সমর্থকদের মুহুর্মুহু স্লোগান ও অশ্রুতে সাবেক মন্ত্রী মোশাররফের শেষ বিদায়

অর্ধশতাব্দীর বেশি সময় ধরে চট্টগ্রামের রাজনীতির মাঠ দাপিয়ে বেড়ানো সাবেক মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন অধ্যায় শেষ হলো। চট্টগ্রামের উন্নয়নে অসামান্য অবদান রাখা সাবেক এই মন্ত্রীকে মুহুর্মুহু স্লোগান ও অশ্রুসজল চোখে শেষ বিদায় জানালেন তাঁর কর্মী-সমর্থকেরা। আজ বৃহস্পতিবার (১৪ মে) বেলা ১১টায় নগরীর জমিয়াতুল ফালাহ ময়দানে জানাজার মাধ্যমে তাঁকে এই বিদায় জানানো হয়।

জানাজার আগে অগণিত মানুষের উপস্থিতি, কান্না আর স্মৃতিচারণায় ভারী হয়ে ওঠে চট্টগ্রামের জমিয়াতুল ফালাহ জাতীয় মসজিদ মাঠ। বীর মুক্তিযোদ্ধা, ছয়বারের সংসদ সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের জানাজায় শেষ শ্রদ্ধা জানাতে সেখানে ভিড় করেন নানা শ্রেণি-পেশা ও রাজনৈতিক মতাদর্শের মানুষ। উপস্থিত হন সিটি মেয়র বিএনপি নেতা ডা. শাহাদাত হোসেন। প্রিয় নেতাকে শেষবারের মতো দেখতে এসে অনেকেই চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি। কারও হাতে ছিল ফুল, কারও চোখে দীর্ঘদিনের স্মৃতির ভার। জানাজায় মানুষের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো।

জানাজা শেষ হতেই মরদেহ নিয়ে রাখা হয় অ্যাম্বুলেন্সে। তখন মাঠের চারপাশ থেকে হাজারো সহযোদ্ধা, রাজনৈতিক সহচর ও অনুসারীরা অ্যাম্বুলেন্স ঘিরে স্লোগান দেন। স্লোগানে স্লোগানে বিদায় জানানো হলো রণাঙ্গনের সেনানী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনকে। স্লোগান উঠে ‘বীর চট্টলার মোশাররফ ভাই, আমরা তোমায় ভুলি নাই’; ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’। এ সময় পুলিশ সদস্যরা মাঠের মূল ফটকে দাঁড়িয়ে ছিলেন। অ্যাম্বুলেন্সটি মিরসরাইয়ের ধুম গ্রামের উদ্দেশে রওনা হয়।

জানাজায় বক্তব্য দিতে গিয়ে চট্টগ্রাম সিটির মেয়র বিএনপি নেতা শাহাদাত হোসেন বলেন, ‘ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের রাজনৈতিক জীবন ছিল বর্ণাঢ্য। বৃহত্তর চট্টগ্রামের জন্য অনেক অবদান রেখেছেন সাবেক এই মন্ত্রী। আমি মহানগর বিএনপির, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন এবং মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে গভীর শোক প্রকাশ করছি। উনার অবদানের জন্য চট্টগ্রামবাসী উনাকে সব সময় স্মরণে রাখবেন।’

আরও পড়ুন:  সাবেক মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন মারা গেছেন

উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের (কার্যক্রম নিষিদ্ধ) সাধারণ সম্পাদক শেখ আতাউর রহমান বলেন, ‘একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে তাঁর ভূমিকা চিরদিন মনে রাখতে হবে। তিনি আমাদের মাঝ থেকে হারিয়ে গেছেন। মোশাররফ ভাই উন্নয়ন-অগ্রগতির মডেল।’

বৃহস্পতিবার চট্টগ্রামের জমিয়াতুল ফালাহ মসজিদ মাঠে বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ, আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য, সাবেক মন্ত্রী ও মুক্তিযোদ্ধা ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের দ্বিতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। ছবি: আজকের পত্রিকা
বৃহস্পতিবার চট্টগ্রামের জমিয়াতুল ফালাহ মসজিদ মাঠে বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ, আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য, সাবেক মন্ত্রী ও মুক্তিযোদ্ধা ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের দ্বিতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। ছবি: আজকের পত্রিকা

সাবেক সিটি মেয়র মাহমুদুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, চট্টগ্রামের ইতিহাসে মোশাররফ হোসেন এক অবিস্মরণীয় নাম হয়ে থাকবে। রাজনীতিতে তাঁর মতো বর্ণাঢ্য চরিত্র খুব কমই আছে। মুক্তিযুদ্ধের প্রথম কাতারের নেতা তিনি। চট্টগ্রামের উন্নয়নে উনার ভূমিকা অনেক বড়। তিনি মানুষের কল্যাণে কাজ করে গেছেন। রাজনীতিবিদ হিসেবে উনি কেমন, আজকের এই দিনে এমন জানাজা তা প্রমাণ করে বলেও জানান সাবেক এই সিটি মেয়র ও জাতীয় পার্টির নেতা।

বাবার ব্যাপারে মোশাররফ হোসেনের সন্তান সাবেদুর রহমান বলেন, ‘দেশের উন্নয়নে উনি কাজ করেছেন। সবাই আমার বাবার জন্য দোয়া করবেন। আজকে মাননীয় মেয়রসহ দল-মতনির্বিশেষে সকলের প্রতি আমরা কৃতজ্ঞ। উনার দীর্ঘ পথচলায় কারও মনে কষ্ট দিয়ে থাকলে ক্ষমা করে দেবেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই জানাজা আয়োজনে সহযোগিতার জন্য।’

শ্রদ্ধা জানান সিপিবি নেতা মোহাম্মদ শাহ আলম, ন্যাপ-কমিউনিস্ট পার্টি, ছাত্র ইউনিয়ন, মিরসরাই অ্যাসোসিয়েশনসহ বিভিন্ন সংগঠনের নেতারা। জানাজায় জামায়াত নেতা ও চট্টগ্রাম-৯ (কোতোয়ালি) আসন থেকে প্রার্থী হওয়া ডা. ফজলুল হকসহ আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ, বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় পার্টি, সিপিবিসহ বিভিন্ন দলের নেতা-কর্মীরা যোগ দেন। জমিয়াতুল ফালাহ মসজিদে জানাজা শেষে তাঁকে মিরসরাই গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে আরও এক দফা জানাজা অনুষ্ঠিত হয়।

আরও পড়ুন:  ওবায়দুল কাদের ও সাবেক ১৩ সচিবের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা

মিরসরাইয়ে দাফনের আগে গার্ড অব অনার দেওয়া হয় এই বীর মুক্তিযোদ্ধাকে। রাজনৈতিক ভিন্নতা থাকলেও প্রবীণ এই নেতার মৃত্যুতে সব মহলে নেমে আসে শোকের ছায়া।

তথ্যমতে, ১৯৪৩ সালের ১২ জানুয়ারি চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার ধুম গ্রামে মোশাররফ হোসেনের জন্ম। তাঁর বাবা এস রহমান ষাটের দশকে প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য ছিলেন। দেশভাগের পর তিনি কলকাতা চট্টগ্রামে চলে আসেন এবং ‘ওরিয়েন্ট বিল্ডার্স করপোরেশন’ নামে একটি কোম্পানি খুলে ব্যবসা শুরু করেন। মোশাররফ হোসেন চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুল থেকে মেট্রিক এবং স্যার আশুতোষ সরকারি কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট শেষ করেন। লাহোরে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার সময় ছয় দফা আন্দোলনে সম্পৃক্ত হন। সে সময় তিনি পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র পরিষদের সভাপতির দায়িত্বও পালন করেন। লাহোর থেকে দেশে ফিরে তিনি আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে যোগ দেন এবং ১৯৭০ সালে পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। এই মুক্তিযোদ্ধা ১ নম্বর সেক্টরের সাবসেক্টর কমান্ডার ছিলেন। যুদ্ধের সময় বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অপারেশনের নেতৃত্ব দেন তিনি। ১৯৭২ সালের সংবিধান প্রণেতাদের অন্যতম মোশাররফ হোসেন স্বাধীনতার পরে চট্টগ্রামের মিরসরাই আসন থেকে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে ১৯৭৩, ১৯৮৬, ১৯৯৬, ২০০৮, ২০১৪ ও ২০১৮ সালে ছয়বার এমপি হয়েছেন। আমৃত্যু তিনি ছিলেন আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য। আওয়ামী লীগের ১৯৯৬-২০০১ মেয়াদের সরকারে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ছিলেন ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন। পরে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর দায়িত্ব পান। পরে ২০১৪-২০১৯ মেয়াদের আওয়ামী লীগ সরকারেও তিনি গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। চব্বিশের জুলাই আন্দোলনে আওয়ামী লীগের সরকার পতনের পর ওই বছরের ২৭ অক্টোবর রাজধানীর ভাটারা থানা এলাকা থেকে মোশাররফ হোসেনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তাঁকে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে নেওয়া হয়।

আরও পড়ুন:  মঙ্গলবার রাত পর্যন্ত ট্রাভেল পাস চাননি তারেক রহমান: পররাষ্ট্র উপদেষ্টা

পরের বছর ২০২৫ সালের ৫ আগস্ট রাতে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে কারাগারের হাসপাতাল থেকে তাঁকে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। গত ১৪ আগস্ট সব মামলায় জামিন পেয়ে কারাগার থেকে বেরিয়ে আসেন তিনি। এর পর থেকে শ্বাসতন্ত্রের জটিলতাসহ নানা শারীরিক অসুস্থতার কারণে হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন তিনি। গত বুধবার (১৩ মে) সকাল ১০টা ২০ মিনিটের দিকে রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে তাঁর মৃত্যু হয়। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৩ বছর।

ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন তিন ছেলে ও এক মেয়ে রেখে গেছেন। তাঁর ছেলে মাহবুব রহমান রুহেল দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে চট্টগ্রাম-১ আসন থেকে এমপি হয়েছিলেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *