দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে নাসার একটি বিশাল রকেটে চড়ে চার মহাকাশচারী চাঁদের চারপাশ প্রদক্ষিণের অভিযানে যাত্রা শুরু করেছেন। ৫০ বছরের বেশি সময়ের মধ্যে এটিই প্রথম কোনো মানববাহী চন্দ্রাভিযান।
কমলা ও সাদা রঙের বিশাল রকেটটি তিনজন আমেরিকান এবং এক কানাডিয়ান মহাকাশচারীকে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে বাংলাদেশ সময় গতকাল ভোরের দিকে উড্ডয়ন করে। মহাকাশযানটি আগুনের শিখা ছড়িয়ে ওড়ার সময় নাসার কর্মী এবং উপস্থিত দর্শকরা উল্লাসে ফেটে পড়েন।
যদিও এবারের অভিযানের নভোচারীরা চাঁদের মাটিতে পা রাখবেন না, তবে ১০ দিনের এই অভিযানটি চাঁদে মানুষের পরবর্তী পদচিহ্ন আঁকার পথ প্রশস্ত করবে। মহাকাশচারীরা চাঁদের দূরবর্তী পৃষ্ঠ থেকে আরও ছয় হাজার ৪০০ মাইল দূরে ভ্রমণ করবেন। চাঁদের এই অংশটি সব সময় পৃথিবী থেকে উল্টো দিকে থাকে এবং ইতিহাসে এই প্রথম কোনো মানববাহী যান এতদূর পর্যন্ত যাবে।
নাসা জানিয়েছে, চাঁদের উল্টো পাশে প্রায় তিন ঘণ্টার অবস্থানে ক্রু সদস্যরা ভূতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য যেমন– বিশাল গর্ত এবং প্রাচীন লাভা প্রবাহ বিশ্লেষণ ও ছবি তুলবেন। এটি ভবিষ্যতে চাঁদের দক্ষিণ মেরু অঞ্চলে অভিযানের ক্ষেত্রে সহায়তা করবে। এ ছাড়া মহাকাশচারীদের স্বাস্থ্যের ওপরও নজর রাখবে নাসা। গভীর মহাকাশ ভ্রমণ মানুষের মন ও শরীরের ওপর কেমন প্রভাব ফেলে, তা দেখা হবে। এই তথ্যগুলো ভবিষ্যতের চন্দ্রাভিযান এবং মঙ্গলগ্রহের যাত্রায় মহাকাশচারীদের সুরক্ষায় কাজে লাগবে।
আর্টেমিস-২ নামের অভিযানটি শুরুর সময় মহাকাশচারীদের পরনে ছিল নীল বর্ডারযুক্ত উজ্জ্বল কমলা রঙের স্যুট। ঐতিহাসিক এই যাত্রায় যারা উড়াল দিয়েছেন তারা হলেন– কানাডার নভোচারী জেরেমি হ্যানসেন, যুক্তরাষ্ট্রের ক্রিস্টিনা কোক, রিড ওয়াইসম্যান ও ভিক্টর গ্লোভার। মিশন কমান্ডার ওয়াইসম্যান বলেন, ‘আমরা এক অপূর্ব চন্দ্রোদয় দেখতে পাচ্ছি। নিজেরাও ঠিক সেদিকেই এগিয়ে যাচ্ছি।’
অভিযান শুরুর পরপরই নভোচারীদের ছোটখাটো কিছু সমস্যার মুখে পড়তে হয়। উড্ডয়ন-পরবর্তী এক ব্রিফিংয়ে নাসার অ্যাসোসিয়েট অ্যাডমিনিস্ট্রেটর অমিত ক্ষত্রিয় জানান, ওরিয়ন মহাকাশযানের টয়লেট চালু করার সময় সেটি নিয়ন্ত্রণের কিছু যান্ত্রিক গোলযোগ দেখা দিয়েছিল। এ ছাড়া মহাকাশযানের সঙ্গে সাময়িক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়েছিল বলে জানিয়েছেন নাসাপ্রধান জ্যারেড আইজ্যাকম্যান। পরে সেগুলো সমাধান করা হয়েছে।
উড্ডয়নের ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী হতে ফ্লোরিডার স্পেস কোস্টে উপস্থিত হয়েছিলেন আমেরিকান বিজ্ঞানী সিয়ান প্রক্টর। তিনি বলেন, মানুষ আবারও চাঁদের দিকে যাচ্ছে। এটি দেখা খুবই আনন্দের। আগামী ১০ দিন মানবজাতির জন্য একটি বড় পদক্ষেপ।
১০ দিনে যা করবে
প্রথম এক থেকে দুইদিন মহাকাশচারীরা পৃথিবীর উচ্চ কক্ষপথে অবস্থান করে মহাকাশযানের বিভিন্ন কারিগরি দিক পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পরীক্ষা করবেন। এর মধ্যে আছে ওরিয়ন মহাকাশযানের লাইফ সাপোর্ট, প্রপালশন (ইঞ্জিন শক্তি), নেভিগেশন এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা যাচাই করা। যানটি গভীর মহাকাশে যাওয়ার জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত কিনা, তা নিশ্চিত করবেন।
পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর ওরিয়নের প্রপালশন সিস্টেম একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘ইঞ্জিন বার্ন’ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করবে। এটি ‘ট্রান্সলুনার ইনজেকশন’ নামে পরিচিত। এটি মহাকাশযানটিকে পৃথিবীর কক্ষপথ থেকে বের করে চাঁদের অভিমুখে একটি নির্দিষ্ট পথে পাঠিয়ে দেবে।
তৃতীয় থেকে চতুর্থ দিনে চাঁদের দিকে যাত্রাপথে মহাকাশচারীরা ক্রমাগত সিস্টেমগুলো পর্যবেক্ষণ করবেন। এর আগে কোনো মানববাহী মহাকাশযান পৃথিবী থেকে যত দূরে গিয়েছে, ওরিয়ন তার চেয়েও বেশি দূরত্ব অতিক্রম করবে। অভিযান নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থেকে গভীর মহাকাশে ওরিয়নের যোগাযোগ ও নেভিগেশন দক্ষতা ট্র্যাক করা হবে।
ওরিয়ন একটি ‘ফ্রি-রিটার্ন’ ট্র্যাজেক্টরি বা পৃথিবী থেকে চাঁদের উল্টো দিকের অংশ ঘুরে আসবে। এটি এমন একটি পথ, যা বাড়তি কোনো জ্বালানি ছাড়াই মহাকাশযানটিকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে পৃথিবীর দিকে ফিরিয়ে আনবে। এই ধাপে মহাকাশযানটি পৃথিবী থেকে তার সর্বোচ্চ দূরত্বে পৌঁছাবে।
পঞ্চম থেকে অষ্টম দিনে চাঁদে চক্র দেওয়ার পর ক্রু সদস্যরা পৃথিবীর দিকে ফিরতে থাকবেন। এই সময়ে তারা গভীর মহাকাশের আরও কিছু পরীক্ষা চালাবেন। এর মধ্যে আছে– পাওয়ার সিস্টেম, তাপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং পৃথিবীর নিম্ন কক্ষপথের অনেক বাইরের পরিবেশে ক্রু অপারেশন মূল্যায়ন করা।
ওরিয়ন যখন পৃথিবীর কাছাকাছি আসবে, তখন এটি বায়ুমণ্ডলে প্রবেশের আগে তার মূল অংশগুলো থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ২৫ হাজার মাইল বেগে এটি বায়ুমণ্ডলে আছড়ে পড়বে। এই উচ্চগতিতে পুনঃপ্রবেশের সময় ক্যাপসুলটির ‘হিট শিল্ড’ বা তাপ সুরক্ষা কবচ পরীক্ষা করাটাও এই অভিযানের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য।
সব শেষে মহাকাশযানটি প্রশান্ত মহাসাগরে অবতরণ করবে। অভিযানটি সফল হলে নাসা আর্টেমিস-৪ এবং ৫-এর মাধ্যমে সরাসরি চাঁদে মানুষ অবতরণের পরিকল্পনা করছে। যা ২০২৮ সালের মধ্যে বাস্তবায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। সূত্র : এএফপি, বিবিসি ও রয়টার্স







