মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের অধিকার সংকুচিত করার লক্ষ্যে আবারও এক কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। বৃহস্পতিবার তিনি নতুন একটি নির্বাহী আদেশে স্বাক্ষর করেছেন, যার মূল লক্ষ্য হলো বিদেশি নাগরিকদের ‘বার্থ ট্যুরিজম’ বা সন্তান জন্মদানের উদ্দেশ্যে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ ঠেকানো। ট্রাম্পের দাবি, অনেক বিদেশি পর্যটনের দোহাই দিয়ে দেশটিতে প্রবেশ করলেও তাদের প্রকৃত উদ্দেশ্য থাকে সেখানে সন্তান জন্ম দিয়ে স্বয়ংক্রিয়ভাবে মার্কিন নাগরিকত্ব হাসিল করা।
বার্তা সংস্থা এএফপি’র প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওভাল অফিসে সাংবাদিকদের সামনে এই আদেশ জারির সময় ট্রাম্প কড়া ভাষায় বলেন, “তারা জন্মসূত্রে নাগরিকত্বকে একটি তামাশায় পরিণত করেছে।” মূলত অভিবাসন নীতি কঠোর করার অংশ হিসেবেই তিনি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে জানান।
এর আগে গত জুনের শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব সীমিত করার বিষয়ে ট্রাম্পের একটি পূর্ববর্তী উদ্যোগ বাতিল করে দিয়েছিল। সর্বোচ্চ আদালতের সেই রায়কে ট্রাম্প “খুবই দুর্ভাগ্যজনক” বলে মন্তব্য করেছিলেন। তবে দমে না গিয়ে তিনি এবার আরও বিস্তৃত পরিসরে এই অধিকার নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চালাচ্ছেন।
ট্রাম্পের প্রভাবশালী উপদেষ্টা স্টিফেন মিলার এই নতুন আদেশের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রদান করেছেন। তিনি জানান, এই আদেশের লক্ষ্য শুধু পর্যটক নয়, বরং আরও কিছু নির্দিষ্ট শ্রেণির মানুষের সন্তানদের নাগরিকত্ব সুবিধা থেকে বঞ্চিত করা। এর মধ্যে বিদেশি সন্ত্রাসী সংগঠনের সদস্যদের সন্তান এবং বিদেশি সরকারের পক্ষে যুক্তরাষ্ট্রে কাজ করা বা তদবির চালানো ব্যক্তিদের একটি বড় অংশ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। মিলারের মতে, এই পদক্ষেপের ফলে যারা অনৈতিকভাবে নাগরিকত্ব পাওয়ার সুযোগ খুঁজছিল, তাদের পথ বন্ধ হয়ে যাবে।
উল্লেখ্য যে, গত বছরও ট্রাম্প এমন একটি আদেশ দিয়েছিলেন যেখানে বলা হয়েছিল, অবৈধ অভিবাসী বা অস্থায়ী ভিসায় থাকা বাবা-মায়ের সন্তানরা যুক্তরাষ্ট্রে জন্মালেও স্বয়ংক্রিয় নাগরিকত্ব পাবে না। তবে নিম্ন আদালতগুলো সেই আদেশের কার্যকারিতা স্থগিত করে দেয়। আদালতের পর্যবেক্ষণ ছিল, মার্কিন সংবিধানের ১৪তম সংশোধনীর নাগরিকত্ব ধারা অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে জন্ম নেওয়া প্রায় প্রতিটি শিশু জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের অধিকারী। প্রধান বিচারপতি জন রবার্টসের নেতৃত্বে সুপ্রিম কোর্টের সংখ্যাগরিষ্ঠ বিচারকও এই সাংবিধানিক অবস্থান বহাল রেখেছিলেন।
যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের ১৪তম সংশোধনীতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে যে, “যুক্তরাষ্ট্রে জন্মগ্রহণকারী বা নাগরিকত্বপ্রাপ্ত এবং এর এখতিয়ারের আওতাভুক্ত সব ব্যক্তি যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক।” তবে ট্রাম্প প্রশাসন ভিন্ন যুক্তি দেখাচ্ছে। তাদের দাবি, ১৮৬১ থেকে ১৮৬৫ সালের গৃহযুদ্ধের পর যখন এই সংশোধনী আনা হয়েছিল, তার মূল উদ্দেশ্য ছিল সাবেক দাসদের নাগরিকত্বের অধিকার নিশ্চিত করা; এটি অবৈধ অভিবাসী বা বিদেশি পর্যটকদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হওয়ার কথা নয়। ট্রাম্প প্রশাসনের আইনি ব্যাখ্যা অনুযায়ী, যারা অবৈধভাবে বা অস্থায়ী ভিসায় রয়েছেন, তারা যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ণাঙ্গ ‘এখতিয়ারের’ আওতাভুক্ত নন, ফলে তাদের সন্তানরা স্বয়ংক্রিয়ভাবে এই অধিকার পেতে পারে না।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব পাওয়ার অধিকার সংকুচিত করার এই চেষ্টা ট্রাম্পের বৃহত্তর অভিবাসন বিরোধী অভিযানেরই একটি প্রতিফলন। তার এই পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে লাখ লাখ অনথিভুক্ত অভিবাসীকে দেশ থেকে বিতাড়িত করা এবং নির্দিষ্ট কিছু দেশের নাগরিকদের ওপর থেকে বিশেষ সুরক্ষা সুবিধা প্রত্যাহার করা। বর্তমানে মার্কিন আইনে কনস্যুলার কর্মকর্তাদের ভিসা প্রত্যাখ্যান করার ক্ষমতা থাকলেও, ট্রাম্পের এই নতুন নির্বাহী আদেশ দেশটির নাগরিকত্ব আইনের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যকে বড় ধরনের আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিয়েছে।







