গাজা সংঘাত নিয়ে সৌদি আরবের শীর্ষ সম্মেলনে যা হলো

গাজার সংঘাত মুসলিম ও আরব বিশ্বের দেশগুলোকে নিয়ে একটি শীর্ষ সম্মেলন আয়োজন করেছে সৌদি আরব। আজ শনিবার দেশটির রাজধানী রিয়াদে এ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এতে তুরস্ক, ইরান ও সিরিয়াসহ মুসলিম বিশ্বের নেতারা অংশ নিয়েছেন।

সম্মেলনে উদ্বোধনী বক্তব্য দেন সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান। তিনি গাজায় অবিলম্বে সামরিক অভিযান বন্ধ এবং সমস্ত যুদ্ধবন্দীদের মুক্তির আহ্বান জানান।

যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান বলেন, ‘এটি একটি মানবিক বিপর্যয়, যেখানে ইসরায়েল আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের চরম লঙ্ঘন করছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এবং জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ এটি বন্ধ করতে ব্যর্থ হয়েছে। বিশ্বের দ্বিমুখী নীতি এখানে প্রমাণিত হয়েছে।’

মোহাম্মদ বিন সালমান আরও বলেন, ‘আমরা নিশ্চিত যে ইসরায়েলি দখলদারি, অবৈধ বসতি স্থাপনের অবসান, এবং ফিলিস্তিনি জনগণের প্রতিষ্ঠিত অধিকার পুনরুদ্ধারের মাধ্যমে শান্তি প্রতিষ্ঠার একমাত্র অবলম্বন। এ জন্য ১৯৬৭ সালের সীমানা অনুযায়ী পূর্ব জেরুজালেমকে রাজধানী করে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে হবে।’

ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস গাজা ছাড়াও অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বাহিনীর অভিযান বৃদ্ধির বিষয়টি তুলে ধরেছেন। তিনি ইসরায়েলের আগ্রাসন, দখলদারি, লঙ্ঘন এবং পবিত্র স্থানগুলোর অপবিত্র করা বন্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে।

আরও পড়ুন:  এবারের সর্বনিম্ন ফিতরা ১১০, সর্বোচ্চ ২৮০৫ টাকা

আব্বাস বলেন, ‘কোনো সামরিক সমাধান গ্রহণযোগ্য নয়, এসব ব্যর্থ হয়েছে। গাজা বা পশ্চিম তীর থেকে আমাদের জনগণকে বাস্তুচ্যুত করার যেকোনো প্রচেষ্টা আমরা স্পষ্টভাবে প্রত্যাখ্যান করছি।’

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কত দিন ইসরায়েলকে আন্তর্জাতিক আইনের ঊর্ধ্বে রাখবে প্রশ্ন তুলে কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানি বলেছেন, ‘আন্তর্জাতিক বিশ্ব এই সব নৃশংস দৃশ্যের সামনেও নিষ্ক্রিয় রয়েছে। একবিংশ শতাব্দীতে হাসপাতালে প্রকাশ্যে গোলাগুলি হতে পারে তা কে কল্পনা করতে পারে?’

একটি ঐক্যবদ্ধ অবস্থান
সৌদি আরবের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গতকাল শুক্রবার গভীর রাতে শীর্ষ সম্মেলনের খবর ঘোষণা করে জানায়, দেশটির শনিবার প্রাথমিকভাবে দুটি শীর্ষ সম্মেলন আয়োজন করার কথা রয়েছে। একটি ইসলামিক সহযোগিতা সংস্থার (ওআইসি) এবং অপরটি আরব লীগের। উভয় সংস্থার সদস্যদের সঙ্গে পরামর্শ করার পর যৌথ এ শীর্ষ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।

মন্ত্রণালয়ের মতে, গাজা সংঘাতের বিষয়ে মুসলিম দেশগুলোর ঐক্যবদ্ধ অবস্থান নেওয়ার আকাঙ্ক্ষা থেকে যৌথ বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ওআইসিতে ফিলিস্তিনের প্রতিবেশী দেশ মিশর, জর্ডান, লেবানন, তুরস্ক এবং ইরাকসহ সমগ্র মুসলিম বিশ্বের সদস্য দেশগুলো অংশ নিয়েছে।

মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি জোর দিয়ে বলেছেন, নির্বিচারে বেসামরিক নাগরিকদের হত্যা, অবরোধ এবং জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত করার নীতি গ্রহণযোগ্য নয়। এটিকে আত্মরক্ষা হিসাবে ব্যাখ্যা করা যায় না এবং অবিলম্বে এটি বন্ধ করা উচিত। গাজায় অবিলম্বে স্থায়ী যুদ্ধবিরতি দিতে হবে।’

আরও পড়ুন:  মার্কিন ভিসা পেতে বন্ড জমার তারিখ জানাল দূতাবাস

এদিকে শুরু থেকেই ইরান বারবার সতর্ক করে জানিয়েছে ইসরায়েল আক্রমণ বন্ধ না করলে যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়বে। দেশটির প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসিও রিয়াদে সম্মেলনে যোগ দিয়েছেন। ১১ বছরের মধ্যে এই প্রথম কোনো ইরানের প্রেসিডেন্ট সৌদি আরব সফর। সম্মেলনে প্রেসিডেন্ট রাইসি বলেছেন, ‘গাজায় নির্বিচারে বোমাবর্ষণ বন্ধ করতে হবে।’

আমেরিকা জাতিসংঘে ইসরায়েলকে সমর্থন এবং ফিলিস্তিনিদের হত্যা বন্ধের প্রস্তাবে ভেটো দেওয়ার বিষয়টি পুনরায় উত্থাপন করে রাইসি বলেন, ‘এটি ইসরাইলের জন্য আরও হত্যা, আরও বোমাবর্ষণ এবং আরও সহিংসতা করার পথ তৈরি করেছে।’

ইসরায়েলকে দায়বদ্ধ করা
আরব ও মুসলিম বিশ্বের বারবার অবিলম্বে যুদ্ধবিরতি আহ্বান সত্ত্বেও ইসরায়েল গাজা উপত্যকায় হামলা থেকে পিছপা হয়নি। অবিরাম বিমান হামলা এবং স্থল হামলা চালিয়ে যাচ্ছে দখলদার রাষ্ট্রটি। গত ৭ অক্টোবর হামাসের হামলায় ১ হাজার ২০০ ইসরায়েলি নিহত হওয়ার প্রতিশোধ নিতে দেশটি এ পর্যন্ত কমপক্ষে ১১ হাজার ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছে, এদের মধ্যে বেশির ভাগই বেসামরিক নাগরিক।

ইসরায়েল সাম্প্রতিক দিনগুলোতে হাসপাতালের হামলার মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে জাতিসংঘ বলেছে, গাজার ১০ লাখ শিশুর জীবন ‘একটি সুতোয় ঝুলছে’।

আরও পড়ুন:  তুরস্কের হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ৬৬ জনের মৃত্যু

আরব লীগ ২২টি দেশ নিয়ে গঠিত। এক দশকের গৃহযুদ্ধের পরে জোটটিতে ফিরেছে সিরিয়া। এই বছরের শুরুতে আরব নেতারা প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের সঙ্গে আলোচনা পুনরায় শুরু করার পরে জোটে ফেরে।

জোটের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হোসাম জাকি বলেছেন, ইসরায়েলের আগ্রাসন বন্ধ, ফিলিস্তিনের জনগণকে সমর্থন, ইসরায়েলি দখলদারির নিন্দা এবং আন্তর্জাতিক আদালতের কাঠগড়ায় দেশটিকে দাঁড় করানোর লক্ষ্যেই বর্তমানে সংগঠনটি কাজ করছে।

এদিকে সৌদি আরব গতকাল শুক্রবার রিয়াদে আফ্রিকার দেশগুলো নিয়ে একটি শীর্ষ সম্মেলন করেছে। সেখানেও যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান যুদ্ধ বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছেন।

এর আগে গত বৃহস্পতিবার কাজাখস্তানের রাজধানী আস্তানায় রাশিয়া, ইরান, তুরস্ক ও পাকিস্তানের নেতারা গাজার পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনার জন্য আহ্বান জানিয়েছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *