিপত্য প্রত্যাখ্যান করেছে।’

আরও পড়ুন:  হাত ট্রিগারেই আছে, প্রতিরক্ষা বাহিনীও সম্পূর্ণ প্রস্তুত: ইরান

তিনি আরও বলেন, সাম্প্রতিক যুদ্ধে প্রমাণ হয়েছে—শুধু বিশ্ব জনমত নয়, এমনকি আঞ্চলিক শাসকরাও বুঝতে পেরেছে যে পারস্য উপসাগর অঞ্চলে আমেরিকার উপস্থিতি এবং তাদের ঘাঁটি স্থাপনই সবচেয়ে বড় অস্থিতিশীলতার কারণ। তাঁর মতে, ‘আমেরিকার ফাঁপা ঘাঁটিগুলো নিজেদেরই নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে না, অন্যদের নিরাপত্তা দেওয়ার প্রশ্নই আসে না।’

মোজতবা খামেনি বলেন, পারস্য উপসাগরের ভবিষ্যৎ হবে উজ্জ্বল এবং যুক্তরাষ্ট্রবিহীন। তিনি বলেন, ‘এই অঞ্চলের ভবিষ্যৎ হবে এমন এক ভবিষ্যৎ, যা আমেরিকামুক্ত এবং এখানকার জনগণের অগ্রগতি, স্বাচ্ছন্দ্য ও সমৃদ্ধির জন্য নিবেদিত।’ তিনি যোগ করেন, ইরান ও পারস্য উপসাগর এবং ওমান সাগর তীরবর্তী দেশগুলোর ভাগ্য অভিন্ন।

তবে বিদেশিদের উদ্দেশে তাঁর বার্তা ছিল কড়া। তিনি বলেন, ‘যারা হাজার হাজার কিলোমিটার দূর থেকে এসে লোভের বশে এখানে অপরাধ চালায়, তাদের স্থান এই অঞ্চলে নয়—বরং এর পানির তলদেশে।’ তিনি বলেন, ‘এই বিজয়ের শৃঙ্খল, যা আল্লাহর কৃপায় প্রতিরোধ নীতি ও শক্তিশালী ইরান কৌশলের মাধ্যমে অর্জিত হয়েছে, তা নতুন আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক ব্যবস্থার অগ্রদূত হবে।’

তিনি বলেন, ইরানি জাতির এই ‘অলৌকিক জাগরণ’ শুধু কোটি মানুষের আত্মত্যাগে সীমাবদ্ধ নয়। বিদেশি আগ্রাসনের প্রেক্ষাপটে ইরানিরা নিজেদের জীবন উৎসর্গের অঙ্গীকার করে যে প্রচারণায় অংশ নিয়েছে, সেটির কথাও উল্লেখ করেন তিনি। তাঁর ভাষায়, দেশের ভেতরে ও বাইরে থাকা ৯ কোটি ইরানি তাদের জাতীয় সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করছে নিজেদের পরিচয়, আধ্যাত্মিকতা, মানবিকতা, বৈজ্ঞানিক ও শিল্প সক্ষমতা এবং আধুনিক প্রযুক্তি—ন্যানো থেকে বায়ো, পারমাণবিক থেকে ক্ষেপণাস্ত্র পর্যন্ত—এবং তারা এগুলোকে নিজেদের স্থল, নৌ ও আকাশসীমার মতোই রক্ষা করবে।

আরও পড়ুন:  ভারত-বাংলাদেশের একসময়ের মধুর সম্পর্ক এখন তেতো

মোজতবা খামেনি জোর দিয়ে বলেন, ‘ইরান হরমুজ প্রণালির ওপর নিজেদের ব্যবস্থাপনার নিয়ামতের প্রতি বাস্তব কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবে এবং এই জলপথে শত্রুর অপব্যবহার বন্ধ করবে।’ তিনি জানান, নতুন আইনি কাঠামো ও ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে হরমুজ প্রণালী পরিচালিত হবে। তাঁর ভাষায়, ‘এই নতুন ব্যবস্থাপনা অঞ্চলের সব দেশের জন্য স্বাচ্ছন্দ্য ও অগ্রগতি বয়ে আনবে, অর্থনৈতিক আশীর্বাদে জাতির হৃদয় ভরে উঠবে—আল্লাহর ইচ্ছায়, যদিও অবিশ্বাসীরা তা অপছন্দ করুক।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *