মিয়ানমার জান্তা বাহিনীর মুহুর্মুহু বিমান হামলায় কেঁপে উঠছে টেকনাফ-উখিয়া সীমান্ত, রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ রোধে বিজিবি ও কোস্টগার্ডের কঠোর পাহারা
মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের মংডু টাউনশিপে ক্ষমতাসীন সরকারি জান্তা বাহিনীর সঙ্গে সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান আর্মির (এএ) লড়াই এখন চরম আকার ধারণ করেছে। আরাকান আর্মির বিভিন্ন অবস্থানকে লক্ষ্য করে জান্তা বাহিনী যুদ্ধবিমান থেকে অনবরত ও তীব্র বিমান হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। গতকাল রাতভর মংডু সীমান্তে যুদ্ধবিমান থেকে ছিটকে আসা একের পর এক শক্তিশালী বোমার বিকট শব্দ এবং গোলাবর্ষণের তীব্র আওয়াজে কেঁপে উঠেছে বাংলাদেশের টেকনাফ ও উখিয়ার সীমান্ত এলাকাগুলো। ওপারে এই সংঘাত ও অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার পর নতুন করে বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের ঢোকার প্রবল আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। উদ্ভুত এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় এবং সীমান্ত সুরক্ষিত রাখতে নাফ নদীসহ পুরো সীমান্তজুড়ে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও কোস্টগার্ডের টহল তৎপরতা বহুগুণ জোরদার করা হয়েছে।
আজ বৃহস্পতিবার দুপুর থেকে শুরু করে বিকেল পর্যন্ত টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপ, হ্নীলা, হোয়াইক্যং এবং নেটংপাড়া সীমান্ত এলাকাগুলোতে সরেজমিনে এক থমথমে ও থমকে যাওয়া পরিস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে। থমথমে অবস্থার কারণে সীমান্তে স্থানীয় সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক চলাচল অনেকটাই সীমিত হয়ে এসেছে। নাফ নদীতে নিয়োজিত স্থানীয় জেলেরা অত্যন্ত সতর্কতা ও ভয়ের সঙ্গে মাছ ধরার কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। সীমান্ত নিরাপত্তার খাতিরে পুরো এলাকাজুড়ে বিজিবি এবং কোস্টগার্ডের অতিরিক্ত সদস্য মোতায়েন ও কঠোর টহল দিতে দেখা গেছে।
সীমান্তবর্তী বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে জানা গেছে, রাখাইন রাজ্যের বর্তমান রাজধানী সিত্তে (আকিয়াব) এলাকা থেকে জান্তা বাহিনীর যুদ্ধবিমানগুলো আকাশে উড়ে আসছে। এরপর সেখান থেকে প্রায় ৯০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত মংডু এলাকায় আরাকান আর্মির ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে একের পর এক হামলা চালিয়ে আবার ঘাঁটিতে ফিরে যাচ্ছে। প্রতিটি হামলার সময় একসঙ্গে অন্তত পাঁচ থেকে ছয়টি অতি শক্তিশালী বোমা নিক্ষেপ করা হচ্ছে। এসব বোমা বিস্ফোরণের তীব্রতা এতটাই বেশি যে নাফ নদীর এপারে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে থাকা সাধারণ মানুষের ঘরবাড়ি পর্যন্ত তীব্রভাবে কেঁপে উঠছে।
বিভিন্ন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, গতকাল বুধবার রাত সোয়া ৯টার দিকে মংডু টাউনশিপে জান্তা বাহিনীর এই তীব্র বিমান হামলা শুরু হয়। রাত সোয়া ১১টা পর্যন্ত চলা টানা দুই ঘণ্টার এই অভিযানে দুটি যুদ্ধবিমান থেকে অন্তত ২৭ বার বোমাবর্ষণ ও হামলা চালানো হয়েছে। জান্তা বাহিনীর এই আক্রমণের মুখে আরাকান আর্মিও বসে থাকেনি, তারাও পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে তুলে জবাব দিয়েছে। টেকনাফ সীমান্তের বাসিন্দারা ওপারে ঘটা এই যুদ্ধের আগুনের তীব্র ঝলকানি এবং বিকট বিস্ফোরণের শব্দ স্পষ্টভাবে দেখতে ও শুনতে পেয়েছেন।
এই বিষয়ে উখিয়া-৬৪ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল জহিরুল ইসলাম সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, গতকাল রাতের বেলা রাখাইনের ভেতরে তীব্র বিমান হামলার বিকট শব্দ শোনা গেলেও আজ সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত নতুন করে তেমন কোনো বড় ঘটনা ঘটেনি। সীমান্ত পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে এবং কঠোর নজরদারির মধ্যে রাখা হয়েছে। ওপার থেকে কোনোভাবেই যেন নতুন করে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ ঘটতে না পারে, সে জন্য নাফ নদীতে অতিরিক্ত টহল দল মোতায়েন করা হয়েছে। আজ বিকেল পর্যন্ত বাংলাদেশের সীমান্তে কোনো গুলি এসে পড়ার বা কোনো ধরনের অনুপ্রবেশের ঘটনা ঘটেনি।
এদিকে সবրան্দ ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আবদুল মান্নান এবং হোয়াইক্যং ইউপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মো. শাহজালাল চৌধুরী একই ধরণের আশঙ্কার কথা প্রকাশ করেছেন। তারা জানান, ওপারের সংঘাত যদি সামনের দিনগুলোতে আরও বৃদ্ধি পায়, তবে বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গারা দলে দলে পুনরায় বাংলাদেশে প্রবেশ করার মরিয়া চেষ্টা চালাতে পারে।
উখিয়া এলাকার একটি রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরের অন্যতম নেতা মো. জুবায়েরের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মিয়ানমারে জান্তা বাহিনীর এই ভয়াবহ বিমান হামলায় অসংখ্য ঘরবাড়ি মাটির সঙ্গে মিশে গেছে এবং কয়েক হাজার রোহিঙ্গা নতুন করে বাস্তুচ্যুত হয়ে পড়েছেন। একই সময়ে আকাশপথের পাশাপাশি স্থলপথেও আরাকান আর্মির সঙ্গে আরও তিনটি রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠীর তুমুল সংঘর্ষের খবর পাওয়া যাচ্ছে। বহুমুখী এই সংঘর্ষের কারণে রাখাইনের সার্বিক পরিস্থিতি আরও বেশি জটিল ও অস্থিতিশীল হয়ে উঠছে। যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী বা তীব্র হলে এই বিপুল সংখ্যক বাস্তুচ্যুত মানুষ কোনো উপায় না পেয়ে আশ্রয়ের খোঁজে বাংলাদেশের দিকে ধাবিত হতে পারে বলে তিনি বড় ধরণের আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
পরিসংখ্যান ও পূর্বের ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যায়, ২০২৩ সালের ৮ ডিসেম্বর থেকে শুরু হওয়া দীর্ঘ ১১ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর রাখাইন রাজ্যের মংডু, বুথিডং এবং রাথেডংসহ প্রায় ৮০ শতাংশ অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিয়ে নেয় আরাকান আর্মি। বর্তমানে শুধুমাত্র রাজধানী সিত্তে এলাকাটি মিয়ানমারের সরকারি জান্তা বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। সীমান্ত সূত্রগুলোর দাবি, সাম্প্রতিক সময়ে মংডু অভিমুখে পরিচালিত সবকটি বিমান হামলা মূলত এই সিত্তে রাজধানী থেকেই নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা করা হচ্ছে।
মিয়ানমারভিত্তিক বেশ কয়েকটি স্থানীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, গতকাল বুথিডং টাউনশিপের একটি মুসলিম অধ্যুষিত গ্রামে জান্তা বাহিনীর বিমান হামলায় ব্যাপক বেসামরিক হতাহতের ঘটনা ঘটেছে এবং সেখানে অন্তত ১০টি বসতবাড়ি সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর আগেও গত ১৭ এবং ২৪ জুন মংডু ও কিয়াউকতাও এলাকায় পৃথক দুটি বিমান হামলা চালিয়েছিল মিয়ানমার সেনাবাহিনী, যেখানে বেশ কিছু সাধারণ নাগরিক হতাহত হন।
সীমান্তের সার্বিক নিরাপত্তা প্রসঙ্গে টেকনাফ-২ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল হানিফুর রহমান ভূঁইয়া স্পষ্ট করে বলেছেন, সীমান্তের প্রতিটি পয়েন্টে পরিস্থিতি সার্বক্ষণিকভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। কোনো ধরনের শিথিলতা না রেখে নাফ নদী ও সীমান্ত এলাকায় নিয়মিত টহল এবং গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।
একই সুর শোনা গেছে স্থানীয় প্রশাসনের কণ্ঠেও। টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এস এম মো. অনীক চৌধুরী জানিয়েছেন, আজ দিনভর সীমান্ত এলাকার পরিস্থিতি স্বাভাবিক ও শান্ত ছিল। তবে যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় সীমান্তে বিজিবি ও কোস্টগার্ড সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে থেকে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে।







