ব্যাংকগুলো ‘খালি হয়ে গেছে’: অর্থমন্ত্রী

অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, আগের সরকারের সময়ে আর্থিক খাতে অনেক বেশি রাজনীতিকীকরণ করার ফলে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো ‘খালি হয়ে গেছে’। অর্থনীতির সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় আওয়ামী শাসনামল থেকে অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসের সময়কালও ‘খুব বেশি যে ভালো’ ছিল না।

শনিবার (২৫ এপ্রিল) বিকালে সচিবালয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরামের (ইআরএফ) সঙ্গে প্রাক-বাজেট আলোচনায় অর্থমন্ত্রী এসব কথা বলেন।

তিনি বলেন, আর্থিক খাতে যে বিশৃঙ্খলাগুলো হয়েছে এগুলো কেন হয়েছে? আর্থিক খাত এত ‘রাজনীতিকীকরণ’ হয়েছে যে ব্যাংকগুলো আজকে খালি হয়ে গেছে। শেয়ার বাজার লুটপাট করায় ফিনিশড হয়ে গেছে। তো এরকম একটা জায়গা থেকে আমরা যখন ফিরে আসতে চাচ্ছি এখন, আমাদের ফিনান্সিয়াল সেক্টরে রেজুলেশনের একটা বিষয় আছে।

ব্যাংকগুলো আন্ডার ক্যাপিটালাইজড হয়ে গেছে

অর্থমন্ত্রী বলেন, ব্যাংকগুলো আন্ডার ক্যাপিটালাইজড হয়ে গেছে। বেসরকারি খাতও আন্ডার ক্যাপিটালাইজড হয়ে গেছে। আপনার ৪০ পারসেন্ট কারেন্সি ডেপ্রিসিয়েশনে নাই। একজন ব্যবসায়ীর যদি ৪০ পারসেন্ট কারেন্সি ডেপ্রিসিয়েশনে চলে যায়, (এর সঙ্গে) ১৪ পারসেন্ট ইনফ্লেশন রেটে চলে গেছে চিন্তা করেন। তার ইরোশন (পুঁজির), তার ক্যাপিটাল ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল ইরোডেড হয়ে গেছে। এই লোকগুলো তো অপারেট করতে পারছে না।

আমির খসরু বলেন, এখানে কিন্তু আন্ডার পারফরম্যান্স করছে (শিল্পগুলো)। যে আন্ডার পারফর্ম করছে এমন ইন্ডাস্ট্রি এবং বিজনেস অনেক বেশি। এজন্য অনেক লোক চাকরি হারাচ্ছে কিন্তু। সুতরাং এদের ক্যাপিটালাইজ (করতে হবে), আমাকে রি-ক্যাপিটালাইজ করতে হবে।

তবে তাদের পুঁজি সহায়তা করার ক্ষেত্রে সরকারের অক্ষমতার বিষয়টি তুলে ধরতে গিয়ে আমির খসরু বলেন, এখন সরকারের তহবিলে আমাদের এত টাকা নেই যে, আমরা এগুলো সব সরকারের তহবিল দিয়ে রি-ক্যাপিটালাইজ করতে পারব।

আরও পড়ুন:  ব্রিটেনে ট্রাম্পকে রাজকীয় সংবর্ধনা

তিনি বলেন, আর বিশেষ করে আমরা ইনহেরিট করেছি- যে অর্থনীতিটা পেয়েছি ওই ‘ডিক্টেটোরিয়াল রেজিম’ থেকে। তারপর গত ১৮ মাসের যেটা পেয়েছি। কোনোটার চেয়ে কোনোটা ‘খুব বেশি যে ভালো তা আমি বলতে পারব না’। এর চেয়ে বেশি বলতে চাই না। সুতরাং সবগুলো দায়িত্ব তো আমাদের কাঁধে।তারপরে এসেছে আপনার মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ। এটা মোকাবিলা করতে হচ্ছে। এই যে বিশাল ঘাটতি সৃষ্টি হয়েছে, খালি আর্থিক খাতে না ফিসকাল সেক্টরেও স্পেস কমে গেছে।

দেশের অর্থনীতি একটা অলিগার্কদের হাতে

অর্থমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি একটা অলিগার্কদের হাতে চলে গিয়েছিল। অর্থাৎ, পৃষ্ঠপোষকতার রাজনীতি হয়ে গিয়েছিল। আজকে বাংলাদেশ যেখানে, যে গর্তের মধ্যে পড়েছি, এটার মূল কারণ হচ্ছে একটা পৃষ্ঠপোষকতা রাজনীতির মাধ্যমে কিছু লোকের কাছে দেশের অর্থনীতি, তাদের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে।

তিনি বলেন, এখন দেশের অর্থনীতি যখন কিছু লোকের হাতে নিয়ন্ত্রিত হয়, এটা অর্থনীতির মধ্যে থাকে না। এটা তখন রাজনৈতিক প্রভাবের মধ্যে যায়, সরকারের নীতিমালা প্রণয়নের মধ্যে প্রভাবিত হয়, সব জায়গাতে হয়। যে কারণে আজকে এখানে এসে দাঁড়িয়েছি। এজন্য এই অলিগার্কিক পৃষ্ঠপোষকতা রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসার জন্য গণতান্ত্রিকায়নের কথা বলছি অর্থনীতিতে। শুধু রাজনীতিকে গণতন্ত্রায়ন করলে তো হবে না, আমাদের অর্থনীতিকে গণতন্ত্রায়ন করতে হবে।

তিনি বলেন, এজন্য একদম প্রান্তিক মানুষের কাছে সরকারের সেবা ও সহযোগিতা পৌঁছে দিতে বিএনপি সরকার ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষি কার্ড দিচ্ছে। একই সঙ্গে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বাজেটে বরাদ্দ বাড়িয়ে ‘ডেমোগ্রাফিক ডেভিডেন্ড’ বাড়াতে কাজ করার পরিকল্পনাও তুলে ধরেন তিনি। যার প্রতিফলন আগামী অর্থবছরেই দেখা যাবে বলে তার ভাষ্য।

আরও পড়ুন:  মায়াবী দ্বীপ: কাপ্তাই হ্রদের বুকে এক নির্মল নির্জনতার নাম

উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর মুদ্রানীতি 

আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে হলে মুদ্রা সরবরাহ সীমিত রাখা জরুরি। অতীতে টাকা ছাপিয়ে ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার কারণে অর্থনীতিতে চাপ তৈরি হয়েছে, যা সুদের হার বাড়িয়েছে এবং বেসরকারি খাতকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। আমরা এমন একটি নীতিতে আছি, যেখানে হাই পাওয়ার মানি বাড়িয়ে বাজারে অতিরিক্ত তারল্য তৈরি করা হবে না। এতে মূল্যস্ফীতি বাড়ে এবং অর্থনীতির ভারসাম্য নষ্ট হয়।

অর্থনীতির বর্তমান চ্যালেঞ্জ তুলে ধরে আমির খসরু বলেন, ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলার অভাব, মুদ্রার অবমূল্যায়ন ও উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে বেসরকারি খাত চাপে রয়েছে। অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান ‘আন্ডার পারফর্ম’ করছে। এছাড়া বিনিয়োগ বাড়াতে ডিরেগুলেশন প্রয়োজন। ব্যবসা করতে এত বাধা থাকলে বিনিয়োগ আসবে না বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে পারলে আয় বেড়ে যায়

স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় কমাতে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণের কথাও তুলে ধরেন অর্থমন্ত্রী বলেন, আউট অব পকেট এক্সপেন্ডিচার বেশি হলে পরিবারের জীবনমান কমে যায়। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে পারলে মানুষের আয় কার্যত বেড়ে যায়।

ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) এবং স্টার্টআপ খাত অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সবচেয়ে বড় এমপ্লয়ার হচ্ছে এসএমই খাত। এ খাতের পাশাপাশি গ্রামীণ কুটিরশিল্প, কারিগর ও সৃজনশীল শিল্প (ক্রিয়েটিভ ইকোনমি) অর্থনীতির মূলধারায় আনতে সরকার কাজ করছে।

আরও পড়ুন:  নুহাশপল্লীতে শ্রদ্ধা-ভালোবাসায় হুমায়ূনকে স্মরণ

টাকা ছাপানোর কথা নাকচ করলেন গভর্নর ও অর্থমন্ত্রী

বাংলাদেশ ব্যাংক টাকা ছাপিয়ে সরকারকে ঋণ দিচ্ছে, সম্প্রতি গণমাধ্যমে এমন সংবাদ প্রকাশিত হয়। তবে, বিষয়টিকে ‘ভিত্তিহীন’ বলে নাকচ করেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান। একই দিনে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীও এ ধরনের খবরকে অস্বীকার করেছেন।

সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে গভর্নর মোস্তাকুর রহমান বলেন, টাকা ছাপানোর বিষয়টি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। বাংলাদেশ ব্যাংক এ ধরনের কোনো নীতি অনুসরণ করছে না।

একই আলোচনায় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীও টাকা ছাপানোর বিষয়টি নাকচ করে বলেন, এ ধরনের নীতি অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর। টাকা ছাপিয়ে স্থানীয় ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার প্রবণতা থেকে অর্থনীতিকে বের করে আনতে হবে। এতে সুদের হার বাড়ে এবং বেসরকারি খাত চাপে পড়ে।

তিনি আরও বলেন, উচ্চমাত্রার মুদ্রা সরবরাহের মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখাই সরকারের মূল নীতি।

একইসঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন, অতীতে রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে অর্থনীতি একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত হয়েছিল, যা এখন পরিবর্তনের পথে রয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *