প্রকৃতির রুদ্ররূপ আর মানুষের অসচেতনতার এক ভয়াবহ যুগলবন্দি দেখল দেশের দক্ষিণ-পূর্ব ও উত্তর-পূর্বাঞ্চল। গত কয়েকদিনের টানা বর্ষণ এবং সীমান্ত পেরিয়ে আসা পাহাড়ি ঢলে এক বিস্তীর্ণ জনপদ এখন অথৈ জলের নিচে। কোথাও বুকসমান পানি, কোথাও আবার মাথার ওপর ভেঙে পড়েছে আস্ত পাহাড়ের চাঙ্গড়। প্রকৃতির এই তাণ্ডবে ওলটপালট হয়ে গেছে লাখো মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা।
কক্সবাজারে পাহাড়ধসের ট্র্যাজেডি: চলতি বন্যায় সবচেয়ে বড় আঘাতটি এসেছে পর্যটন নগরী কক্সবাজার এবং বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রামের ওপর। পাহাড়ি ঢলের পাশাপাশি অনিয়ন্ত্রিত পাহাড় কাটার চড়া মূল্য দিতে হচ্ছে এই অঞ্চলের বাসিন্দাদের
মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত ৪৪ জন মৃতের মধ্যে সর্বোচ্চ ২৩ জনের মৃত্যু হয়েছে কক্সবাজারে। যার মধ্যে ১০ জন স্থানীয় বাসিন্দা হলেও বাকি ১৩ জন আশ্রয়শিবিরে থাকা রোহিঙ্গা নাগরিক। পাহাড়ের ঢালু জায়গায় অপরিকল্পিতভাবে বসবাসের কারণে ভারি বৃষ্টিপাতে মাটি ধসে এই মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে।
অন্যদিকে, বিভাগীয় শহর চট্টগ্রামে দেয়াল ধসে ও বন্যার পানিতে ডুবে মারা গেছেন ১১ জন। পাহাড়বেষ্টিত জেলা বান্দরবানে ঢলের পানিতে ভেসে এবং পাহাড় ধসে প্রাণ হারিয়েছেন ৬ জন। রাঙামাটিতে ৩ জন এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মৌলভীবাজারে বন্যায় ১ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়।
১০ জেলায় বন্যা পরিস্থিতির অবনতি: দশটিরও বেশি জেলায় বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। এখনো চারটি নদীর পানি ছয় জেলার কয়েকটি পয়েন্টে বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র শনিবার (১১ জুলাই) নিয়মিত বন্যা পূর্বাভাসে এ তথ্য জানিয়েছে।
পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, আগামী ২৪ ঘণ্টায় নীলফামারী, লালমনিরহাট, রংপুর, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধা জেলার তিস্তা, ধরলা ও দুধকুমার নদীর পানি আরও বাড়তে পারে। এতে কয়েকটি স্থানে পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করে নদীতীরবর্তী নিম্নাঞ্চলে স্বল্পমেয়াদি বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে। একই সময়ে ফেনী, চট্টগ্রাম ও খাগড়াছড়ি জেলার মুহুরী, ফেনী, সেলোনিয়া ও হালদা নদীর পানিও বৃদ্ধি পেতে পারে। এর ফলে এসব জেলার নিম্নাঞ্চলের কোথাও কোথাও সাময়িক বন্যা দেখা দেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। পাশাপাশি লক্ষ্মীপুর ও নোয়াখালীর নিচু এলাকাও এ সময় প্লাবিত হতে পারে বলে পূর্বাভাসে উল্লেখ করা হয়েছে।
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশের ১২৭টি পানি পরিমাপ কেন্দ্রের মধ্যে ৫৭টিতে নদ-নদীর পানি বাড়ছে, ৬৪টিতে কমছে এবং ছয়টিতে পানি অপরিবর্তিত রয়েছে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে দীর্ঘস্থায়ী বন্যার আশঙ্কা নেই বলে জানিয়েছে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র। এ ছাড়া তিস্তা, কুশিয়ারা, সুরমা, সোমেশ্বরী, মুহুরী ও মাতামুহুরী নদীর কয়েকটি পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের পানি বর্তমানে সতর্কসীমার কাছাকাছি বা সতর্কসীমায় প্রবাহিত হচ্ছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
কোন জেলা কতটা ক্ষতিগ্রস্ত: মাঠপর্যায়ের পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ক্ষয়ক্ষতির দিক থেকে সবচেয়ে ভয়াবহ অবস্থায় রয়েছে চট্টগ্রাম জেলা। পাহাড়ি ঢল ও অতিবৃষ্টিতে সবচেয়ে শোচনীয় ও অবরুদ্ধ পরিস্থিতির শিকার হয়েছে বান্দরবান পার্বত্য জেলা। পাহাড়ি ঢল ও অতিবৃষ্টির কারণে বান্দরবানের বন্যা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটেছে। পাহাড়ধস, সড়ক তলিয়ে যাওয়া এবং দুধপুকুরিয়া রাবার ড্যামের বেড়িবাঁধ ভেঙে বাঙ্গালহালিয়ার বেইলি ব্রিজটি ধ্বংস হওয়ায় সারাদেশের সঙ্গে বান্দরবানের সড়ক যোগাযোগ পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। এছাড়া গাছ ভেঙে পড়ায় পুরো জেলা বিদ্যুৎহীন এবং মোবাইল ও ইন্টারনেট নেটওয়ার্ক বিচ্ছিন্ন অবস্থায় রয়েছে। আলীকদমসহ বিভিন্ন নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে হাজার হাজার পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দুর্যোগ মোকাবিলায় জেলা প্রশাসন পৌর এলাকার আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে হাজার হাজার মানুষের খাবারের ব্যবস্থা করছে এবং বিভিন্ন এনজিও (যেমন: ব্র্যাক, বিএনকেএস) দুর্গতদের মাঝে খাদ্য ও আর্থিক সহায়তা দিচ্ছে। সার্বিক পরিস্থিতির কারণে জেলা প্রশাসন আগামী ১৫ জুলাই পর্যন্ত জেলার সব পর্যটনকেন্দ্র বন্ধ ঘোষণা করেছে।
রোয়াংছড়ি সদর ইউপি চেয়ারম্যান মেহ্লাঅং মারমা আক্ষেপ করে বলেন, বান্দরবান সদরের নিম্নাঞ্চলের পাড়াগুলো পুরোপুরি ডুবে গেছে। ফোন করে যে কারও খবর নেব, সেই উপায়ও নেই। নিজেকেই জীবন বাজি রেখে নৌকা বা হেঁটে গিয়ে খবর নিতে হচ্ছে।
রাষ্ট্রীয় তৎপরতা: দুর্যোগের এই কঠিন মুহূর্তে সরকার সর্বোচ্চ দায়বদ্ধতা নিয়ে কাজ করছে বলে নিশ্চিত করেছে প্রশাসন। প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন এক সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন, সরকার মূলত তিনটি ফেজ—উদ্ধার (Rescuing), ত্রাণ (Relief) এবং পুনর্বাসন (Rehabilitation) নিয়ে একসঙ্গে কাজ করছে।
এইচএসসি পরীক্ষা স্থগিত: বন্যা পরিস্থিতির ভয়াবহতার কারণে চট্টগ্রাম বিভাগের সংশ্লিষ্ট জেলাগুলোতে চলমান এইচএসসি পরীক্ষা সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে। আশ্রয়কেন্দ্র: দুর্গতদের জন্য ১,১৩১টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে, যেখানে ইতোমধ্যে ৪৪,৪৫৭ জন মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন।
আর্থিক ও খাদ্য সহায়তা: দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় সারাদেশের জেলা প্রশাসকদের অনুকূলে ৬,৯০০ মেট্রিক টন চাল এবং ৩ কোটি ৪৫ লাখ টাকা বরাদ্দ দিয়েছে। এর বাইরেও প্রধানমন্ত্রী জরুরি তহবিল থেকে আরও ২ কোটি টাকা অনুদান দিয়েছেন।
উদ্ধার তৎপরতা জোরদার করতে উপকূলবর্তী এলাকায় কোস্টগার্ড, সীমান্তবর্তী এলাকায় বিজিবি এবং পার্বত্য ও দুর্গম জেলাগুলোতে প্রয়োজন অনুযায়ী বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে সম্পৃক্ত করা হয়েছে।
বেসরকারি ও এনজিওদের মানবিক হাত: সরকারি সহায়তার পাশাপাশি দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে বিভিন্ন সামাজিক ও আন্তর্জাতিক সংস্থা।
ব্র্যাক (BRAC): লামা, নাইক্ষ্যংছড়ি ও বান্দরবান সদরের ৬৬৫টি পরিবারকে জরুরি খাদ্যসামগ্রী (চাল, ডাল, চিনি, গুড়, লবণ, পেঁয়াজ) পৌঁছে দিয়েছে।
বলিপাড়া নারী কল্যাণ সংস্থা (BNKS): বান্দরবান ও লামা এলাকার প্রায় ১৬,০০০ বন্যাদুর্গত পরিবারকে জরুরি আপদকালীন খরচ হিসেবে বিকাশের মাধ্যমে সরাসরি ৫,০০০ টাকা করে আর্থিক সহায়তা প্রদান করেছে।
প্রত্যন্তের আর্তনাদ ও ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ: ত্রাণ কার্যক্রম শুরু হলেও বাস্তব চিত্র বেশ জটলা পাকানো। পাহাড়ি প্রত্যন্ত অঞ্চলের সড়ক ও যোগাযোগ ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়ায় অনেক জায়গায় সরকারি-বেসরকারি সাহায্য পৌঁছাতে বেগ পেতে হচ্ছে। আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে ঠাঁই নেওয়া বিপন্ন মানুষের মাঝে শুকনো খাবার ও বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। পানি নেমে যাওয়ার সাথে সাথে পানিবাহিত রোগ ও ডায়রিয়ার প্রাদুর্ভাব বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, যদিও মেডিকেল টিমগুলো ওষুধ ও ভ্যাকসিন নিয়ে প্রস্তুত রয়েছে বলে জানানো হয়েছে।







