মরক্কো থেকে স্পেনে প্রবেশ করতে গিয়ে ৫৭ জনের মৃত্যু

মরক্কো থেকে স্পেনের স্বায়ত্তশাসিত শহর সেউতায় প্রবেশ করতে গিয়ে অন্তত ৫৭ জন অভিবাসনপ্রত্যাশীর মৃত্যু হয়েছে। ২৪ ঘণ্টায় মরক্কো থেকে সেউতায় প্রায় ৬০ হাজার মানুষ প্রবেশ করেছে বলে নিশ্চিত করেছে স্থানীয় প্রশাসন। তবে সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্যে জানা গেছে, এদের অধিকাংশই শুক্রবার স্বেচ্ছায় মরক্কোয় ফিরে যেতে শুরু করেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ দ্রুত দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন।

সিভিল গার্ড কর্মকর্তাদের প্রতিনিধিত্বকারী স্থানীয় সংগঠন প্রধান রশিদ সবিহী জানান যে ৫৭ জনের মধ্যে কয়েকজন পানিতে ডুবে মারা গেছেন এবং বাকিরা তারাজাল সৈকতের কাছে সীমান্ত বেড়া অতিক্রম করার সময় পদদলিত হয়ে মারা যান। প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ এই ঘটনাকে স্পেনের আঞ্চলিক অখণ্ডতার লঙ্ঘন হিসেবে অভিহিত করে মানব পাচারকারীদের দায়ী করেছেন।

স্পেনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক পরিসংখ্যানে জানায় যে ৫০ হাজারের বেশি মানুষ প্রবেশের পর শুক্রবার (৩১ জুলাই) সন্ধ্যা নাগাদ প্রায় ৪৮ হাজার ৩০০ জনই মরক্কোতে ফিরে গেছেন এবং বাকিদেরও ফেরত পাঠানোর কাজ চলছে। স্পেনের মাদ্রিদ সরকার সেউতার নিরাপত্তা জোরদার করতে সেনাবাহিনী, অতিরিক্ত পুলিশ, ডুবুরি, ড্রোন ও বোট পাঠিয়েছে।

আরও পড়ুন:  মরক্কোর বিস্ময়বালক বুয়াদ্দির পারফরম্যান্সে অবাক বিশ্ব

এই সংকটের ফলে কূটনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন প্রধান উরসুলা ফন ডার লেয়েন এই ঘটনাকে ‘অনভিপ্রেত’ বলে অভিহিত করেছেন। অন্যদিকে ইতালি, ফিনল্যান্ড ও ডেনমার্ক স্পেনকে ইউরোপের উন্মুক্ত সীমান্তের শেনজেন চুক্তি থেকে সাময়িক বহিষ্কারের দাবি জানিয়েছে এবং ফ্রান্স সীমান্ত পাহারা জোরদার করেছে।

রাজনৈতিক সুযোগ নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জানান যে ডেমোক্র্যাটরা ক্ষমতায় এলে তিন বছরের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রেও একই ধরনের ভয়াবহ সংকট তৈরি হবে। তবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছেন, সেউতা থেকে কোনো অভিবাসনপ্রত্যাশী ইউরোপ মূল ভূখণ্ডে ছড়িয়ে পড়েনি।

স্পেনে ঢুকে পড়া অভিবাসীরা মরক্কো ফিরে যাচ্ছে

স্পেনের উত্তর আফ্রিকান ভূখণ্ড সেউতায় অভিবাসীদের নজিরবিহীন ঢলের পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এসেছে বলে জানিয়েছে দেশটির সরকার। বৃহস্পতিবার থেকে স্থল ও সমুদ্রপথে সীমান্ত পেরিয়ে সেউতায় প্রবেশ করা ৫০ হাজারের বেশি মানুষের অধিকাংশই শুক্রবার স্বেচ্ছায় মরক্কোয় ফিরে যেতে শুরু করেন।

সেউতার সরকারি প্রতিনিধি জানিয়েছেন, নিহতদের কেউ পানিতে ডুবে এবং কেউ সীমান্ত বেড়া রক্ষাকারী বাঁধে ওঠার সময় পদদলিত হয়ে মারা গেছেন। স্পেনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার সকাল থেকে প্রায় ৫০ হাজার মানুষ সীমান্ত অতিক্রম করেছিলেন। শুক্রবার সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত তাদের মধ্যে প্রায় ৪৮ হাজার ৩০০ জন ইতোমধ্যে মরক্কোয় ফিরে গেছেন। তবে সেউতার স্থানীয় সরকারের প্রধান হুয়ান হেসুস ভিভাসের দাবি, গত দুই দিনে সীমান্ত পাড়ি দেওয়া মানুষের সংখ্যা ৬০ হাজার পর্যন্ত হতে পারে।

আরও পড়ুন:  অ্যাকাডেমিক ক্যালেন্ডারে বড় পরিবর্তন, এইচএসসি পরীক্ষাও হবে ডিসেম্বরে

সীমান্তে আরও মানুষের প্রবেশ ঠেকাতে মরক্কোর নিরাপত্তা বাহিনী লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে। জলকামানও মোতায়েন করা হয়। সংঘর্ষের পর একটি বাস ও সাতটি গাড়ির পোড়া ধ্বংসাবশেষ দেখা গেছে। সীমান্তের স্প্যানিশ অংশে সামরিক যানও মোতায়েন করা হয়।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কয়েকশ মানুষ সীমান্তের বিভিন্ন ফাঁক ও প্রবেশপথ দিয়ে মরক্কোয় ফিরে যাচ্ছিলেন। তাদের কেউ কেউ জানিয়েছেন, সেউতায় প্রবেশের পর খাবার ও আশ্রয়ের সংকটে পড়েছিলেন। তানজিয়ার এক তরুণ মরক্কান বলেন, ‘সত্যি বলতে, আমি কেন এসেছিলাম তা-ই জানি না। এখন ফিরে যাচ্ছি।’

স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ শুক্রবার সেউতা সফর করে ঘটনাটিকে দেশের ‘ভূখণ্ডগত সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন’হিসেবে অভিহিত করেন। অবৈধভাবে প্রবেশকারীদের দ্রুত নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।

আরও পড়ুন:  ভেনিজুয়েলায় ভূমিকম্পে প্রাণহানি বেড়ে ৪৪৯০

সেউতা ও মেলিয়া—উত্তর আফ্রিকায় অবস্থিত স্পেনের দুটি স্বায়ত্তশাসিত শহর—আফ্রিকার সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের একমাত্র স্থলসীমান্ত। অভিবাসীরা দীর্ঘদিন ধরে এসব সীমান্ত ব্যবহার করে ইউরোপে প্রবেশের চেষ্টা করে আসছেন। তবে এবারের ঢলের ব্যাপকতা নজিরবিহীন বলে মনে করা হচ্ছে।

ঘটনাটি ইউরোপজুড়ে রাজনৈতিক বিতর্কও তৈরি করেছে। ইতালি স্পেনের সঙ্গে ইউরোপের সীমান্তমুক্ত শেনজেন ব্যবস্থার কার্যকারিতা স্থগিতের ঘোষণা দিয়েছে। মাদ্রিদ অবশ্য এই সিদ্ধান্তকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের চুক্তির পরিপন্থি বলে প্রতিবাদ জানিয়েছে। ফ্রান্সও স্পেন সীমান্তে পুলিশ ও নজরদারি বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে। এদিকে, মরক্কোর নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর তৎপরতায় নতুন করে সীমান্ত পেরোনোর বেশির ভাগ চেষ্টা ব্যর্থ হলেও, সীমান্তের আশপাশে এখনো অভিবাসীদের ছোট ছোট দল ইউরোপে প্রবেশের পথ খুঁজছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *