কাজী ইফতেখারুল আলম তারেক
লেঃ কমান্ডার এম. মোজাক্কির হোসেন খান মিশু। সন্দ্বীপের কৃতি সন্তান, শিক্ষানুরাগী, মিরপুরে প্রথম ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল, চেরী ব্লোসমস ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের প্রিন্সিপাল ও প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, মহীয়সী নারী ড. সালেহা কাদেরের একমাত্র পুত্র। মোজাক্কির শুধু যে নিজে স্বপ্ন দেখতেন তা-ই নয়, অন্যদেরও স্বপ্ন দেখাতেন। আর সেই স্বপ্ন সফল করার সংগ্রামে নেমেছিলেন তিনি। এই প্রতিভার আকালের দেশে অল্প ক’জন প্রতিভাবান ও পরিশ্রমী মানুষের মধ্যে তিনি ছিলেন অন্যতম। কিন্তু হায়! অকালেই ঝরে গেলেন।
মোজাক্কির হোসেন খান মিশু এখন উর্দ্ধলোকে, না-ফেরার দেশে। একজন তরতাজা স্বপ্ন দেখা সৃজনশীল তেজোদীপ্ত মানুষ এভাবে চলে গেলেন! তার এই অকাল মৃত্যু অবিশ্বাস্য! কিন্তু নিয়তির বিধান এভাবেই বোধ হয় লিখে রাখেন বিধাতা। প্রভু তাকে অকালে নিয়ে গেলেও সম্মান দানে কার্পণ্য করেননি। এ মৃত্যু সম্মান ও গৌরবের।
২০১৭ সালের ৩ জুলাই পাকস্থলীর ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মাত্র ৩২ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন তিনি। তাঁর মৃত্যুতে তিন বাহিনীর সবাই কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। সময় থেমে থাকেনি। ঘড়ির কাঁটা এগিয়েছে নিজের মতো করে। সেকেন্ড, মিনিট, ঘন্টা, দিন, মাস ঘুরে বছরও চলে গেছে। শুধু ড. সালেহা কাদেরের জীবনের ঘড়িটা থেমে গেছে। সন্তানহারা মায়ের বুকে অবিরাম রক্তক্ষরণ।
স্কুলে পড়াকালীন মোজাক্কির এর রয়েছে অনেকগুলো অর্জন। তন্মধ্যে ক্লাস থ্রীতে পড়াবস্থায় মোজাক্কির কম্পিউটার আয়ত্ত করে নেন। সরকারী বৃত্তি পেয়ে জাপানে ছয় মাস একটি স্কুলে পড়াশোনার সুযোগ। এছাড়া স্কুলে পড়ার সময় মোজাক্কির প্রেসিডেন্ট এ্যাওয়ার্ড লাভ করেন। সম্পূর্ণ সরকারী স্কলারশীপে অনেকবার ভারত, মালয়েশিয়াসহ বহুদেশ সফরের সুযোগ পান। সেভেনে পড়ার সময় স্কাউটিং এ বাংলাদেশ থেকে দুটি ছেলে জাপানে যাবার সুযোগ পায়। তাদের মধ্যে একজন মোজাক্কির। তার আগে ‘কাব’ CUB ( a junior branch of the Scout Association, for boys aged about 8 to 11)- এ থাকাকালীন সে ভারত সফর করে। তখন সে পঞ্চম শ্রেণীর ছাত্র। ক্যাডেট প্রশিক্ষণকালীন অসামান্য কৃতিত্বের স্বীকৃতিস্বরুপ মোজাক্কির সম্মানসূচক Sword of Honour (শ্রেষ্ঠ প্রশিক্ষণনার্থীর স্বীকৃতি) লাভ এবং ব্যাচে প্রথম স্থান লাভ করেন।
সোনিয়া গান্ধি, নেশা দেশাইসহ পৃথিবীর বহু বিখ্যাত মানুষের সাথে মোজাক্কির ফটোসেশনে অংশ নিয়েছে। অনেকগুলো দেশ থেকে পুরষ্কার অর্জন করে সে দেশের মুখ উজ্জ্বল করেছে। বাংলাদেশকে বিশ্বের দরবারে তুলে ধরেছে। জাতীয় দৈনিকগুলোতে তাকে নিয়ে বেশকিছু আর্টিকেলও ছাপা হয়। ছোটবেলা থেকে অত্যন্ত পরিপাটি স্বভাবের মোজাক্কির হোসেন মিশুর ইচ্ছা ডিফেন্সে চাকরি। মা ড. সালেহা কাদের তার মতের সাথে একমত না হলেও কখনও তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে দাঁড়াননি। সবসময় সমর্থন যুগিয়েছেন। ভার্সিটিতে ভর্তি পরীক্ষা চলাকালীন মোজাক্কির জানতে পারেন নেভীতে কমিশনে রিক্রুট হচ্ছে। কালক্ষেপন না করে ইন্টারভিউতে অংশগ্রহন করলেন। নেভীতে মোজাক্কির এর যাত্রা শুরু। কর্মদক্ষতার গুণে মোজাক্কির তড়িৎ বেশ কয়েকটি প্রমোশন লাভ করেন।
বাংলাদেশ নৌ বাহিনীর এভিয়েশনকে মোজাক্কির হোসেন তিলে তিলে গড়েছেন। প্রথম নৌ বাহিনী হেলিকপ্টার কুচকাওয়াজে সে নেতৃত্ব দেয় যেখানে প্রধান অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রী। ২০১৬ সালে একটি প্রোগ্রামে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপস্থিতিতে লেঃ কমান্ডার এম. মোজাক্কির হোসেন খান মিশু BNS Bangabandhu জাহাজে হেলিকপ্টার ডেক ল্যান্ডিং প্রদর্শন করেন। এটি ছিল খুবই চ্যালেঞ্জিং, তার সাফল্যে বাংলাদেশ নেভী প্রধান তাকে হাতে লিখিত পত্রে প্রশংসা এবং তাঁকে উদ্দেশ্যে করে বিভিন্ন সম্মানসূচক কমেন্ট করেন। যার দ্বারা মোজাক্কির তার জুনিয়রদের কাছে দৃষ্টান্ত হয়ে রইলেন। এছাড়া তিনি ২০১৬ সালের ১৬ ডিসেম্বর রাষ্ট্রপতির উপস্থিতিতে বিজয় দিবস উড্ডয়ন মহড়ায়ও অংশগ্রহন করে তার কৃতিত্বেও স্বাক্ষর রাখেন।
মোজাক্কির এর যোগ্যতায় মুগ্ধ হয়ে সরকার তাকে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ দেয়। প্রত্যেক প্রশিক্ষণে মোজাক্কির সফলতা লাভ করেন।
মোজাক্কির ছিল পাইলট ইনস্ট্রাক্টর। অর্থাৎ পাইলট তৈরীতে তার ভূমিকা ছিল অগ্রগণ্য। এছাড়াও হেলিকপ্টার কিভাবে চালাতে হয় সেই ট্রেনিংও তাকে দিতে হতো। প্রশিক্ষণের জন্য আমেরিকা, ইটালি, কানাডা, জাপান, মালয়েশিয়া, মালদ্বীপসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ সরকারের তত্ত্বাবধানে সে ভ্রমণ করে। ব্যক্তিত্বের বদৌলতে স্বল্প সময়ে মোজাক্কির সবার কাছে জনপ্রিয়তা লাভ করেন। তিনবাহিনীর প্রধানরা তাকে খুবই পছন্দ করতেন।
মিশুকে নিয়ে এই প্রতিবেদকের নানা প্রশ্নের উত্তর দেন ড. সালেহা কাদের। পুরো সময় ধরে সালেহা কাদের কথা বলেছেন কান্না চেপে রেখে। তিনি বলছিলেন, ভেতরে আমার কী যে যন্ত্রণা! আমি আল্লাহর কাছে শুধু একটা কথাই বলি, এ তুমি আমাকে কী পরীক্ষার মধ্যে ফেলেছো? তাঁর কাছে ছাড়া আর কার কাছেই বা বলব?’ বাসায় মোজাক্কির এর ব্যবহৃত জিনিস এখনও আগের মতোই আছে। সেগুলোকে ছুঁয়ে স্পর্শের বাইরে চলে যাওয়া ছেলেকে নিরন্তর খোঁজে ফেরেন মা সালেহা কাদের। তাঁর বেদনার্ত স্মৃতিচারণে উঠে আসে সন্তান হারানোর অব্যক্ত বেদনাবিধুর অনুভূতি।
প্রথম নৌবাহিনী হেলিকপ্টার কুচকাওয়াজে সে নেতৃত্বে দেয় যেখানে প্রধানমন্ত্রী উপস্থিত ছিলেন। সে সময় মিশু অসুস্থ ছিল। আমি জানতাম না। সে আমাকে একটু স্যুপ রান্না করে দিতে বললে আমি করে দিই। স্যুপ হাতে নিয়ে বলল, খেতে ইচ্ছা করছে না। খুব একটা গুরুত্ব দিলাম না। ভাবলাম হয়তো কোন কারণে খেতে ইচ্ছা করছে না। বললাম, খারাপ লাগলে আগামীকালের কুচকাওয়াজে যাওয়ার দরকার নেই। সে বলল, মা আমাকে যেতেই হবে। সব কিছু আমার জন্য প্রস্তুত করা, ওভাবেই সাজানো। আমাকে নেতৃত্ব দিতে হবে। পরদিন সফলভাবে সে তার কাজ করলো। সেখানে আমিও ছিলাম। এক ফাঁকে খেয়াল করলাম, তাকে খুব ফ্যাঁকাসে লাগছে। মুখটা কেমন শুকনো লাগছে। ভাবলাম প্রশিক্ষণ এবং টেনশনে হয়তো এমন হতে পারে। একইদিন আমরা বাহিরে খেতে গেলাম। সেখানেও সে কিছুই খেতে পারলো না। জানতাম চাইলাম, কী হয়েছে বাবা? বললো, মা বেশ কদিন ধরে কিছুই খেতে ইচ্ছা করছে না। আমি কালক্ষেপণ না করেই সেদিনই তাকে নিয়ে ডাক্তারের শরণাপন্ন হলাম। শরীরের চমৎকার গঠন দেখে ডাক্তার কোন পরীক্ষা না দিয়ে কিছু গ্যাস্ট্রিকের ঔষধ দিলেন। আমি তাকে তিন মাসের ঔষধ কিনে দিলাম। সেদিন সে চট্টগ্রাম চলে গেল। ছেলের এই অবস্থা দেখে মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে যায়। ২৫ ডিসেম্বর বন্ধে আমি তাকে দেখতে চট্টগ্রাম যাই।
সেদিন সবাই কক্সবাজার বেড়াতে যাই। মোজাক্কির বললো, কিছুক্ষণ এর মধ্যে হেলিকপ্টার নিয়ে কক্সবাজার যাচ্ছি। তোমরা খেয়াল করিও। মনটা ভালো ছিলনা বলে আমি একদিন পর চট্টগ্রামে ফিরে আসি। রাতে আমাদের সবাইকে নিজে ড্রাইভ করে বোর্ড ক্লাবে খাওয়াতে নিয়ে যায়। সবাই তাদের পছন্দের খাবার খাচ্ছে কিন্ত আমি কিছুই খেতে পারছিনা। ছেলেটার কী হইছে-এই চিন্তা আমাকে অস্থির করে তুলছে! আমি বার বার মিশুর দিকে তাকাচ্ছিলাম। সে আমার পছন্দের খাবারের অর্ডার দিল। আমি খাবারে মন দিতে পারছিনা। হঠাৎ সে ওয়াশরুমে যাচ্ছিলো, আমি তার পিছু নিই। বের হবার পর জিজ্ঞেস করলাম, কী হইছে বাবা? বললো, শরীরটা ভালো লাগছেনা মা। দেরী না করে হাসপাতালে নিয়ে গেলাম। সেখানে সে বমি করল। এন্ডোসকপি করানো হলো। খেয়াল করলাম, ছেলের বৌ কান্না করছে। আমার সামনে কান্না করার জন্য বৌমা মিশু ল্যাব থেকে বের হয়ে বৌকে বকাঝকা করছিল। মোজাক্কির ডাক্তারকে জিজ্ঞাস করল, কী হইছে বলেন? আমরা সৈনিকরা প্রতিদিন মৃত্যুকে সাথে নিয়েই বের হই, মৃত্যুকে আমরা ভয় পাই না। বলেন, আমার কী হয়েছে। এদিকে বৌয়ের কান্না দেখে এক অজানা আতঙ্ক আমাকে ঘিরে ধরে। তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তে ঢাকায় চলে আসি।
ঢাকায় সিএমএইচ-এ নিয়ে যায়। প্রয়োজনীয় টেস্ট এবং বায়োপসি করতে দেয়া হলো। পাঁচটি জায়গায় বায়োপসি করতে দেয়া হলো। কদিন পর দুটো বায়োপসি রিপোর্ট পাওয়া গেলো। পাশাপাশি সিঙ্গাপুরে দুটি হাসাপাতালের এ্যাপোয়েনমেন্ট নিয়ে রাখা হয়েছে। আমি নৌ বাহিনীর প্রধানের সাথে দেখা করি। তিনি বললেন, আন্টি মোজাক্কির আমাদের শ্রেষ্ঠ অফিসার, গৌরব আমাদের অহংকার। বলেন, আপনি কী চান আমার কাছ থেকে। বললাম, আমি টিকিট করেছি রাতের জন্য। আপনি জাস্ট আমাদের ভিসার ব্যবস্থা করে দিন। তিনি দুই ঘন্টার মধ্যে ভিসা করে দিলেন। এই ব্যয়বহুল চিকিৎসার খরচ যোগাতে মোজাক্কির এর কোচ ম্যাটরা এগিয়ে আসলো। কখনও তা ভুলার নয়। আমি সব টাকা পয়সা জোগাড় করলাম। বিভিন্ন জনের কাছ থেকে ধার করেছি। নেভী পাঁচ লাখ দিয়েছে। তার ব্যাচমেটরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে অনেক টাকা সংগ্রহ করে দেন। মোজাক্কির এর নাম শুনে যে যেভাবে পেরেছে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। সেনাবাহিনী, বিমানবাহিনী থেকে যারা তাকে চেনে সিনিয়র-জুনিয়র সবাই এগিয়ে আসলো। আমি তাদের টাকা নিতে চাইনি। ভাবলাম হয়তো এতো টাকা লাগবে না কিন্তু তারা আমাকে অনেক টাকার দরকার জানিয়ে দিলো। ওদের স্বতঃস্ফূর্ততা দেখে আমি না করতে পারিনি। সিঙ্গাপুর ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি হসপিটালে নিয়ে গেলাম। সেখানে সিটিস্ক্যান করানো হলো। ডাক্তার বললেন, খুব একটা ভালো লাগছেনা। যা করার তাড়াতাড়ি করতে হবে। যদি পাকস্থলির বাইরে জীবাণু না ছড়াই তাহলে এখনই অপারেশন করাতে হবে। তারা মিশুকে বললেন, তুমি লাকি। বাইরে ছড়াইনি।
এ কথা শুনে খুব রিলাক্সড মুডে মোজাক্কির ওটিতে গেলো। অনেক বাঙ্গালী আসলো খাবার নিয়ে। এ্যাম্বাসী থেকে লোক আসলো। সবাই খবর নিচ্ছে। সেখানকার স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের একজন সিনিয়র অফিসার আমার জন্য খাবার নিয়ে এলো। সফল অপারেশন হলো। অপারেশন শেষে তাকে ঢাকায় নিয়ে আসলাম। ডাক্তাররা বললেন, ছয়টি কেমো দিতে হবে। ক্যান্সারের জীবাণু যেন কোথাও সুপ্ত অবস্থায় না থাকে সেজন্য এই কেমো দিতেই হবে। ২১ দিন পর পর ৫টি কেমো দেয়া হলো। ৬ নং কেমো দেয়ার আগে মোজাক্কির এর পেটে পানি জমে গেলো। প্রচন্ড ব্যথায় কাতরাচ্ছে সে। দ্রুত সিএমএইচ এ নিয়ে গেলাম। তারা দেখে বললেন, আবার সমস্যা দেখা দিয়েছে। পানিতে আবার জীবাণু দেখা যাচ্ছে। শুনে আমি নির্বাক হয়ে গেলাম। ডাক্তার বললেন, কেমোর ধরণ পরিবর্তন করতে হবে। এ অবস্থায় বিশ্বের সেরা চিকিৎসা নিলেও বড়জোড় এক বছর বাঁচানো সম্ভব হবে।
আমি সৃষ্টিকর্তায় বিশ্বাসী। আমার দৃঢ় বিশ্বাস-আল্লাহ অবশ্যই আমার ছেলেকে বাঁচিয়ে রাখবেন। আমার ভাই ফজলুল কাদের তার ছেলের চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুর গেলে তার সাথে বিষয়টি শেয়ার করি। শুনে সে পাগলের মতো হয়ে গেল। বিভিন্ন জায়গায় সে খোঁজখবর নিলো। সব জায়গায় সবাই বললো, বড়জোড় এক বছর বাঁচতে পারে। এক পর্যায়ে ভাই খবর পেলো ভিয়েতনামে ভালো চিকিৎসা আছে। সেখানে জাপান-ভিয়েতনাম ফ্রেন্ডশিপ হসপিটালের অনেক সুনাম। ইতিমধ্যে অনেক রোগী ভাল হয়েছে। স্কাইফিতে ডাক্তারের সাথে কথা বললাম। তারা সাহস দিলেন। ১৬ জুন ২০১৭ দ্রুত ভিয়েতনাম চলে যাই।
সর্বশেষ একটা পরীক্ষা ছিল যেটা বাংলাদেশে করা হয়েছিল। ভিয়েতনামের ডাক্তার বলছিলেন, ওই পরীক্ষার রেজাল্ট যদি নেগেটিভ হয় তাহলে বাঁচার সম্ভাবনা নেই। দুর্ভাগ্যক্রমে সেটা ছিল নেগেটিভ। ডাক্তাররা সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করলেন। যে কেমো দেয়ার কথা ছিল সেটা না দিয়ে ২৬ জুন ২০১৭ অন্য কেমো দেয়া হলো। ধীরে ধীরে তার শরীর আরও খারাপ হতে লাগল। ২ জুলাই তার শরীর ভীষণ খারাপ হলো। দিনটি ছিল ঈদের দিন। দেশ থেকে একটা পাঞ্জাবী নিয়েছিলাম সেটা পরে মোজাক্কির নামাজ পড়লো। যতই ব্যস্ত থাকুক মোজাক্কির কখনও নামাজ ত্যাগ করেনি। ২ জুলাই রাতে শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল। ভাবছিলাম হয়তো স্বাভাবিক, ঠিক হয়ে যাবে।গভীর রাতে ডাক্তার তাকে শ্বাসের মাস্ক দিলেন। মোজাক্কির ইশারায় কাগজ-কলম চাইলো। সে লিখলো- একটা শার্ট, প্যান্ট আর জুতা দিতে। বিষয়টি আমি ঠিক বুঝিনি। নিজেকে খুব অসহায় লাগছিলো। ইচ্ছা করছিলো, চিৎকার করে কান্না করি। চোখের জল তো অনেক আগেই শুকিয়ে গেছে। এক দৃষ্টিতে মোজাক্কিরের দিকে তাকিয়ে থাকি। মনে মনে আল্লাহকে ডাকছিলাম।
হঠাৎ মোজাক্কির বলল, আই অ্যাম সরি মা, ইট ওয়াজ অ্যা ড্রিম। আমি ডাক্তার ডাকি। ডাক্তার বলছিলেন, ব্রিথ স্লোলি মিশু…।
তারপর একটু ঘুমিয়েছিল। হঠাৎ জেগে উঠে বললো, একটা স্বপ্ন দেখেছি মা। বিরাট একটা দুর্ঘটনা ঘটেছে। আমি বললাম, ওসব কিছু না, বাদ দাও। তুমি ঘুমাও। আমার ভিতরটা ভীষণ মোচড় দিয়ে উঠলো। আমি বুঝতে পারিনি যে, তখন মোজাক্কির আমাকে ছেড়ে চিরতরে চলে যাচ্ছে। আমি তাকে জড়িয়ে ধরলাম। বার বার বলছিলাম তুমি ভালো হয়ে যাবে।
ডাক্তার আমাকে ডেকে বললেন, কৃত্রিম শ্বাস-প্রশ্বাস যন্ত্র ( ভেনটিলেশন যন্ত্র ) না দিলে রাত্রে বাঁচানো যাবে না। মুখে কিছুই বলতে পারলাম না। শুধু মাথা নাড়লাম। মুখে নল ঢুকিয়ে কৃত্রিম শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যবস্থা করা হলো। সে বারবার সেটা খুলে ফেলতে চেয়েছিল। নার্স তার হাত ধরে রাখলো। কিছুক্ষণ পর আর নড়াচড়া করলোনা। একজন ডাক্তারকে স্পেশাল পে করব বলে পাশে বসিয়ে রাখলাম।
জুলাই ৩, ২০১৭ সোমবার সকাল ১০টা ১৩ মিনিট, বাংলাদেশ সময় সকাল ৯টা ১০মিনিট। চলে গেলো মোজাক্কির। পুরো শরীর অবশ হয়ে আসছিল আমার। শরীরের সমস্ত শক্তি সঞ্চয় করে কানের কাছে ঝুঁকে কালেমা এবং তওবা পড়ালাম। শরীর কাঁপছে; চোখ দিয়ে অজোরে পানি ঝরছে। নির্বাক আমি ছেলের মুখ পানে চেয়ে থাকলাম!
স্বজন ও সহকর্মীরা হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে গ্রহণ করেন মিশুর নিথর দেহ। সবাই আশাবাদী ছিলেন, মৃত্যুকে আরেকবার পরাজিত করে সুস্থ শরীরে ভিয়েতনাম থেকে ফিরে আসবেন সকলের প্রিয় মোজাক্কের। কিন্তু সবার দোয়া, শুভ কামনা ও চিকিৎসকদের সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে অনন্ত যাত্রার পথে বাংলাদেশের কোলে ফিরেছেন মোজাক্কির হোসেন খান মিশু। ৫ জুলাই প্রচুর মানুষের উপস্থিতিতে জানাযা শেষে সামরিক মর্যাদায় বাদ আসর বনানী কবরস্থানে দাফন করা হলো।
বর্ণাঢ্য কর্মময় জীবন
২০০২ সালের ১১ জুলাই বাংলাদেশ নৌবাহিনীতে অফিসার ক্যাডেট হিসেবে যোগ দেন লেঃ কমান্ডার এম. মোজাক্কির হোসেন খান। প্রশিক্ষণ চলাকালে অসাধারণ দক্ষতার জন্য নেভাল একাডেমীতে তাকে ক্যাডেট ক্যাপ্টেন পদে নিযুক্ত করা হয়। এরপর ২০০৪ সালের ১ জুন নির্বাহী শাখাতে কমিশন লাভ করেন। তারই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ নেভীতে সাব লেফট্যানেন্ট এ পদোন্নতি লাভ করেন। ক্যাডেট প্রশিক্ষণে অসামান্য ফলাফলের জন্য মোজাক্কির সম্মানসূচক শ্রেষ্ঠ প্রশিক্ষণনার্থীর স্বীকৃতি লাভ করেন এবং তার ব্যাচে প্রথম স্থান লাভ করেন। ২০০৪ সালে কমিশন লাভের পর তিনি BNS ISSA Khan Chittagong,BNS Shaheed Moazzam Kaptai এবং BNS Titumir খুলনায় প্রাথমিক অফিসার কোর্স সম্পন্ন করেন। মৌলিক কোর্স সমূহের মোজাক্কির মেধাতালিকায় ৮০ শতাংশেরও বেশি নম্বর পেয়ে প্রথম স্থান ধরে রাখেন। কোর্স শেষে তিনি BNS Ali haidar এ নাবিকের দায়িত্ব পালন করেন। সমুদ্র পাহারায় থাকাকালীন তিনি একটি সম্মেলনে যোগ দিতে ওমান ভ্রমণ করেন। সফলতার সাথে পর্যবেক্ষণ কোর্স সমাপ্তির পর পুরস্কার হিসেবে তিনি সাব লেফট্যানেন্ট হিসেবে পদোন্নতি লাভ করেন। এরপর তিনি রণতরী কর্মকর্তা হিসেবে BNS (Meghna) তে যোগ দেন।
ছোটবেলা থেকে পাইলট হওয়ার স্বপ্ন ছিল তার। বন্ধুদের সাথে আড্ডায় তার স্বপ্নের কথা বলতেন। একদিন তার স্বপ্ন পূরণের সুযোগ আসে। বাংলাদেশ নৌবাহিনীতে একটি বিমান উড্ডয়ন শাখা গড়ে তোলার এবং বৈমানিক হিসেবে কিছু মেধাবী তরুণদের প্রশিক্ষিত করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। অতীতের সকল কোর্সের সফল সম্পন্নকারী এবং অসাধারণ পেশাদারী রেকর্ডের জন্য মোজাক্কির উর্দ্ধতন কর্মকর্তাদের পছন্দের তালিকায় শীর্ষে ছিলেন। একজন পাইলট হিসেবে আত্মপ্রকাশের জন্য প্রশিক্ষণের জন্য তিনি বাংলাদেশ এয়ার ফোর্স এ যোগ দেন।
স্বপ্ন পূরণে নিজেকে সম্পূর্ণ সঁপে দেন তিনি। তার আগ্রহ এবং সদিচ্ছা তাকে তার লক্ষ্যে পৌঁছাতে সহায়তা করে। অসংখ্য বিমান বাহিনী অফিসারদের মধ্যে একজন নেভী অফিসার হয়েও তিনি সর্বোচ্চ নাম্বার অর্জন করেন। প্রশিক্ষণ শেষে ২০০৯ সালে নির্বাহী অফিসার হিসাবে খুলনা নেভাল BNS (Doulat) এ নিযুক্ত হন।
এরই মধ্যে ২০১০ সালে বিমান বাহিনীর পাইলট প্রশিক্ষণে যোগ দেন। কোর্স শেষে একই বছর কৃতিত্বপূর্ণ ফলাফলের জন্য একজন যোগ্য হেলিকপ্টার পাইলট হিসেবে কৃতিত্ব অর্জন করেন। ২০১০ সালে তিনি নেভাল অ্যাসোসিয়েশনে যোগ দেন।
মোজাক্কির বেশ কিছু পরিকল্পনা হাতে নিয়েছিলেন নেভাল অ্যাসোসিয়েশনের উন্নয়নে। শিশু সংস্থাগুলোর উন্নয়নের জন্য রাত-দিন পরিশ্রম করেন তিনি। এসময় নেভী সিদ্ধান্ত নেয় ইটালি থেকে দুটি অড ১০৯ Helicopter কেনার। চৌকষ পাইলট মোজাক্কিরকে ইতালী পাঠানো হয় অড ১০৯ Helicopter এর প্রশিক্ষণের জন্য। প্রশিক্ষণ শেষে তিনি এই বিশেষ হেলিকপ্টারের স্পেশাল পাইলট হিসেবে স্বীকৃতি পান। ২০১১ সালে দুটি মডার্ন এয়ারক্রাপট আনা হয় বাংলাদেশে । এতে বাংলাদেশী পাইলট হিসেবে মোজাক্কির সর্বপ্রথম এই দুটি মডার্ন এয়ারক্রাপট আকাশে উড্ডয়ন করেন।
২০১৬ সালে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে যান হেলিকপ্টার প্রশিক্ষক Qualified Helicopter instructor(QHI) কোর্স করতে। সফলভাবে কোর্স শেষ করে তিনি প্রথম বাংলাদেশী AW ১০৯ Helicopter flying instructor হিসেবে তালিকাভুক্ত হন। একসময় তিনি বাংলাদেশ নেভীর অনভিজ্ঞদের প্রশিক্ষণ দিতেন এবং তাদেরকে নিজের মতো করে গড়ে তুলতে সর্বাত্মক চেষ্টা করেন। পরবর্তীতে ২০১৪ এবং ২০১৬ সালে পানিগর্ভে হেলিকপ্টার সুরক্ষা প্রশিক্ষণে তিনি মালয়েশিয়া যান। এটা এমন একটি প্রশিক্ষণ ছিল যেখানে তিনি শেখেন সমুদ্রে হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত হলে কিভাবে পানি থেকে উত্তরণ ঘটাতে হয়। বিদেশি প্রশিক্ষণদাতাদের কাছ থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে মোজাক্কির দ্রুত দক্ষ হয়ে উঠে। তাঁর মৃত্যুর চার বছর কেটে গেছে। ক্ষণস্থায়ী জীবনে নানা অর্জন আর যুগান্তকারী কর্মের সুচনা করে গেছেন মিশু। যদিও অবেলায় তাঁর প্রয়াণে দেশ হারিয়েছে এক সূর্য সন্তানকে। প্রাণ প্রদীপ নিভে গেছে ঠিকই নিয়তির ডাকে সাড়া দিয়ে মৃত্যুকে করেছে বরণ। কিন্তু মিশু বেঁচে আছে তাঁর আলোক বিচ্ছুরিত শিখায়। তাঁর স্মৃতি চির জাগুরুক মহীয়সী মায়ের হৃদয়ে। মহান আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামিন মিশুকে জান্নাতবাসী করুন। আমীন।







