হরমুজ প্রণালিতে ‘সেবা ফি’ দিতে সম্মত ইউরোপ

বৈশ্বিক জ্বালানি বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে টোল আরোপের সম্ভাবনা নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে চলছে নানা আলোচনা। টোল বাধ্যতামূলক নাকি স্বেচ্ছাধীন হবে, আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইন কী বলে এবং প্রণালিটির নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত করা হবে—এসব প্রশ্নে ইরান, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, ওমানসহ সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে স্পষ্ট মতপার্থক্য দেখা যাচ্ছে। তবে ইউরোপের দেশগুলো ‘নেভিগেশন ফি’ অর্থাৎ জাহাজ চলাচলে পরিষেবার বিনিময়ে ‘ফি’ দেওয়ার একটি প্রস্তাব বিবেচনা করছে।

ইরান বলছে, হরমুজ প্রণালিতে চলাচলকারী জাহাজগুলোকে নির্দিষ্ট ‘ফি’ দিতে হবে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, ইরানকে অবিলম্বে এই প্রণালি উন্মুক্ত করে দিতে হবে। সেই সঙ্গে প্রতিশ্রুতি দিতে হবে, এই পথে চলাচলকারী কোনো জাহাজে তারা হামলা চালাবে না। এদিকে ইউরোপ বলছে, টোল আরোপ হতে পারে, তবে তা বাধ্যতামূলক হবে না। অন্যদিকে ইরান একতরফাভাবে টোল আরোপ করুক, তা চায় না ওমান।

হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের এক-পঞ্চমাংশ অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) পরিবাহিত হয়। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান বিরোধের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে এই প্রণালি। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল একযোগে ইরানে আগ্রাসন শুরুর পর পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে তেহরান খুবই কার্যকরভাবে হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিতে সক্ষম হয়। কার্যত এখনো কৌশলগত এই বৈশ্বিক জলপথের নিয়ন্ত্রণ তেহরানের হাতেই রয়ে গেছে।

আরও পড়ুন:  অভিবাসনপ্রত্যাশীদের আশ্রয়-সংক্রান্ত সব সিদ্ধান্ত স্থগিত করছে যুক্তরাষ্ট্র

যুদ্ধ স্থায়ীভাবে বন্ধের লক্ষ্যে গত ১৭ জুন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান ১৪ দফার একটি সমঝোতা স্মারকে সম্মত হয়। এর লক্ষ্য ছিল যুদ্ধবিরতি দীর্ঘায়িত করা এবং সব ধরনের সংঘাতের অবসান ঘটানো। চুক্তির অংশ হিসেবে হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ প্রশাসন ও নৌ পরিষেবা কীভাবে পরিচালিত হবে, তা নির্ধারণে উপসাগরীয় অঞ্চলের অন্যান্য দেশের সঙ্গে ইরান ও ওমানের আলোচনার কথা রয়েছে।

কে কী বলছে

হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে ‘নেভিগেশন ফি’ আদায়ের সুযোগ তৈরি হতে পারে—এমন কয়েকটি প্রস্তাব পর্যালোচনা করছে ইউরোপের দেশগুলো। তবে তাদের শর্ত হলো হরমুজ প্রণালিতে এ ধরনের টোল কোনোভাবেই বাধ্যতামূলক হতে পারবে না। এ ছাড়া বিষয়টি নিয়ে জাতিসংঘের সমুদ্র পরিবহনবিষয়ক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল মেরিটাইম অর্গানাইজেশনের (আইএমও) সমর্থন থাকতে হবে।

যুক্তরাজ্যের উপপ্রধানমন্ত্রী ডেভিড ল্যামি গতকাল শনিবার বলেছেন, হরমুজ প্রণালিতে টোল বাধ্যতামূলক করা হলে তা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য বিপর্যয়কর হবে। তবে যুক্তরাজ্যের মন্ত্রিসভার কয়েকজন সদস্য বলেছেন, মালাক্কা প্রণালি, ইংলিশ চ্যানেলসহ বিশ্বের অনেক প্রাকৃতিক জলপথে জাহাজ চলাচলে নির্দিষ্ট সেবার বিনিময়ে অর্থ আদায় করা হয়। এ ধরনের ব্যবস্থা আন্তর্জাতিকভাবেও স্বীকৃত।

আরও পড়ুন:  ‘আমিন আমিন’ ধ্বনিতে শেষ বিশ্ব ইজতেমার প্রথম পর্ব

প্রণালির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কিছু সেবা দেওয়া হলে তার জন্য স্বেচ্ছাধীন অর্থ আদায় ব্যবস্থার পক্ষে ওমান। এর মাধ্যমে ইরানও কিছু অর্থ পেতে পারে, তবে সেটি একতরফা বাধ্যতামূলক টোল হিসেবে নয়। ওমানের লক্ষ্য হলো হরমুজ প্রণালিকে আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় রেখে পরিচালনা করা, যেখানে জাহাজ চলাচল অবাধ থাকবে। এ লক্ষ্যে তেহরানকে একটি প্রস্তাবও দিয়েছে তারা।

যুক্তরাষ্ট্র চাইছে, হরমুজ প্রণালি খোলা আছে বলে প্রকাশ্যে ঘোষণা দিক ইরান। পাশাপাশি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা বন্ধের অঙ্গীকার করতে হবে দেশটিকে। মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে তেহরানের নেতৃত্বের কাছে একটি বার্তা পাঠানোর কথাও জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এতে তেহরানকে প্রকাশ্যে এই ঘোষণা দিতে বলা হয়েছে যে হরমুজ প্রণালি খোলা আছে এবং তারা আর বাণিজ্যিক জাহাজে গুলি চালাবে না।

হরমুজ প্রণালি কীভাবে পরিচালিত হবে, তা নিয়ে আলোচনা করতে শনিবার ওমান সফরে গেছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ তথ্য জানিয়ে বলেছে, যুদ্ধ বন্ধে দেড় মাসের বেশি সময় ধরে চলা আলোচনার অংশ এটি। ইরান বলছে, ওমানের সঙ্গে সমন্বয় করে হরমুজ প্রণালি পরিচালনা করবে তারা। আর চলাচলকারী জাহাজগুলোকে দিতে হবে ‘সার্ভিস ফি’।

আরও পড়ুন:  ‘সরকার পতনের পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের হাত ছিল না’, সিএনএন-নিউজ এইটিনকে হাসিনা

ইউনিভার্সিটি অব নিউ সাউথ ওয়েলসের সমুদ্রবিষয়ক নিরাপত্তাবিশেষজ্ঞ জেনিফার পার্কার মনে করেন, হরমুজে চলাচলকারী জাহাজ থেকে কেবল ‘ফি’ আদায় নয়, বরং এর মাধ্যমে প্রণালিটির নিয়ন্ত্রণ নিজেদের কাছে রাখাই তেহরানের মূল লক্ষ্য। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসিকে তিনি বলেন, কিছু ছাড় পেলে ইরান হরমুজের নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে দেবে—যুক্তরাষ্ট্রের এ ভাবনা থেকে সরে এসে বিষয়টি নতুন করে ভাবতে হবে। কোনো প্রতিশ্রুতি, অর্থনৈতিক ছাড়, এমনকি সামরিক অভিযান চালালেও হরমুজ প্রণালি নিয়ে তেহরানের অবস্থান বদলানো যাবে না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *