আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সুষ্ঠু বিচার নিয়ে হিউম্যান রাইটস ওয়াচের উদ্বেগ

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে (আইসিটি) বিচার কার্যক্রমে আন্তর্জাতিক আইনি মানদণ্ড যথাযথভাবে মানা হচ্ছে না বলে অভিযোগ করেছে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)। মানবাধিকার সংস্থাটি বলেছে, এসব ত্রুটির কারণে ভুক্তভোগীরা ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হতে পারেন, আইনের শাসন দুর্বল হতে পারে, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে অন্যায়ভাবে কারাবন্দি করার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। সেই সঙ্গে অতীতের মানবাধিকার লঙ্ঘনের পুনরাবৃত্তি ঘটতে পারে।

এইচআরডব্লিউর অভিযোগকে ‘একপেশে ও পক্ষপাতদুষ্ট’ বলে দাবি করেছেন ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম। তিনি বলেছেন, সংস্থাটি প্রসিকিউশন বা তদন্ত সংস্থার বক্তব্য না নিয়েই বিবৃতি দিয়েছে, যা কোনোভাবেই নিরপেক্ষ হতে পারে না।

গত মঙ্গলবার প্রকাশিত বিবৃতিতে এইচআরডব্লিউ জানায়, গত ২৭ জুলাই প্রসিকিউটররা মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যার অভিযোগে ৪১ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করেছেন। অভিযুক্তদের মধ্যে রাজনীতিক, নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য এবং সাংবাদিকও রয়েছেন। তাদের বিরুদ্ধে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ সরকারের সময় সংঘটিত গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ আনা হয়েছে।

এইচআরডব্লিউর এশিয়া অঞ্চলের উপপরিচালক মীনাক্ষী গাঙ্গুলী বলেন, শেখ হাসিনা সরকারের আমলে সংঘটিত নানা নির্যাতনের জন্য দায়ীদের অবশ্যই জবাবদিহি করতে হবে। তবে অনেক মামলায় আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী ন্যায্য বিচার নিশ্চিত হচ্ছে না।

তিনি বলেন, বাংলাদেশকে জরুরি ভিত্তিতে ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার সংস্কার করতে হবে। দুর্বল তদন্ত ও ভিত্তিহীন অভিযোগের মাধ্যমে যাতে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার সুযোগ না থাকে, সে বিষয়টি নতুন সরকারের নিশ্চিত করা উচিত।

এইচআরডব্লিউ জানায়, আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় গুরুতর অপরাধের বিচার করার জন্য গঠিত ট্রাইব্যুনালে বেশ কিছু মামলা চলমান। এর মধ্যে একডজনের বেশি মামলার পর্যবেক্ষণে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণে গুরুতর ঘাটতি দেখতে পেয়েছে সংস্থাটি।

এইচআরডব্লিউর অভিযোগ, একাধিক মামলায় অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন ও আটকাদেশের ক্ষেত্রে এমন সাক্ষ্য-বিবৃতির ওপর নির্ভর করা হয়েছে, যেখানে একই ধরনের অভিযোগের অংশ বিভিন্ন সাক্ষীর জবানবন্দিতে প্রায় হুবহু উঠে এসেছে।

আরও পড়ুন:  ৪৯তম বিসিএস প্রিলিমিনারির ফল প্রকাশ, উত্তীর্ণ ১২১৯

২০২৪ সালের আগস্ট মাসে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকে ছয়টি মামলার বিচার শেষ করেছে ট্রাইব্যুনাল। এতে মানবতাবিরোধী অপরাধে ৬২ জন দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন। ৪২ আসামির বিচার হয়েছে তাদের অনুপস্থিতিতে, যার মধ্যে শেখ হাসিনাও রয়েছেন। এ ছাড়া ১৬ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

২০১০ সালের মার্চে শেখ হাসিনা সরকারের সময় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়। এর উদ্দেশ্য ছিল ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি বাহিনীর সহযোগী হিসেবে আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিচার করা। সে প্রসঙ্গ ধরে এইচআরডব্লিউ বলেছে, ওই বিচার প্রক্রিয়ায় ছয়জনের ফাঁসি কার্যকর হলেও তা পর্যাপ্ত প্রমাণের অভাব, রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্ব, প্রসিকিউটর ও বিচারকদের মধ্যে যোগসাজশ এবং মৌলিক আইনি সুরক্ষার অভাবে ব্যাপকভাবে সমালোচিত হয়েছিল।

ওই ছয়জনের মধ্যে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জামায়াতে ইসলামীর নেতা মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের বিচার সম্পন্ন হয়। এই মামলায় ট্রাইব্যুনাল তাঁর মৃত্যুদণ্ডের রায় দেন। পরবর্তীতে সুপ্রিম কোর্ট তা বহাল রাখে। ২০১৫ সালের ১১ এপ্রিল ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে কামারুজ্জামানের ফাঁসি কার্যকর করা হয়। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর মামলা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের অন্যতম আলোচিত। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় সংঘটিত হত্যা, গণহত্যা, নির্যাতনসহ মানবতাবিরোধী অপরাধে ২০১৩ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেন। ২০১৫ সালের ২২ নভেম্বর তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। এসব মামলার বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে সে সময় উদ্বেগ জানিয়েছিল এইচআরডব্লিউ।

গত অন্তর্বর্তী সরকার ট্রাইব্যুনাল-সংক্রান্ত আইন সংশোধন করে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এখতিয়ারভুক্ত অপরাধের সংজ্ঞায় পরিবর্তন আনে। তবে এইচআরডব্লিউর মতে, এসব সংশোধন আন্তর্জাতিক আদালতের সমমানের যথাযথ বিচারিক ও প্রক্রিয়াগত সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পারেনি। সংস্থাটি আরও জানায়, গত ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার এ আইনে আর কোনো সংশোধন আনেনি।

আরও পড়ুন:  মৃত্যুদণ্ডের রায় বাতিল চেয়ে ট্রাইব্যুনালে শেখ হাসিনার আইনজীবীর চিঠি

এইচআরডব্লিউর অভিযোগ, বর্তমান আইন অনুযায়ী প্রসিকিউটররা পর্যাপ্ত প্রমাণের মানদণ্ড পূরণ না করেই কাউকে গ্রেপ্তারের নির্দেশ দিতে পারেন। লিখিত কারণ ছাড়াই মাসের পর মাস আটক রাখার সুযোগ রয়েছে। পৃথক আদালতে অন্তর্বর্তী আপিলের অধিকার নেই। অভিযোগপক্ষ প্রমাণ উপস্থাপনের মাত্র তিন সপ্তাহের মধ্যেই বিচার শুরু করা যায়, ফলে আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য পর্যাপ্ত প্রস্তুতির সুযোগ থাকে না। অনুপস্থিতিতে বিচার হলেও অভিযুক্তের নিজস্ব আইনজীবী নিয়োগের যথাযথ সুযোগ নেই এবং প্রতিরক্ষা আইনজীবীর সাক্ষীদের জেরা করার ক্ষমতাও সীমিত।

গত ১৪ মে ২০১৩ সালে হেফাজতে ইসলামের কর্মসূচি নিয়ে সংবাদ পরিবেশনের অভিযোগে দুই সাংবাদিককে গ্রেপ্তারের নির্দেশ দেয় ট্রাইব্যুনাল। মানবাধিকার সংগঠনগুলো ওই সময় অতিরিক্ত বলপ্রয়োগে কয়েকজন বিক্ষোভকারী নিহত হওয়ার কথা বলেন। প্রসিকিউটররা অভিযোগ করেন, সাংবাদিক মোজাম্মেল বাবু ও ফারজানা রূপা হত্যাকাণ্ড ধামাচাপা দিতে সরকারকে সহায়তা করেছেন এবং মিথ্যা তথ্য প্রচার করেছেন।

এইচআরডব্লিউ জানায়, সাংবাদিকদের আইনজীবীরা বলেছেন, গ্রেপ্তারের কারণ উল্লেখ করে কোনো লিখিত নথি তাদের দেওয়া হয়নি, যা আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারবিষয়ক চুক্তির ১৪ নম্বর অনুচ্ছেদ এবং বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইনের লঙ্ঘন।

এইচআরডব্লিউ আরও দাবি করেছে, তদন্ত কর্মকর্তাদের রেকর্ড করা একাধিক সাক্ষ্য-বিবৃতিতে একই ধরনের অনুচ্ছেদ হুবহু পুনরাবৃত্তি হয়েছে, যা সেগুলোর সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করে।

মীনাক্ষী গাঙ্গুলী বলেন, অতীতে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় যেভাবে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বিচার পরিচালিত হয়েছে, সেই ভুলের পুনরাবৃত্তি করা যাবে না। একই ধরনের সাক্ষ্য-বিবৃতির ভিত্তিতে আনা অভিযোগ একটি বিশ্বাসযোগ্য বিচার প্রক্রিয়ার ঘাটতি তুলে ধরে, যা শেষ পর্যন্ত আবারও ভুক্তভোগী, তাদের পরিবার এবং বাংলাদেশের জনগণকে ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত করবে।

এইচআরডব্লিউর বিবৃতি পক্ষপাতদুষ্ট: চিফ প্রসিকিউটর
এইচআরডব্লিউর অভিযোগকে একপেশে ও পক্ষপাতদুষ্ট বলে দাবি করেছেন চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম। তাঁর দাবি, সংস্থাটি প্রসিকিউশন বা তদন্ত সংস্থার বক্তব্য না নিয়েই এমন কথা বলেছে। এটি নিরপেক্ষ হতে পারে না।

আরও পড়ুন:  কুষ্টিয়ায় ৬ জনকে হত্যা মামলায় ইনুর ১০ বছরের কারাদণ্ড

বুধবার নিজ কার্যালয়ে চিফ প্রসিকিউটর সাংবাদিকদের বলেন, হিউম্যান রাইটস ওয়াচের প্রকাশিত বিবৃতির পেছনে কোনো স্বার্থান্বেষী মহল থাকতে পারে। এটি নিরপেক্ষ কোনো প্রতিবেদন নয়। এইচআরডব্লিউএর প্রতিনিধি দল প্রসিকিউশন বা তদন্ত সংস্থার সঙ্গে কথা বলে যদি তারা এসব করত, তাহলে সঠিক তথ্য বেরিয়ে আসত। কিন্তু তাদের এখনকার প্রতিবেদনটি একপক্ষীয়। কোনো আসামির মাধ্যমে প্রভাবিত হয়ে এটি প্রকাশ হয়েছে।

এইচআরডব্লিউর বিবৃতিতে সাক্ষীদের জবানবন্দিতে একই ধরনের বক্তব্যের পুনরাবৃত্তি নিয়ে যে প্রশ্ন তোলা হয়েছে, তা নাকচ করে আমিনুল ইসলাম বলেন, একই ঘটনার একাধিক আসামির বিচার হলে সাক্ষীদের বক্তব্যে সামঞ্জস্য থাকাই স্বাভাবিক। কারণ একটি জায়গায় যদি ১০০ জন মানুষ শহীদ হন, আর এ ঘটনায় বিভিন্ন আসামির বিচার আলাদাভাবে হয়, তাহলে সাক্ষীদের বক্তব্যও একই ধরনের হবে। বরং ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য হলে তখনই প্রশ্ন ওঠার কথা।

প্রসিকিউশন বা তদন্ত সংস্থার মান নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ নেই জানিয়ে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থায় অতিরিক্ত আইজিপি, এসপি, অতিরিক্ত এসপি পদমর্যাদার ২৩ জন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন করছেন। পাশাপাশি প্রসিকিউশন টিমেও দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ ফৌজদারি আইনজীবীরা রয়েছেন। এসব কর্মকর্তা ও আইনজীবীর দক্ষতা বা মান নিয়ে প্রশ্ন তোলার কোনো অবকাশ নেই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *