চীন সফর শেষ করেই মিত্র তাইওয়ানকে সতর্কবার্তা ট্রাম্পের

সদ্য চীন সফর শেষ করে এসেই স্বাধীনতাকামী ভূখণ্ড তাইওয়ানকে সতর্কবার্তা দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এমনকি গত বছরের শেষের দিকে তাইওয়ানের কাছে ১ হাজার ১০০ কোটি ডলারের যে অস্ত্র বিক্রির ঘোষণা দিয়েছিল ট্রাম্প প্রশাসন, তা ও পুনর্বিবেচনা করা হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।

গত বুধবার ৩ দিনের সরকারি সফরে বেইজিং সফরে গিয়েছিলেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। সফর শেষ করে শুক্রবার ওয়াশিংটন ফিরে মার্কিন টেলিভিশন চ্যানেল ফক্স নিউজকে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন তিনি। সেই সাক্ষাৎকারে সাম্প্রতিক চীন সফর এবং তাইওয়ানের স্বাধীনতার ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন করা হয়েছিল ট্রাম্পকে।

জবাবে ট্রাম্প বলেন, “আমি চাই না কেউ স্বাধীন হয়ে যাক। আমরা যুদ্ধ চাই না এবং বর্তমান (তাইওয়ান ইস্যুতে) পরিস্থিতি যেমন আছে— তেমনই যদি থাকে, তাহলে আমার মনে হয় চীনের কাছে এটি বড় কোনো সমস্যা হবে না।”

“কিন্তু আমরা কখনই চাই না যে কেউ বলুক—‘চলো আমরা স্বাধীনতা সংগ্রাম শুরু করি- কারণ যুক্তরাষ্ট্র আমাদের সমর্থন করছে।’ এটা কাম্য নয়।”

উল্লেখ্য, ১৯৪৯ সালে চীনা কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠাতা ও সাধারণ সম্পাদক মাও সে তুংয়ের নেতৃত্বাধীন বাহিনীর কাছে পরাজয়ের পর তৎকালীন চীনের প্রধানমন্ত্রী চিয়াং কাই-শেক এবং তার অনুগত কর্মকর্তারা বেইজিং ছেড়ে তাইওয়ান পালিয়ে যান। তখন থেকেই চীন তাইওয়ানকে নিজেদের ভূখণ্ডের ‘অবিচ্ছেদ্য অংশ’ হিসেবে দাবি করে আসছে।

আরও পড়ুন:  সৌদির কাছে এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান বিক্রি করবে যুক্তরাষ্ট্র

অন্যদিকে চীনের এই দাবি পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করে নিজেদের স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে দাবি করে আসছে তাইওয়ান। তবে বিশ্বের অধিকাংশ দেশ তাইওয়ানের এই দাবিকে স্বীকৃতি দেয়নি। এমনকি যুক্তরাষ্ট্র, যে দেশটি তাইওয়ানের স্বাধিকারের প্রশ্নে সবসময় সোচ্চার থাকে, তাইওয়ানের কাছে নিয়মিত সমরাস্ত্র বিক্রি করে— সেই যুক্তরাষ্ট্রও এখনও তাইওয়ানকে স্বীকৃতি দেয়নি।

তাইওয়ানের কাছে অস্ত্র বিক্রির জন্য পৃথক একটি আইন আছে যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানে। সেই আইন মেনেই স্বায়ত্বশাসিত এই দ্বীপ ভূখণ্ডকে অস্ত্র সরবারহ করে যুক্তরাষ্ট্র। তবে ওয়াশিংটন বরাবরই বলে আসছে যে যুক্তরাষ্ট্র এক-চীন নীতিতে বিশ্বাসী এবং চীনের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কের ক্ষতি না করে যতদূর সম্ভব তাইওয়ানকে সমর্থন দেয় দেশটি।

এদিকে গত বেশ কয়েক মাস ধরে তাইওয়ান ও চীনের মধ্যে উত্তেজনা বাড়ছে। চীন ঘন ঘন তাইওয়ানের জলসীমার কাছে সামুদ্রিক মহড়ার আয়োজন করছে। তাইওয়ানের জল ও আকাশসীমায় চীনা যুদ্ধজাহাজ এবং সামরিক বিমানের অনুপ্রবেশও ঘটেছে কয়েক বার।

ক্রমবর্ধমান এই উত্তেজনার জেরে যদি চীন-তাইওয়ান যুদ্ধ বেঁধে যায়— তাহলে যুক্তরাষ্ট্র তাইওয়ানের সমর্থনে সেনা ও সামরিক সরঞ্জাম পাঠাবে কি-না— ফক্স নিউজের এমন এক প্রশ্নের উত্তরে ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, “যদি সত্যিই এমন হয়, তাহলে আমাদের সেনাবাহিনীকে ৯ হাজার ৫০০ মাইল (১৫ হাজার ২৮৯ কিলোমিটার) পথ পাড়ি দিয়ে সেই যুদ্ধে অংশ নিতে হবে। এর কোনো মানে হয় না। আমি এটা চাই না। আমি চাই— তাইওয়ান শান্ত হোক এবং (আমি চাই) চীনও শান্ত হোক।”

আরও পড়ুন:  গুরুতর অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি নচিকেতা চক্রবর্তী

“আর আমার মনে হয় না তাদের মধ্যে কোনো যুদ্ধ বাঁধবে। শি’ (চীনের প্রেসিডেন্ট)-এর সঙ্গে আমার এ ব্যাপারে কথা হয়েছে। তিনি যুদ্ধে জড়াতে চান না।”

গত বছরের শেষ দিকে তাইওয়ানের কাছে ১ হাজার ১০০ কোটি ডলার মূল্যের ‘অস্ত্র প্যাকেজ’ বিক্রির ঘোষণা দিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সদর দপ্তর পেন্টাগন। এই প্যাকেজের মধ্যে রকেট লাঞ্চার, বিভিন্ন পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রসহ বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র আছে।

পেন্টাগন যখন এই অস্ত্র বিক্রির চুক্তি স্বাক্ষরের ঘোষণা দিয়েছিল, সে সময় তার নিন্দা জানিয়েছিলেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং।

শুক্রবারের সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন চুক্তিটি পুনর্বিবেচনা করবেন তিনি। ফক্স নিউজকে ট্রাম্প বলেন, “এই সফরে এ চুক্তিটির ব্যাপারে শি’র সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। আমি চুক্তির ব্যাপারটি পুনর্বিবেচনা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আমি এ ব্যাপারটি নিয়ে তাদের সঙ্গে কথা বলতে চাই— যারা এখন তাইওয়ান চালাচ্ছেন।”

আরও পড়ুন:  শরীফা গল্প পর্যালোচনায় কমিটি গঠন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের

এদিকে ফক্স নিউজের এই সাক্ষাৎকার প্রচারিত হওয়ার অল্প সময়ের মধ্যে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে তাইওয়ান। স্বায়ত্বশাসিত এই দ্বীপ ভূখণ্ডের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী চেন মিং-চি এক বিবৃতিতে বলেছেন— ফক্স নিউজকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের দেওয়া বক্তব্যের সুস্পষ্ট মানে জানতে চায় তাইওয়ান। সেই সঙ্গে চুক্তি কার্যকরের নিশ্চয়তাও চায় তাইপে।

“আমরা স্মরণ করিয়ে দিতে চাই যে তাইওয়ানের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র বিক্রির ব্যাপারটি মার্কিন আইন দ্বারা সংরক্ষিত। তাছাড়া তাইওয়ান-চীন অঞ্চলের আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ স্থম্ভ হিসেবে কাজ করছে যুক্তরাষ্ট্রের সমরাস্ত্র বিক্রয়”, বিবৃতিতে বলেন চেন মিং-চি।

সূত্র : বিবিসি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *