যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান চলতি সপ্তাহে একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হলেও, বিশ্বজুড়ে ‘অর্থনৈতিক যুদ্ধ’ সম্ভবত দীর্ঘস্থায়ী রূপ নিতে যাচ্ছে। পারস্য উপসাগরের হরমোজ প্রণালীতে তেহরানের কঠোর নিয়ন্ত্রণ এটিই প্রমাণ করেছে যে—বিশ্বের কোনো গুরুত্বপূর্ণ জলপথ, প্রযুক্তি কিংবা কোনো একটি কোম্পানির ওপর নিয়ন্ত্রণ থাকলে একটি দেশ আন্তঃসংযুক্ত বিশ্ব অর্থনীতিতে বিশাল প্রভাব বিস্তার করতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাথে যুদ্ধের সময় এই গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি করিডোরটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ্ববাজারে তেলের দাম প্রতি ব্যারেলে ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যায়। মূলত যুক্তরাষ্ট্রকে পিছু হটতে বাধ্য করার কৌশল হিসেবে ইরান তেলের বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থাকে একভাবে ‘জিম্মি’ করে ফেলেছিল।
গত মঙ্গলবার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হরমোজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেওয়ার শর্তে যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হন। ট্রাম্প দাবি করেছেন যে, মার্কিন সামরিক বাহিনীর উদ্দেশ্য সফল হয়েছে। তবে তেহরান জানিয়েছে, ভবিষ্যতে এই জলপথ দিয়ে যাতায়াতকারী জাহাজের ওপর তারা ‘টোল’ বা মাশুল আদায় করার পরিকল্পনা করছে। এর মাধ্যমে তারা এই চ্যানেলের ওপর নিজেদের দীর্ঘমেয়াদী নিয়ন্ত্রণকে একটি ‘অস্ত্র’ হিসেবে ব্যবহার করতে চায়। এটি এখনো স্পষ্ট নয় যে যুক্তরাষ্ট্র, তার মধ্যপ্রাচ্যের মিত্ররা কিংবা ইউরোপ ও এশিয়ার দেশগুলো এই উন্মুক্ত জলপথে ইরানের এমন হস্তক্ষেপ মেনে নেবে কি না, কিংবা তারা এটি কীভাবে ঠেকাবে।
উপকূলীয় অঞ্চলের এই অর্থনৈতিক সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে ইরান মূলত যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের দেখানো পথেই হাঁটছে। ওয়াশিংটন ও বেইজিং বছরের পর বছর ধরে তাদের বৈদেশিক নীতি বাস্তবায়নে বিশ্ববাণিজ্যের মূল ক্ষেত্রগুলোতে নিজেদের আধিপত্য ব্যবহার করে আসছে।
ইরান এক্ষেত্রে মোটেও একা নয়। হরমোজ প্রণালী বন্ধের আগে থেকেই বিশ্বের প্রধান অর্থনীতিগুলো—এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের মিত্ররাও—ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক চাপের বিরুদ্ধে নিজেদের ‘প্রতিরোধ ক্ষমতা’ গড়ে তুলছিল। মার্কিন শুল্ক এবং চীনের শিল্প অগ্রাসনের মুখে পড়ে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ২০২৩ সালে একটি ‘অ্যান্টি-কোয়ার্সন ইনস্ট্রুমেন্ট’ গ্রহণ করেছে, যাতে রপ্তানি নিয়ন্ত্রণসহ বিভিন্ন অর্থনৈতিক পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়া সহজ হয়। যদিও এটি এখনো ব্যবহৃত হয়নি। অন্যদিকে, ইইউ সদস্য রাষ্ট্র নেদারল্যান্ডস তাদের কোম্পানি ‘এএসএমএল’-এর তৈরি উন্নত লিথোগ্রাফি মেশিন চীনের কাছে বিক্রির ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে, যা অত্যাধুনিক সেমিকন্ডাক্টর তৈরির জন্য অপরিহার্য।
জাপানও তাদের জ্বালানি ও গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সরবরাহে বৈচিত্র্য আনতে এবং সেমিকন্ডাক্টর সরবরাহ চেইনসহ আধুনিক অর্থনীতির জন্য অপরিহার্য শিল্পগুলোকে সহায়তা দিতে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ব্যয় করছে। কর্মকর্তা ও বিশ্লেষকরা একে ‘কৌশলগত অপরিহার্যতা’ (Strategic indispensability) হিসেবে অভিহিত করছেন, যার লক্ষ্য হলো পারস্পরিক অর্থনৈতিক ধ্বংসের ঝুঁকি তৈরি করে অন্য পক্ষকে চাপে রাখা।
টোকিওভিত্তিক থিংক ট্যাঙ্ক ‘ইনস্টিটিউট অফ জিওইকোনমিকস’-এর ভিজিটিং রিসার্চ ফেলো অ্যান্ড্রু ক্যাপিস্ট্রানো বলেন, “অন্যকে এটা বলার জন্য যে—’আমাদের যা প্রয়োজন তা বন্ধ করো না’, আপনার আগে এটি বলার সক্ষমতা থাকতে হবে যে—’আমিও তোমার প্রয়োজনীয় জিনিস বন্ধ করে দিতে পারি’।”
অর্থনীতিবিদরা আশঙ্কা করছেন যে, এই ধরনের ‘অর্থনৈতিক অস্ত্রের’ প্রসার বিশ্ব অর্থনীতিতে আরও অস্থিরতা ও ঘর্ষণ তৈরি করবে, যার চূড়ান্ত খেসারত দিতে হবে ভোক্তা ও ব্যবসায়ীদের। একটি পরিষ্কার উদাহরণ হলো—হরমোজ প্রণালীতে জাহাজের ওপর করারোপ করা হলে তেলের দাম বেড়ে যাবে। আরও ব্যাপকভাবে বলতে গেলে, চাপ থেকে অর্থনীতিকে রক্ষা করার প্রচেষ্টায় সাধারণত করদাতার অর্থ এমন সব শিল্পে ব্যয় হয় যা জাতীয় স্বার্থের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত।
মার্কিন ও জাপানি বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানে জ্যেষ্ঠ পদে দায়িত্ব পালন করা অর্থনীতিবিদ ও লেখক পল শেয়ার্ড বলেন, “বিশ্বায়নের স্বর্ণযুগে এবং মুক্ত বাণিজ্যের সমর্থনের সময়ে অর্থনীতিবিদরা চালকের আসনে থাকতেন এবং জাতীয় নিরাপত্তা সংশ্লিষ্টরা পেছনের সিটে বসতেন। কিন্তু এখন ভূমিকা বদলে গেছে; জাতীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তারাই এখন চালকের আসনে।” শেয়ার্ড উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, আস্থা ও মুক্ত বাণিজ্যের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা বৈশ্বিক ব্যবস্থার বদলে যখন রক্ষণশীলতা ও সন্দেহের বাতাবরণ তৈরি হয়, তখন প্রকাশ্য যুদ্ধের ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়।
ইরানের হরমোজ প্রণালী বন্ধের ঘটনাটি দেখিয়েছে যে, কীভাবে ভৌগোলিক অবস্থান এবং ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের ভাণ্ডার ব্যবহার করে একটি ‘চোকপয়েন্ট’ বা প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা যায়। বড় অর্থনীতিগুলো বিশ্ব অর্থনীতিতে তাদের ওজনের মাধ্যমে এই ধরনের চাপের সুযোগ নিতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে ডলার-ভিত্তিক আর্থিক ব্যবস্থাকে ব্যক্তি, ব্যবসা ও সরকারের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের কাজে ব্যবহার করছে। এছাড়া তারা সেমিকন্ডাক্টর প্রযুক্তির ওপর নিয়ন্ত্রণ ব্যবহার করে চীনের সামরিক বাহিনীকে বাধা দিচ্ছে এবং বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত অর্থনীতি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের সমকক্ষ হওয়ার বেইজিংয়ের উচ্চাকাঙ্ক্ষায় লাগাম টানছে।
চীন বিরল খনিজ পদার্থের ওপর তাদের প্রায় একক নিয়ন্ত্রণ ব্যবহার করে অর্থনৈতিক শক্তি প্রদর্শন করে। এই খনিজগুলো ফাইটার জেট থেকে শুরু করে স্মার্টফোন পর্যন্ত সবকিছুর জন্য অপরিহার্য। বেইজিং এই সরবরাহ চেইনকে ট্রাম্পের কাছ থেকে বাণিজ্য ও শুল্ক সুবিধা আদায়ের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে। অতি সম্প্রতি জাপান থেকে বিরল খনিজ আমদানির পথ সীমিত করেছে চীন। জাপানি প্রধানমন্ত্রী সানাই তাকাইচির গত নভেম্বরের মন্তব্যের (যেখানে তিনি বলেছিলেন জাপান তাইওয়ান সংঘাতের সাথে জড়িয়ে পড়তে পারে) প্রতিশোধ হিসেবে বেইজিং এই পদক্ষেপ নিয়েছে।
পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ‘মিনার্ভা টেকনোলজি ফিউচারস’-এর কৌশল প্রধান এবং সাবেক মার্কিন বাণিজ্য কর্মকর্তা এমিলি বেনসন বলেন, “প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তোলার জন্য আপনাকে অন্যের সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর প্রভাব বজায় রাখতে হবে। ক্ষমতার টেবিলে বসার জন্য আপনাকে বিশ্ব অর্থনীতির এই আন্তঃসংযুক্ত জালে সক্রিয় অংশ হতে হবে।” তিনি সতর্ক করে বলেন, যেসব দেশ এই ক্ষমতার লড়াইয়ে অংশ নিতে পারবে না বা চাইবে না, তারা অন্যের ‘মেনু’ বা তালিকায় থেকে যাবে।







