ইউনূস সরকারের ১৪ মাসে ঋণ বেড়েছে ২.৬০ লাখ কোটি টাকা

ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তবর্তী সরকারের মেয়াদে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে সাত বছরের মধ্যে সবচেয়ে কম অর্থ ব্যয় করা হলেও ঋণের লাগাম ধরে রাখা সম্ভব হয়নি। অন্তর্বর্তী সরকারের ১৪ মাসে দেশের ঋণের পরিমাণ বেড়েছে ২ লাখ ৬০ হাজার ২৫৭ কোটি টাকা।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত সর্বশেষ ডেবট বা ঋণ বুলেটিন অনুযায়ী, গত ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশি-বিদেশি মোট ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ২১ লাখ ৪৯ হাজার ৪৪ কোটি টাকা।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, অন্তবর্তীকালীন সরকার মেগা প্রকল্প থেকে সরে আসার পাশাপাশি সামগ্রিকভাবে উন্নয়ন ব্যয় ব্যাপকভাবে কমালেও ঋণনির্ভরতা কমাতে পারেনি। লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী রাজস্ব আহরণ করতে না পারা এবং আগের ঋণ পরিশোধের চাপের পাশাপাশি—পরিচালন ব্যয়ে লাগাম টানতে না পারায় ঋণ বাড়াতে হয়েছে।

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, “অন্তবর্তীকালীন সরকারের সময়ে ঋণ বৃদ্ধির মৌলিক কারণ হলো রাজস্ব আহরণ অনেক কমে যাওয়া। ফলে ঋণ না নিয়ে সরকার চালানোই কঠিন ছিল। ৫ আগস্ট হাসিনা সরকারের পতনের পর রাজনৈতিক অস্থিরতা ও পরবর্তীতে এনবিআর কর্মকর্তাদের আন্দোলনের কারণে গত অর্থবছর রাজস্ব আহরণ কম হয়েছে। ফলে সরকারের আর্থিক পরিসর সংকুচিত হয়েছে।”

বাড়ছে ঋণের বোঝা

২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের সময় দেশের মোট ঋণের পরিমাণ ছিল প্রায় ২ লাখ কোটি টাকা। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আগের সরকারের পতনের আগে, ওই বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত মোট ঋণ দাঁড়িয়েছিল ১৮ লাখ ৮৮ হাজার ৭৮৭ কোটি টাকা।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি পর্যন্ত ঋণ গ্রহণের পূর্ণাঙ্গ তথ্য যুক্ত হলে ঋণের পরিমাণ আরও বাড়তে পারে।

হাসিনা সরকারের ক্ষমতাচ্যূত হওয়ার পর ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে প্রকাশিত ডেবট বুলেটিনে দেশের মোট ঋণের পরিমাণ ১৮ লাখ ৩২ হাজার ২৮২ কোটি টাকা উল্লেখ ছিল। পরবর্তীতে বৈদেশিক ঋণকে নতুন বিনিময় হারে রূপান্তর করার কারণে এর পরিমাণ ৫৬ হাজার ৫০৫ কোটি টাকা বেড়েছে।

সরকারের ঋণ পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, অন্তবর্তীকালীন সরকার অভ্যন্তরীণ ঋণের চেয়ে বৈদেশিক উৎস থেকে বেশি ঋণ নিয়েছে। এই সময়ে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল–আইএমএফ এর ঋণের কিস্তি পাওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগীর থেকে বাজেট সহায়তা নিয়েছে। গত অর্থবছর সরকার ৩৪৪ কোটি ডলার বাজেট সহায়তা নিয়েছে, আগের অর্থবছর এর পরিমাণ ছিল ২০০ কোটি ডলার। ফলে ১৪ মাসে বৈদেশিক উৎস থেকে ঋণের পরিমাণ ৮ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা থেকে বেড়ে ৯ লাখ ৫১ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে।

আরও পড়ুন:  বিনামূল্যে ট্রানজিট সুবিধা চান ট্রাম্প

অন্যদিকে, আগের সরকারের পতনের এক মাস আগে যেখানে অভ্যন্তরীণ ঋণ ছিল ১০ লাখ ৭৬ হাজার কোটি টাকা, তা গত সেপ্টেম্বর নাগাদ বেড়ে হয়েছে ১১ লাখ ৯৭ হাজার কোটি টাকা।

তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছরে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়ন হয়েছে ১ লাখ ৫৩ হাজার টাকা—যা সাত বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। সে তুলনায় ২০১৮-১৯ অর্থবছরে এডিপি ব্যয় ছিল ১ লাখ ৬৭ হাজার কোটি টাকা এবং আগের সরকারের শেষ অর্থবছর ২০২৩-২৪–এ তা বেড়ে দাঁড়ায় ২ দশমিক ৫ লাখ কোটি টাকায়।

উন্নয়ন ব্যয় কমলেও ঋণ বৃদ্ধি অব্যাহত থাকে। বিশ্লেষকদের মতে, আগের সরকারের রেখে যাওয়া বকেয়া বিল, ভর্তুকি–সংক্রান্ত দায়সহ নানা বকেয়া পরিশোধের কারণেও ঋণের চাপ বেড়েছে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের সাবেক সিনিয়র সচিব মাহবুব আহমেদ বলেন, অন্তবর্তীকালীন সরকার মূলত ঋণ নিয়েছে পুরনো ঋণ পরিশোধ করতে এবং ঋণ পরিশোধ–সংক্রান্ত চাপ সামাল দিতে।

একই সঙ্গে উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে অনেক মানুষ সঞ্চয়পত্র ভেঙ্গেছে, সেগুলোর আসল ও সুদ সরকারকে পরিশোধ করতে হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার ব্যয় কমাতে অনেক প্রকল্প বাতিল করেছে, কিছু প্রকল্প স্থগিত করেছে। তবে এভাবে উন্নয়নখাতে ব্যয় কমালেও আয়ের তুলনায় সরকারের পরিচালন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে ঋণনির্ভর হতে হয়েছে বলে জানান তিনি।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) এর অতিরিক্ত পরিচালক (গবেষণা) তৌফিকুল ইসলাম খান টিবিএসকে বলেন, আগের ঋণ পরিশোধের চাপ এবং ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়নও মোট ঋণের পরিমাণ বাড়াতে ভূমিকা রেখেছে।

পরবর্তী সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ

অন্তর্বর্তী সরকার আগের আওয়ামী সরকারের রেখে যাওয়া বহু বকেয়া দায় পরিশোধ করলেও— নতুন সরকারের কাঁধে আবারও বেশকিছু আর্থিক বোঝা দিয়ে যাবে। এর মধ্যে রয়েছে বকেয়া বিদ্যুৎ বিল, এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বাড়িভাড়া ভাতা বিতরণ এবং নতুন জাতীয় বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন।

ঋণ-নির্ভর অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে আসার প্রতিশ্রুতি দিয়ে সরকার গঠন করছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল–বিএনপি। ফ্যামিলি কার্ড চালু করা, সরকারি চাকরিজীবদের নতুন বেতন কাঠামো বিবেচনা করাসহ বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি দিয়ে সরকার গঠন করা বিএনপিকে আগামী ১০০ দিনের মধ্যেই নতুন বাজেট ঘোষণা করতে হবে।

আরও পড়ুন:  পূর্ব তিমুরের প্রেসিডেন্টকে লাল গালিচা সংবর্ধনা বাংলাদেশের

বিশ্লেষকদের মতে, আগামী অর্থবছর কাঙ্ক্ষিত রাজস্ব আহরণ করতে না পারলে—নতুন সরকারের জন্য বাজেটের অংক মেলানো কঠিন হতে পারে।

তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার দায়িত্ব গ্রহণের সাড়ে ৩ মাসের মাথায় নতুন বাজেট ঘোষণা করতে হবে, যে বাজেটে মন্ত্রণালয়ভিত্তিক বরাদ্দের হিসাব চূড়ান্ত করে গেছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। তা সত্ত্বেও আগামী জুনে যে বাজেট ঘোষণা করা হবে, তাকেই বিএনপি সরকারের প্রথম আর্থিক পরীক্ষা হিসেবে দেশবাসী মনে করবে বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন।

তিনি বলেন, “প্রথম বাজেটেই বিএনপিকে কিছু রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তবে নতুন সরকারের জন্য বাজেটের অংক মেলানো কঠিন হবে। বিএনপি অনেক প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, যা প্রথম বাজেটেই অন্তুর্ভুক্ত করতে হবে। তারা স্বাস্থ্য ও শিক্ষায় জিডিপির অনুপাতে বরাদ্দ ৫ শতাংশ করার কথা বলেছে, ফ্যামিলি কার্ড চালু করা এবং ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ মওকুফ করার অঙ্গীকার করেছে। এসব উদ্যোগে সরাসরি ও বিপুল সরকারি ব্যয় প্রয়োজন হবে।”

ড. জাহিদ বলেন, ”একইসঙ্গে বিএনপি ঋণ-নির্ভর অর্থনীতি থেকে বের হয়ে আসার অঙ্গীকার করেছে। এর অর্থ হলো, বাজেট ঘাটতি সীমিত রাখবে। বিএনপি সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন বেতন কাঠামো দেওয়ারও অঙ্গীকার করেছে। তবে সুপারিশ করা নতুন বেতন কাঠামোর এক-তৃতীয়াংশ বাস্তবায়ন করা হলেও—অতিরিক্ত ৩০ হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন হবে। তাই রাজস্ব আহরণ উল্লেখযোগ্য হারে বাড়াতে না পারলে, নতুন সরকারকেও ঋণের উপর নির্ভর করতে হবে। আবার সরকার ঋণগ্রহণ বাড়ালে বেসরকারিখাতে ঋণপ্রবাহ আরও কমবে। বর্তমানে তা কমে ৬ শতাংশের নিচে নেমে গেছে।”

অর্থ মন্ত্রণালয়ের সাবেক সিনিয়র সচিব মাহবুব আহমেদ বলেন, বিএনপি আগামী পাঁচ বছরে ১ কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টির যে অঙ্গীকার করেছে, তা বাস্তবায়নে ঋণ-নির্ভরতা কমানোর পাশাপাশি নতুন সরকারকে রাজস্ব আহরণ বাড়াতে কার্যকর পদক্ষেপ হবে নিতে হবে। দেশের জিডিপি বৃদ্ধির যে হিস্যা ট্যাক্স হিসেবে সরকারের পাওয়ার কথা, তা আদায়ে মনোযোগ দিতে হবে।

তিনি বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার অনেক প্রকল্প বাতিল করেছে, অনেক প্রকল্প হাফ ডান (অর্ধ-সম্পন্ন) অবস্থায় ফেলে রেখে অর্থায়ন স্থগিত রেখেছে। যেসব প্রকল্পে ইতোমধ্যে অর্থ ব্যয় হয়েছে এবং তা বাস্তবায়ন করলে দেশের মানুষ প্রকৃতঅর্থে সুফল পাবে, সেগুলো নতুন সরকারকে বাস্তবায়ন করতে হবে। “কিন্তু, এজন্য বাড়তি অর্থের প্রয়োজন হবে। রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর মাধ্যমে তা সম্ভব না হলে – তাদেরকেও ঋণনির্ভর হতে হবে।”

আরও পড়ুন:  কবি নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র রাজনীতি বন্ধ

মাহবুব আহমেদ আরও বলেন, ”সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন বেতন কাঠামো দেওয়া, কৃষি কার্ড, ফ্যামিলি কার্ড দেওয়াসহ বিএনপি যেসব অঙ্গীকার করেছে, সেগুলো বাস্তবায়ন করতে অনেক অর্থের প্রয়োজন হবে। কিন্তু আমাদের ঋণ যে পর্যায়ে চলে গেছে, তাতে আতঙ্কিত না হলেও আশঙ্কা প্রকাশ করার যথেষ্ঠ কারণ আছে।”

সিপিডির তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, “নতুন সরকারকে ঋণ পরিশোধসূচি বাস্তবসম্মতভাবে নির্ধারণ করতে হবে। কারণ, প্রতিবছরই দেখা যায়, বিদেশি ঋণ পরিশোধের জন্য ইআরডি যে প্রাক্কলন করে, তার চেয়ে বেশি অর্থ পরিশোধ করতে হচ্ছে।

তিনি বলেন, “নতুন সরকারকে দায়িত্ব নিয়ে শুরুতেই সংশোধিত বাজেট পুনর্মূল্যায়ন করতে হবে, যাতে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রক্ষেপণগুলো বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়। একইসঙ্গে তাদের নির্বাচনী ইশতিহার পূরণে নতুন বাজেট প্রণয়নে বাস্তবসম্মত কর্মপরিকল্পনা নিতে হবে। তা না হলে প্রথম বাজেট দেখেই মানুষের মধ্যে হতাশা চলে আসবে।”

আওয়ামী লীগ সরকারের নেওয়া যেসব ঋণ পুনঃদরকষাকষির সুযোগ আছে, সেগুলো নিয়ে পুনরায় আলোচনা করার পরামর্শ দেন তিনি।

বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ভারতের সংবাদমাধ্যম দ্য হিন্দুকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, আওয়ামী লীগ সরকারের রেখে যাওয়া ‘ঋণের বোঝা’ নিয়ে নতুন সরকারকে কাজ শুরুর করতে হবে এবং বিভিন্ন প্রকল্প পুনর্মূল্যায়ন করে দেখতে হবে কোন কোন মেগা প্রকল্পে অপচয় হচ্ছে।

“এসব প্রকল্পের মধ্যে যেগুলো বাংলাদেশের স্বার্থে কাজে দেবে, সেগুলো আমরা রাখব,” বলেন তিনি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *