ভারতের হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মাকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে তলব

ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মাকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে তলব করা হয়েছে। মঙ্গলবার সকাল ১০টায় তাকে তলব করেন পররাষ্ট্রসচিব আসাদ আলম সিয়াম।  

কূটনৈতিক সূত্র জানিয়েছে, ভারতের নয়াদিল্লি, কলকাতাসহ বিভিন্ন স্থানে বাংলাদেশ মিশনে উদ্ভূত পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে প্রণয় ভার্মাকে তলব করা হয়। নিরাপত্তা নিয়ে উদ্ভূত পরিস্থিতির প্রতিবাদ জানানো হয় প্রণয় ভার্মার কাছে। একইসঙ্গে বাংলাদেশ মিশনগুলোতে নিরাপত্তা জোরদার করার কথা বলা হয়। 

নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ দেখা দেওয়ায় সোমবার নয়াদিল্লিতে বাংলাদেশ হাইকমিশন কনস্যুলার সেবা ও ভিসা কার্যক্রম সাময়িক বন্ধ করে দিয়েছে। হাইকমিশনের ফটকে একটি নোটিশ ঝুলিয়ে বলা হয়েছে– পরবর্তী নোটিশ না দেওয়া পর্যন্ত এসব কার্যক্রম বন্ধ থাকবে। পাশাপাশি আগরতলায় সহকারী হাইকমিশন ও শিলিগুড়িতে বাংলাদেশ ভিসা সেন্টারের ভিসা সেবাও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

ঢাকা ও দিল্লির সূত্র জানায়, গত কয়েক দিনে নয়াদিল্লিতে বাংলাদেশ হাইকমিশনের সামনে ও ভিসা সেন্টারে হামলার ঘটনার পর বাংলাদেশের হাইকমিশন, উপহাইকমিশন, সহকারী হাইকমিশন ও ভিসা সেন্টারগুলোতে নিরাপত্তা ইস্যু বড় হয়ে দেখা দিয়েছে।

কলকাতায় বাংলাদেশের উপহাইকমিশন ও শিলিগুড়িতে বাংলাদেশ ভিসা সেন্টারের সামনেও বিক্ষোভ করেছে বেশ কয়েকটি সংগঠন। শিলিগুড়ির ভিসা সেন্টারে তালা লাগিয়ে দিয়েছে বিক্ষোভকারীরা। আর সোমবার আগরতলায় বাংলাদেশ সহকারী হাইকমিশন এক বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, অনিবার্য কারণবশত পরবর্তী নির্দেশনা না দেওয়া পর্যন্ত ২৩ ডিসেম্বর থেকে আগরতলায় বাংলাদেশ সহকারী হাইকমিশনের সব ধরনের ভিসা ও কনস্যুলার সেবা কার্যক্রম বন্ধ থাকবে।

আরও পড়ুন:  ডিসেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে তফসিল ঘোষণার আশা সিইসির

এর আগে শনিবার রাতে ভারতের দিল্লির কূটনৈতিক এলাকায় নিরাপত্তা বেষ্টনী ভেদ করে বাংলাদেশ হাইকমিশনের সামনে গিয়ে বিক্ষোভ করে ‘হিন্দু চরমপন্থিদের’ একটি দল। এটি বাংলাদেশের সংবাদ মাধ্যমে প্রচারের পর এই প্রচারকে বিভ্রান্তিকর উল্লেখ করে বিবৃতি দিয়েছেন ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল। কিন্তু এই বিবৃতি প্রত্যাখ্যান করেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন। আর ২০২৪ সালের ২ ডিসেম্বর বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতনের অভিযোগ তুলে ভারতের আগরতলায় বাংলাদেশের সহকারী হাইকমিশনে হামলা চালায় উগ্রপন্থি হিন্দুত্ববাদী সংগঠন হিন্দু সংঘর্ষ সমিতিসহ কয়েকটি সংগঠনের সমর্থকরা।

সোমবার সন্ধ্যায় কলকাতায় বাংলাদেশ উপহাইকমিশনের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা জানান, ভিসা সেন্টার পরিচালনা করে একটি ব্যক্তিমালিকানা প্রতিষ্ঠান। নিরাপত্তা পরিস্থিতি বিবেচনায় কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে বলা হয়েছে। এর আগে দুপুরে ও বিকেলে বাংলাদেশের উপহাইকমিশন ও শিলিগুড়িতে বাংলাদেশ ভিসা সেন্টারে দুটি স্থানেই বিক্ষোভের সময় পোড়ানো হয় বাংলাদেশের পতাকা-সংবলিত ফ্লেক্স ও প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের কুশপুতুল। শিলিগুড়িতে হুমকি দেওয়া হয় বাংলাদেশ ভিসা সেন্টার বন্ধ রাখার।

ময়মনসিংহে পোশাক শ্রমিক দিপু চন্দ্র দাস হত্যার প্রতিবাদে দুপুরে শিলিগুড়ির বাঘা যতীন পার্কে জড়ো হয় বিশ্ব হিন্দু পরিষদ ও হিন্দু জাগরণ মঞ্চের কর্মীরা। ১২টার দিকে তারা মিছিল বের করে। শহরের বিভিন্ন সড়ক ঘুরে তারা বাংলাদেশ ভিসা সেন্টারের সামনে যায়। সেখানে ভিড়ের মধ্যে কয়েকজন বাংলাদেশের পতাকা-সংবলিত ফ্লেক্স টেনে ছিঁড়ে ফেলে। এরপর সেই ফ্লেক্স ও প্রধান উপদেষ্টার কুশপুতুলে আগুন দেয়। এক সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা ভিসা সেন্টার ঘিরে ফেলেন। হিন্দুত্ববাদী দুই সংগঠনের কর্মসূচির জেরে এদিন আগে থেকেই বন্ধ ছিল ভিসা সেন্টার। পরে সংগঠন দুটির কয়েকজন পুলিশের সঙ্গে ভেতরে গিয়ে দায়িত্বরত কর্মীদের সঙ্গে কথা বলেন। এ সময় বাংলাদেশে হিন্দু ধর্মাবলম্বী ও মন্দিরের সুরক্ষা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত ভিসা সেন্টার বন্ধ রাখার হুমকি দেওয়া হয়।

আরও পড়ুন:  পূর্ণগ্রাস চন্দ্রগ্রহণ আগামীকাল, বাংলাদেশ সময় যখন শুরু হবে

এদিকে কলকাতায় উপহাইকমিশনের সামনে তিন দফায় বিক্ষোভ হয়েছে। প্রথমে বিক্ষোভ করে ‘নাস্তিক মঞ্চ’ নামের একটি সংগঠন। ভারতীয় সময় দুপুর ২টার দিকে এর সদস্যরা উপহাইকমিশন চত্বরে যাওয়ার চেষ্টা করলে পুলিশ বাধা দেয়। পরে তারা চত্বর থেকে ২০০ মিটার দূরে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করে। আধাঘণ্টা পর স্মারকলিপি দিয়ে চলে যায়। এ ঘটনার পর জমায়েত হয় জাতীয় কংগ্রেসের কর্মীরা। প্রায় ১ ঘণ্টা ধরে তারা বিক্ষোভ করে। পরে পাঁচ সদস্যের প্রতিনিধি দল উপহাইকমিশনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে দেখা করে ক্ষোভের কথা জানায়। তারা চলে যাওয়ার পর বিজেপি এবং পশ্চিমবঙ্গ বিধান সভার বিরোধীদলীয় নেতা শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বে জড়ো হয় ‘হিন্দু সনাতনীরা’। পুলিশ বাধা দিলে ধস্তাধস্তিতে জড়ায়। এই বিক্ষোভকারীদের অনেকে ছিল হিন্দু সাধু। প্রায় এক ঘণ্টা ধরে তারা কলকাতার বেকবাগান মোড়ে রাস্তা অবরোধ করে রাখে। আগুন দেয় কুশপুতুলে। দিপু দাস হত্যার প্রতিবাদে পশ্চিমবঙ্গে রোববারও বিক্ষোভ মিছিল হয়। বিক্ষোভ হয় দিল্লি ও ত্রিপুরাতেও।

আরও পড়ুন:  আমি কিন্তু একেবারে সিঙ্গেল: ইধিকা

এর আগে ১৪ ডিসেম্বর প্রণয় ভার্মাকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে তলব করা হয়েছিল। পরে এই তলবের বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান হাদির ওপর হামলাকারীদের ভারতে পালিয়ে যাওয়া প্রতিরোধে দেশটির সহযোগিতা কামনা করা হয়। তাঁরা যদি ভারতীয় ভূখণ্ডে প্রবেশ করতে সক্ষমও হন, তবে তাঁদের তাৎক্ষণিক গ্রেপ্তার ও বাংলাদেশের কাছে প্রত্যর্পণ নিশ্চিত করার অনুরোধ জানানো হয়। নয়াদিল্লিতে আশ্রয় নেওয়া ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অব্যাহত উসকানিমূলক বক্তব্যে অন্তর্বর্তী সরকারের উদ্বেগের বিষয়টিও প্রণয় ভার্মাকে জানিয়ে দেওয়া হয়। ১৭ ডিসেম্বর নয়াদিল্লিতে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার এম রিয়াজ হামিদুল্লাহকে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাল্টা তলব করা হয়। ঢাকা ও নয়াদিল্লিতে দুই দেশের হাইকমিশনারদের পাল্টাপাল্টি তলবের ঘটনা দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি করেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *