স্পেন থেকে অভিবাসীদের প্রবেশ নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে স্পেনের সঙ্গে ‘শেনজেন চুক্তি’র আওতায় অবাধ চলাচল এক মাসের জন্য সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে ইতালি। মরক্কোর ভূখণ্ডে অবস্থিত স্পেনের ছিটমহল সিউটা একদিনে প্রায় ৪৯ হাজার অভিবাসী প্রবেশের ঘটনার পর নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগ থেকে ইতালি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে জানিয়েছে ইতালির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
ইতালির অভিবাসন বিশ্লেষণ ও সীমান্ত নিরাপত্তা কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে শুক্রবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বৈঠকে স্পেনের সঙ্গে শেনজেনের অবাধ চলাচল সাময়িকভাবে স্থগিতের সিদ্ধান্ত অনুমোদন করা হয়। বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মাত্তেও পিয়ান্তেদোসি।
উপ-প্রধানমন্ত্রী তাজানি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, ‘দেশের নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ইউরোপের সীমান্ত রক্ষার জন্য এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।’ তার ভাষায়, শেনজেন চুক্তির নিয়ম অনুযায়ী এটি একটি বৈধ ও সাময়িক ব্যবস্থা, যা বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রয়োজনীয় হয়ে উঠেছে।
এর আগে হাজার হাজার অভিবাসী প্রবেশের ঘটনায় স্পেনকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ভিসামুক্ত ‘শেনজেন অঞ্চল’ থেকে সাময়িকভাবে বাদ দেওয়ার আহ্বান জানান ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি।
বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়, বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে জানান, বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা চলছে।
শেনজেন চুক্তি কি
শেনজেন চুক্তি হলো ইউরোপের একটি ঐতিহাসিক আন্তর্জাতিক চুক্তি, যার মাধ্যমে সদস্য দেশগুলোর পারস্পরিক অভ্যন্তরীণ সীমানা বা চেকপোস্ট তুলে নেওয়া হয়েছে এবং এক ভিসায় একাধিক দেশে অবাধ যাতায়াতের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এই চুক্তির ফলে গঠিত শেনজেন এলাকায় মানুষ বিনা বাধায় এক দেশ থেকে অন্য দেশে যাতায়াত করতে পারে।
শেনজেন অঞ্চল ইউরোপের ২৯টি দেশের একটি উন্মুক্ত সীমান্ত ব্যবস্থা, যেখানে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সাধারণত পাসপোর্ট বা সীমান্ত তল্লাশি ছাড়াই অবাধে চলাচল করা যায়।
ইতালির সমালোচনায় স্পেন
ইতালির এই সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছে স্পেন। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী হোসে ম্যানুয়েল আলবারেজ ব্যাখ্যা চেয়ে মাদ্রিদে নিযুক্ত ইতালির রাষ্ট্রদূতকে তলব করেছেন।
স্পেনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সিউটার অভিবাসী সংকটের সঙ্গে সরকারের অভিবাসীদের বৈধতা দেওয়ার নীতির কোনো সম্পর্ক নেই। তাদের দাবি, সাঁতার কেটে সিউটায় প্রবেশ করা অভিবাসীদের বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের একটি রায়কে মানবপাচারকারী ও অপরাধী চক্র অপব্যবহার করায় এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
এদিকে ফ্রান্সও স্পেনের সঙ্গে স্থল সীমান্তে নজরদারি বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে। প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাখোঁ বলেন, সিউটার অভিবাসী সংকট মোকাবিলায় স্পেনকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেবে ফ্রান্স। তবে ফিনল্যান্ড, নেদারল্যান্ডস, ডেনমার্ক, চেক প্রজাতন্ত্র ও সুইডেনসহ কয়েকটি ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশ ইতালির অবস্থানের প্রতি সমর্থন জানায়।
ফিনল্যান্ডের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মারি রান্তানেন বলেন, স্পেন শেনজেন অঞ্চলের বাইরের সীমান্ত রক্ষায় ব্যর্থ হয়েছে এবং এই পরিস্থিতি আর চলতে পারে না।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের স্বরাষ্ট্র বিষয়ক কমিশনার ম্যাগনাস ব্রুনার বলেছেন, সিউটার পরিস্থিতি উদ্বেগজনক হলেও সেখান থেকে ইউরোপের মূল ভূখণ্ড বা অন্য সদস্য দেশে অভিবাসীদের অনিয়ন্ত্রিত প্রবেশের কোনো তথ্য নেই। তিনি জানান, স্প্যানিশ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হচ্ছে।
তিনি আরো বলেন, শেনজেন সীমান্ত আইনে সিউটা ও মেলিলার জন্য বিশেষ নিয়ম রয়েছে। তাই সিউটা থেকে বের হওয়া ব্যক্তিদের ওপর আগে থেকেই সীমান্ত তল্লাশি চালানো হচ্ছে।
এদিকে আগামী বছরের সাধারণ নির্বাচনকে সামনে রেখে ইতালিতে শেনজেন চুক্তি সাময়িকভাবে স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নিয়ে তীব্র রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়েছে। ইতালির এ পদক্ষেপকে ফ্রান্সের ন্যাশনাল র্যালি, জার্মানির অল্টারনেটিভ ফর জার্মানি (এএফডি) এবং যুক্তরাজ্যের রিফর্ম ইউকে-সহ ইউরোপের বেশ কয়েকটি কট্টর ডানপন্থী দল সমর্থন জানিয়েছে।







