এক বছরের মধ্যে পুঁজিবাজারের চেহারা বদলে যাবে: অর্থমন্ত্রী

অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, পুঁজিবাজার পুনরুজ্জীবিত ও প্রসারিত করতে ব্যাপক উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। আগামী এক বছরের মধ্যে বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের চেহারা বদলে যাবে। তিনি বলেন, ‘আমরা সামগ্রিক উদ্যোগের মাধ্যমে পুঁজিবাজারকে পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা করছি। ইনশাআল্লাহ, আগামী এক বছরের মধ্যে আপনারা বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের পরিবর্তিত চেহারা দেখতে পাবেন।’ 

রোববার (৪ অক্টোবর) রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন অডিটোরিয়ামে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) এবং ইন্টারন্যাশনাল অর্গানাইজেশন অব সিকিউরিটিজ কমিশনস (আইওএসসিও)-এর যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত বিশ্ব বিনিয়োগকারী সপ্তাহ-২০২৬ এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি একথা বলেন।

বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের চেয়ারম্যান, মাসুদ খান-এর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে সম্মানিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী (বিনিয়োগ ও পুঁজিবাজার বিষয়ক) তানভীর শাহরিয়ার গনি, বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেক এবং বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মীর নাদিয়া নিভিন।অর্থমন্ত্রী আমির খসরু বলেন, পুঁজিবাজার শক্তিশালী করতে সরকার ইতোমধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, অটোমেশন, সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেড (সিডিবিএল) প্রতিষ্ঠা এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামো উন্নয়নসহ বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে।

তিনি বলেন, ‘কিছু প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তন হয়েছে, অটোমেশন চালু হয়েছে, সিডিবিএল প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং অবকাঠামো গড়ে উঠেছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে পরবর্তীতে বিষয়গুলো সেভাবে এগোয়নি।’

আরও পড়ুন:  ১৭ কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠাল বিএসইসি

অর্থমন্ত্রী বলেন, পুঁজিবাজারে এখন বাস্তব ভিত্তিক ‘উদ্ধার কার্যক্রম’ ও ‘পুনরুদ্ধার কার্যক্রম’ প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে কোনো কোনো অংশীজনের জন্য কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে। তিনি বলেন, প্রচলিত অর্থায়নের উৎসের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে বাংলাদেশ এখন তার আর্থিক কাঠামোতে মৌলিক পরিবর্তনের দিকে এগোচ্ছে। ‘আমরা বাংলাদেশের আর্থিক কাঠামো পরিবর্তন করছি’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, সরকার দেশের সরকারি অর্থব্যবস্থা এবং বেসরকারি খাতে অর্থায়নের কাঠামোও পরিবর্তন করতে চায়। উচ্চ সুদে ব্যাংক থেকে অতিরিক্ত ঋণ নেওয়ার পরিবর্তে ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোকে পুঁজিবাজার থেকে অর্থ সংগ্রহের সুযোগ তৈরি করতে হবে।

বিশ্বমানের অর্থনীতির সঙ্গে তাল মেলাতে হলে আমাদের এখন ‘হাই স্ট্রিট থেকে ওয়ার্ল্ড স্ট্রিট’-এর দিকে যাত্রা করতে হবে। আমাদের দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের জন্য বন্ড মার্কেট, ডেরিভেটিভস, সিকিউরিটাইজেশন এবং ইক্যুইটি মার্কেটের ওপর জোর দিতে হবে।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) প্রসঙ্গ তুলে অর্থমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের বৈদেশিক অর্থায়নের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে অর্থ সংগ্রহ করতে হবে।
তিনি বলেন, ‘আমরা আইএমএফ কর্মসূচি বাতিল করেছি। কারণ তাদের শর্তগুলো আমাদের কাছে গ্রহণযোগ্য ছিল না।’

মন্ত্রী জানান, আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারী ও আন্তর্জাতিক বাজারের ইতিবাচক সাড়া পাওয়া গিয়েছে। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রে ওয়াল স্ট্রিটে অনুষ্ঠিত বৈঠকে বাংলাদেশের রূপান্তর ও অর্থনৈতিক পদক্ষেপে প্রখ্যাত বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীরা গভীর আস্থা প্রকাশ করেছেন।

তিনি বলেন, ‘নিউইয়র্কে আমরা ডলার বন্ড এবং হংকংয়ে বাংলাদেশ ডেডিকেটেড ফান্ড প্রবর্তনের উদ্যোগ নিচ্ছি। পাশাপাশি সামুরাই বন্ড ও প্যান্ডা বন্ডের মতো বৈশ্বিক ফাইন্যান্সিয়াল প্রোডাক্টের মাধ্যমে বাংলাদেশের পাবলিক ও প্রাইভেট সেক্টরের ফাইন্যান্সিং স্ট্রাকচার বদলে দেওয়া হবে। ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত করার যে স্বপ্ন আমরা দেখছি, তার জন্য প্রতি বছর প্রায় ৫০ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ প্রয়োজন, যা কেবল গতানুগতিক বৈদেশিক ঋণ দিয়ে সম্ভব নয়।’

আরও পড়ুন:  মধ্যপ্রাচ্যে শান্তির আবহে বিশ্ব পুঁজিবাজারে বড় উত্থান

তিনি বলেন, ‘আমরা বাংলাদেশের আর্থিক কাঠামো পরিবর্তন করছি।’ আন্তর্জাতিক পুঁজিবাজার থেকে অর্থ সংগ্রহের সক্ষমতা বাংলাদেশকে গড়ে তুলতে হবে।

খসরু বলেন, ‘শুধু বিএসইসি’র একক প্রচেষ্টায় পুঁজিবাজারের উন্নয়ন সম্ভব নয়। বিএসইসি একা এটি করতে পারবে না। সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।’

তিনি আরো উল্লেখ করেন যে, নিয়ন্ত্রক সংস্থা, ব্যাংক, বীমা কোম্পানি, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), বাংলাদেশ ব্যাংক, আর্থিক প্রতিবেদন-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান, হিসাবরক্ষক, স্টক এক্সচেঞ্জ, ব্রোকারসহ পুঁজিবাজারের সব অংশীজন গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি বলেন, অতীতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো অনেকটা বিচ্ছিন্নভাবে কাজ করেছে। সবাই দ্বীপের মতো, আলাদা আলাদা খণ্ডে কাজ করেছে। প্রত্যেকে নিজ নিজ জায়গায় কাজ করেছে,

কিন্তু তারা কখনো পরস্পরের সঙ্গে সংযুক্ত ছিল না। সমন্বিত উদ্যোগের অভাব বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের অন্যতম প্রধান দুর্বলতা হিসেবে রয়ে গেছে।

‘আমাদের কখনো সমন্বিত উদ্যোগ ছিল না’- উল্লেখ করে তিনি একটি টেকসই পুঁজিবাজারের পরিবেশ গড়ে তুলতে সব অংশীজনের সম্মিলিত উদ্যোগের আহ্বান জানান।

আরও পড়ুন:  কালো টাকা সাদা করার সুযোগ ফিরল

আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, পুঁজিবাজারকে বর্তমান নাজুক অবস্থা থেকে উত্তরণ ঘটানোর লক্ষ্যে এটির পুনর্গঠন ও শক্তিশালী করতে বাজার সংশ্লিষ্ট সকল স্টেকহোল্ডারদের স্বতঃস্ফূর্ত সেলফ-রেগুলেশন এবং সুশাসন চর্চার প্রয়োজন।

তিনি বলেন, ‘আমরা যদি পরিবেশ তৈরি করতে পারি, তাহলে কোম্পানির কোনো অভাব নেই। তারা অপেক্ষা করছে।’ বহুজাতিক কোম্পানিগুলো বাংলাদেশে বিনিয়োগের সুযোগ বিবেচনা করছে এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের মধ্যে দেশের পুঁজিবাজার নিয়ে আগ্রহ বাড়ছে।

তবে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ধরে রাখতে পেশাদারিত্ব, স্বচ্ছতা, কার্যকর নিয়ন্ত্রণ এবং সব অংশীজনের সমন্বিত উদ্যোগ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

অতীতের ব্যর্থতা নিয়ে আলোচনা করে সময় নষ্ট না করে পুঁজিবাজারের সব অংশীজনকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান অর্থমন্ত্রী।

সংস্কার কার্যক্রম সমন্বিতভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে পুঁজিবাজার আরও শক্তিশালী হবে এবং বাংলাদেশের আর্থিক কাঠামোর বৃহত্তর পরিবর্তনে অবদান রাখবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

one × 4 =