মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন করাই বিএনপির রাজনীতি: প্রধানমন্ত্রী

মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন করাই বিএনপির মূল লক্ষ্য ও রাজনীতি বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, ‘আমরা এমন কাজ করতে চাই যেখানে আগামী দুই-চার বছরের মধ্যে প্রত্যেকের আয় দ্বিগুণ হয়ে যায়। এটিই বিএনপির রাজনীতি।’

আজ সোমবার (১৬ মার্চ) দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে দিনাজপুরের কাহারোল উপজেলার সাহাপাড়ায় নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী দেশব্যাপী ৫৪টি খাল খনন কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনকালে তিনি এসব কথা বলেন। উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শেষে খালের পাড়ে একটি বৃক্ষ রোপণ করেন তিনি।

খাল খনন কর্মসূচি উদ্বোধন করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘খাল কাটা জরুরি। দেশের সব খাল ভরাট হয়ে গেছে। এমনকি বর্ষার মৌসুমেও খরা হয়, অনেক জায়গায় পানি অভাবে চাষাবাদ করা যায় না। আমরা এই বর্ষার পানিটাকে কৃষিকাজে ব্যবহার করতে চাই। উজানের সময় যে পানি পাওয়া যাবে সেটাকে ধরে রাখতে চাই, যাতে শুষ্ক মৌসুম এবং বর্ষা মৌসুম দুইভাবেই কৃষকরা উপকৃত হয়। আগামী ৫ বছরে দেশের ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন করব। এটা আজ সাহাপাড়া থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হলো।’

পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, সাহাপাড়া খালটির দৈর্ঘ্য ১২ দশমিক ২ কিলোমিটার। এই খালটির সঙ্গে পুনর্ভবা নদীর সংযোগ রয়েছে। ভারতের পশ্চিমবঙ্গ থেকে আসা এই নদীর জলস্রোত ঠাকুরগাঁও হয়ে দিনাজপুরে প্রবেশ করেছে, যা পঞ্চগড়ের মহানন্দা নদীতে গিয়ে মিশেছে।

তারেক রহমান বলেন, ‘আমরা এমন একটি দল করি, যেই দলের কাজ হচ্ছে সেই কাজগুলো করা যে কাজগুলো করলে মানুষের উপকার হয়। যে কাজগুলো করলে মানুষ খুশি হবে। আমরা চেষ্টা করি সেই কাজগুলো করতে এবং সেই কারণেই আজ আমরা একত্রিত হয়েছি এই সাহাপাড়া খালটি পুনঃখননের কাজ শুরু করেছি।’

তিনি আরও বলেন, ‘এই খালটি প্রায় ১২ কিলোমিটার লম্বা। যখন সম্পূর্ণভাবে কাজ শেষ করতে পারব, তখন ৩১ হাজার কৃষক এখান থেকে পানি নিয়ে ১২০০ হেক্টর জমি সেচ সুবিধার আওতায় আনতে পারবে। সাড়ে তিন লাখ মানুষ এই খালের পানির সুবিধা পাবে। শুধু তাই নয়, এই এলাকার কৃষক ভাইবোনের এখন যা ফসল উৎপাদন হচ্ছে তার থেকে প্রায় ৬০ হাজার মেট্রিকটন বেশি ফসল উৎপাদন হবে।’

আরও পড়ুন:  প্রধানমন্ত্রীর পিএস, এপিএস ও প্রটোকল অফিসার নিয়োগ

কৃষকদের পাশে থাকার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা কৃষকের পাশে থাকতে চাই। আমরা নির্বাচনী ওয়াদা করেছিলাম ভোটে জয়লাভ করলে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ সুদসহ মওকুফ করে দেবার ওয়াদা করেছিলাম। সরকার গঠনের পরে প্রথম মন্ত্রিসভার বৈঠকে বিএনপি কৃষকের কথা মনে রেখেছে। সেই বৈঠকে কৃষিঋণ মওকুফের ব্যবস্থা করেছি।’

কৃষির উৎপাদন বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করে তারেক রহমান বলেন, ‘বাংলাদেশ বিরাট দেশ। ২০ কোটি মানুষের বসবাস এই দেশে। এত মানুষের জন্য খাবার দাবার বিদেশ থেকে কি আনা সম্ভব? এই খাবার আমাদের এই দেশেই উৎপাদন করতে হবে। বিশেষ করে ধান-চালসহ মৌলিক খাবারগুলো এই দেশে উৎপাদন করতে হবে। আমাদের দেশের মাটি উর্বর। শুধু খাল নয়, খালের দুইপাশে ৬০ হাজার বৃক্ষরোপণ করা হবে। সেইসঙ্গে খালের দুই পাশে চলাচলের জন্য রাস্তা করে দেওয়া হবে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘খালে পানি না থাকায় আমাদের গভীর নলকূপের মাধ্যমে মাটির নিচ থেকে পানি তুলতে হয়। আজ থেকে ১০ বছর পূর্বে যতটুকু গভীরতায় পানি পাওয়া যায় এখন পানি পেতে আরও বেশি গভীরতা প্রয়োজন হয়। ওই পানি কমে গেলে আমাদের বিপদে পড়তে হবে। এজন্য মাটির উপরের পানি ধরে রাখার ব্যবস্থা করতে হবে যাতে ভবিষৎ প্রজন্মের জন্য মাটির গভীরের পানি রেখে দেওয়া যায়। খাল-নদী খনন করে আমাদের সেই পানি ধরে রাখার ব্যবস্থা করতে হবে।

ফ্যামিলি কার্ড দেওয়ার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের কাজও শুরু হয়েছে জানিয়ে তারেক রহমান বলেন, ‘নির্বাচনী ওয়াদায় আমরা ৪ কোটি পরিবারকে ফ্যামিলি কার্ড পৌঁছে দিতে চেয়েছিলাম। আমরা এরইমধ্যে সেই কাজটি শুরু করেছি। পাইলট প্রকল্পের মাধ্যমে এরইমধ্যে ৩৭ হাজার মা-বোনের কাছে ফ্যামিলি কার্ড পৌঁছে দিয়েছি। ধীরে ধীরে খুব অল্প সময়ের মধ্যে রংপুর অঞ্চলের সবার কাছে পৌঁছে দেওয়া হবে।’

আরও পড়ুন:  ‘শেখ হাসিনা আসবে বাংলাদেশ হাসবে’ -স্লোগানে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের ঝটিকা মিছিল

প্রধানমন্ত্রী জানান, আমরা যে ওয়াদা করেছিলাম সেই কাজগুলো শুরু করেছি। কৃষক ভাইদের জন্য যেভাবে সুদ মওকুফ করেছি, মা-বোনদেরকে ফ্যামিলি কার্ড দিয়েছি একইভাবে কৃষকভাইদের কৃষি কার্ড পৌঁছে দেব। যা আগামী মাস থেকে চালু হবে। ক্ষুদ্র-প্রান্তিক ও মধ্যম চাষীদের কাছে পর্যায়ক্রমে দেওয়া হবে। যাতে করে এই কার্ডের মাধ্যমে তাঁরা বিভিন্ন সরকারি সুযোগ-সুবিধা পেতে পারেন।’

বিএনপি চেয়ারম্যান আরও বলেন, ‘বিএনপি সরকার হচ্ছে কৃষকের বন্ধু। কৃষক ভালো থাকলে কৃষাণী ভালো থাকলে বাংলাদেশের মানুষ ভালো থাকবে। বাংলাদেশের কৃষিকে আমরা শক্তিশালী ভিত্তির ওপর গড়ে তুলতে চাই।’

উত্তরাঞ্চল কৃষিপ্রধান এলাকা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বাংলাদেশে অনেক বড় বড় কোম্পানি আছে যারা কৃষি সংক্রান্ত দ্রব্য নিয়ে মিল-কারখানা করেছে। আমরা এরইমধ্যে তাদের সঙ্গে কথা বলেছি, এই এলাকায় কি কি কৃষি নির্ভর মিল-কারখানা গড়ে তোলা যায়। যাতে করে এখানকার বেকার যুবকদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘এই দেশের মানুষই ৭১ সালে যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছিল, ২০২৪ সালে আন্দোলনের মাধ্যমে স্বৈরাচার বিদায় করেছিল। কাজেই এই দেশের মানুষই শহীদ জিয়ার সময়ে খাল খননের মাধ্যমে দেশে খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি করে বিদেশে রপ্তানি করেছিল। এই দেশের মানুষই সুন্দর আগামী গড়ে তুলবে। প্রয়োজন শুধু পরিকল্পনা। আর সজাগ থাকতে হবে। যারা বিভিন্ন রকম কথা বলে দেশে বিশৃঙ্খলা করতে চায়। মিষ্টি কথা বলে বিভ্রান্ত করতে চায়।’

তারেক রহমান বলেন, ‘আমাদের রাজনীতি হচ্ছে কৃষকের উপকার করা, মা-বোনদেরকে সাবলম্বী করে তোলা, আমাদের রাজনীতি হচ্ছে দেশের মানুষের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করা, ভবিষৎ প্রজন্মকে মানুষ করে গড়ে তোলা। মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা।’

আরও পড়ুন:  খাল খনন কর্মসূচির উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী

তিনি আরও বলেন, ‘এই খাল খনন কর্মসূচির মাধ্যমে আজকে দেশ গড়ার কর্মসূচি শুরু হলো। আমরা সেই বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চাই যেই বাংলাদেশের মানুষ নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠিত করতে পারবে। অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী হবে সেই বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চাই। এই কর্মসূচি কতটুকু সফল হলো তার খোঁজ রাখব এবং খাল খনন সম্পন্ন হলে দেখতে আবার আসব।’

জেলা বিএনপির সভাপতি মোফাজ্জল হোসেন দুলালের সভাপতিত্বে সমাবেশে উপস্থিত থেকে আরও বক্তব্য রাখেন বিএনপি মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, সমাজকল্যাণমন্ত্রী ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেন, ত্রাণ ও দুর্যোগমন্ত্রী আসাদুল হাবীব দুলু, পানিসম্পদ মন্ত্রী শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানী, প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ, জাতীয় সংসদের হুইপ আখতারুজ্জামান মিয়া, দিনাজপুর সদর-৩ আসনের এমপি সৈয়দ জাহাঙ্গীর আলম, বোচাগঞ্জ-বিরল আসনের এমপি সাদিক রিয়াজ চৌধুরী পিনাক, প্রকল্প এলাকার বীরগঞ্জ-কাহারোল আসনের এমপি মঞ্জুরুল ইসলাম, উপজেলা বিএনপির সভাপতি গোলাম মোস্তফা বাদশা প্রমুখ।

এর আগে, কর্মসূচির উদ্বোধন উপলক্ষে সকাল সাড়ে ৯টায় একটি অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটে ঢাকা বিমানবন্দর থেকে সৈয়দপুর বিমানবন্দরের উদ্দেশে রওনা দেন প্রধানমন্ত্রী। সৈয়দপুর পৌঁছে সেখান থেকে সড়কপথে কর্মসূচিস্থলে যান তিনি।

উল্লেখ্য, প্রধানমন্ত্রী বিকেল সাড়ে ৩টায় দিনাজপুর শহরে ফরিদপুর কবরস্থানে নানা-নানীসহ নিকটাত্মীয়দের কবর জিয়ারত করবেন। বিকেল ৫টায় শহরের গোর-এ-শহীদ বড় ময়দানে দিনাজপুরের সুধী সমাবেশ ও ইফতার এবং দোয়া মাহফিলে অংশ নেবেন। সন্ধ্যা পৌনে ৭টায় দিনাজপুর থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওনা করবেন প্রধানমন্ত্রী।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *